ইতিমধ্যে এলিজাবেথও সুচতুরভাবে জনসাধারণের বিশ্বাসকে কাজে লাগাতেন। ইংল্যাণ্ডবসীদের ধারণা ছিল যে মেরী স্পেনের সঙ্গে পঁচিশ বছরের জন্য যে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করেছে তার প্রকৃত উদ্দেশ্য হল ইংল্যাণ্ডের সিংহাসন করায়ত্ত করা। তার এও মনে। হল যে ভদ্রতার সীমা লঙ্ঘন করেও ফিলিপ যদি তাঁকে একবার মুঠোর মধ্যে ভরতে পারে, তাহরে ইংল্যাণ্ডের সিংহাসনের উপর মেরীর দাবী অনেকটা জোরদার হবে এবং সেই সঙ্গে ত্বরান্বিতও হবে ইঙ্গ-ফরাসী চুক্তি আর ঠিক এই জিনিসটাই শেষ পর্যন্ত ফিলিপ চেয়েছিলেন।
অন্যদিকে মেরীর আঠারো বছরের বন্দীদশায় এলিজাবেথকে সিংহাসনচ্যুত করার জন্য একের পর এক ষড়যন্ত্রের পরিকল্পনা হয়ে যাচ্ছিল। আর এলিজাবেথও এই সময়টায় গুপ্তহত্যার ভয়ে আতঙ্কে সিটিয়ে থাকতেন, এর ফলে তাঁর টেবেলকে তিনি স্বাভাবিকভাবে উপভোগ্য করতে পারেন নি। তবু তিনি মেরীকে প্রাণদণ্ড দেননি। অবশেষে আর এক জঘন্য ষড়যন্ত্রের খবরে ভীত ও ক্ষিপ্ত হয়ে ১৫৮৭ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারিতে মেরী সম্পর্কিত সমস্ত দায়দায়িত্ব তিনি অর্পণ করলেন মেরীরই জিম্মাদার পলিট এর উপর এবং সে সম্পর্কিত হুকুমনাময় তাঁর নিজের সই ও সীলমোহর দেবার ব্যাপারে বলির পশু করলেন তাঁর নিজস্ব সচিব ডেভিডসনকে।
ঠিক তার পরের বছরেরই স্প্যানিশ জাহাজের উপর ইংরেজ অভিযানকারীদের দুর্ব্যবহারে রীতিমত কুপিত হয়ে ফিলিপ তার রণতরীর বহরকে পাঠালেন নেদারল্যান্ডস এবং আমেরিকায় যেখানে শত্রুপক্ষ ব্যাপভাবে তার স্বার্থক্ষুণ্ণ করে যাচ্ছিল। ওদিকে শত্রুপক্ষ এই হঠাৎ আক্রমণের জন্য প্রস্তুতি ছিল না; তাদের কাছে যথেষ্ট পরিমাণে যুদ্ধাস্ত্র বা গোলাবারুদ, কোনটারই মজুদ ছিল না। খারাপ কিছু একটা যাতে না ঘটে যায় তার জন্য এলিজাবেথকেও লণ্ডন ত্যাগ করে চলে যেতে বলা হল। নৈরাশ্যবাদীর, প্রমাদ গুনলেন যে হানাদারদের মদতে এই সুযোগ দেশের অভ্যন্তরে একটা আদর্শের জন্য বলি প্রদত্ত আপাময় জনসাধারণের নিষ্ঠাকে সম্বল করে তিনি নিজের হাতে গড়ে তুলেছিলেন উপযুক্ত মুহূর্তে তাঁকে নিরাশ করল না। তাই টিলাবেরীতে এক সমাবেশে তাঁর সৈন্যবাহিনীর উদ্দেশ্য তিনি বললেন, “আমার প্রিয় এবং বিশ্বস্ত দেশবাসীর প্রতি একতিল সন্দেহ বা অবিশ্বাস নিয়ে আমি বেঁচে থাকতে চাই না। আমি জানি আমি একজন নারী; তাই শরীরগত কারণে আমি ক্ষীণ ও দুর্বল হতে পারি, কিন্তু হৃদয়টা আমার রাজার মতো। এটা ভাবতে আমার রীতিমত দুঃখ ও ঘেন্না হয় যে পারমা অথবা স্পেন কিংবা ইউরোপের কোন যুবরাজ আমার রাজ্যের সীমান্তে এসে নিঃশ্বাস ফেলে যাচ্ছে।” তার বক্তব্যের সমর্থনে সৈন্যদের মধ্য থেকে যে হর্ষধ্বনি উঠল তা মিলিয়ে যাবার আগেই হঠাৎ এক দূত ডেক থেকে ছুটতে ছুটতে তাঁর কাছে এসে উপস্থিত হল এবং জানাল যে তার বিশ্বাস ব্যর্থ হয়নি। কারণ, ঈশ্বরের সহায়তায় ইংরেজরা স্পেনীয় আরমাডাদের হটিয়ে দিয়েছে। সানন্দে তিনি তাই ঘোষণা করলেন, “দেখুন, ঈশ্বর শুধু সৎ এবং সাহসীদেরই সাহায্য করেন। তাই তাঁর দৈব বায়ুর সাহায্যে তিনি আমাদের শত্রুপক্ষকে এক ফুঙ্কারে উড়িয়ে দিয়েছেন।”
তাই তার সোনালী রাজত্বের গৌরবময় দিন হিসাবে গণ্য করা হয় ১৫৮৮ খ্রিস্টাব্দের এই ১৭ই নভেম্বর তারিখটিকে। কারণ দেশের প্রধান হিসাবে তিনি অত্যন্ত সুচারুভাবে এবং দক্ষতার সঙ্গে তার কর্তব্যই শুধু সম্পাদন করেননি তিল তিল করে যে দেশকে তিনি নিজের হাতে গড়েছেন এবং তাকে সম্মানের ও গৌরবের সর্বোচ্চ চূড়ায় নিয়ে গেছেন, চরম বিপর্যয় ও ধ্বংসের হাত থেকে সেই দেশকে তিনি সর্বশক্তি দিয়ে রক্ষাও করেছেন। এরপর ইংল্যান্ড তার মহত্বের ও শৌর্যের শান্ত জলরাশির উপর দিয়ে তপ্ত মরালীর মত খুশিমনে ঘুরে বেড়িয়েছে, আর তিনি নিজে ধীরে ধীরে হারিয়ে গেছেন তাঁর প্রিয় দেশবাসীর অন্তর থেকে। শেষে, সম্পূর্ণ একাকী এবং ভগ্নমনা অবস্থায় তিনি পেতে। চাইলেন একটু প্রেমের উষ্ণ পরশ; কিন্তু সেখানেও তিনি প্রত্যাখাত হলেন। কারণ, সুদর্শন, তরুণ ও স্বেচ্ছাচারী নাইট এসেক্স যে এলিজাবেথকে জানতেন তিনি ছিলেন অহংকারী এবং তেজী এক মহিলা এবং রাজানুগ্রহের প্রতিও তাই তাঁর ছিল চরম এক অবজ্ঞা ও ঘৃণা। তিনি অপেক্ষা করেছিলেন সময়ের করাল থাবায় ক্ষত বিক্ষত কুৎসিৎ ও বিগতযৌবনা এক নারীকে দেখার জন্য। সময়ের চাপে তিনি শারীরিক ও মানসিক দিক থেকে নুইয়ে পড়লেও এসেক্স-এর ধারনা ছিল যে ওই টিউডর অগ্নিশিখা যতই স্তিমিত অবস্থায় থাকুক না কেন তাকে গিলে খাবার পক্ষে তা তখনো যথেষ্ট শক্তিশালী। তার আশঙ্কা একদিন সত্যে পরিণত হল। ১৬০১ সালের ২৫শে ফেব্রুয়ারি সেই এসেক্সকে ফাঁসিকাঠে প্রাণ দিতে হল; তার মৃত্যুর সাথে এলিজাবেথ এর হৃদয়ের মৃত্যু ঘটল।
অহংকার যেমন ছিল এলিজাবেথ-এর জীবনের চালিকাশক্তি, তেমনি তা ছিল তাঁর প্রেমের দাহিকাশক্তিও। অহংকার ছিল তাঁর জীবনের উত্থান, তাঁর জীবনের পতনও। তাই জীবেনর প্রান্তসীমায় পৌঁছেও মাজে মাঝে দেখা গেছে পড়ন্ত সূর্যের দীপ্ত কিরণ– গমগম করে বেজে উঠেছে তার উচ্চকিত হাসির সুরেলা অনুরণন, শোনা গেছে চাঁছাছোলা ভাষায় স্পষ্টাপষ্টি বক্তৃতা যা রাষ্ট্রদূতদের অনুপ্রাণিত করেছিল সত্য কথা বলতে এবং রুক্ষ নাবিকদের উদ্বুদ্ধ করেছিল কাব্য রচনা করতে। কিন্তু এসবই ছিল নিভে যাওয়ার আগে প্রদীপের দেদীপ্যমান শিখার মত হঠাৎ এক উজ্জ্বল বিচ্ছুরণ।
