লালচে-সোনালী কোকঁড়ান চুল, ম্লান মুখ, তীক্ষ্ণ নীল চোখ এবং দুধসাদা লম্বা হাত সব মিলিয়ে এলিজাবেথকে সত্যিই রাজনন্দিনী বলে মনে হত এবং এর জন্য মনে মনে। তার একটা অহংকারও ছিল। এহেন যুবতী রাণীর কুমারীত্ব আবার কূটনৈতিক মহলে দারুণ কৌতূহলও আগ্রহের সঞ্চার করেছিল। অতএব ধান্দাবাস রাষ্ট্রদূত গুপ্তচরের দল ইউরোপের বিভিন্ন রাজকুমার ও রাজভ্রাতার জন্য কোটনাগিরি শুরু করে দিল। সিংহাসনে আরোহণ করেই এলিজাবেথ তার মন্ত্রীসভার অনুমোদন নিয়ে গঠন করলেন সেরা এক উপদেষ্টামণ্ডলী; এবং এক্ষেত্রেও তিনি তাঁর প্রতিভার ছাপ রাখলেন। তবে তাদের উপদেশ ও মতামতের উপর যে তিনি চলতেন তা কিন্তু নয়; তিনি বরং তাদের সুচিন্তিত পরামর্শের সঙ্গে মিশ্রণ ঘটাতেন তাঁর ব্যক্তিগত বুদ্ধি ও চিন্তা-ভাবনা এবং সিদ্ধান্ত যেটি নিতেন সেটি ছিল তাঁর সম্পূর্ণ নিজস্ব। লউ বালে, উইয়িম সেসিল ছিলেন তাঁর প্রধানমন্ত্রী এবং ওই পদেই আমৃত্যু তিনি বিশ্বস্ততার সঙ্গে রাণীর সেবা করে গেছেন চল্লিশ বছর ধরে। এক ঐতিহাসিক লিখেছিলেন–”তিনি ছিলেন এমনই একজন মহিলার অনুগত এবং উপযুক্ত এক কর্মচারী এমনই একজন মহিলার যার ডান হাত কখনই জানতে পারত না তার বাম হাত কি করতে যাচ্ছে।”
এরপর, তার প্রধানমন্ত্রী ও নতুন মন্ত্রিসভাকে নিয়ে এলিজাবেথ তার দেশের দূত গৌরব পুনরূদ্ধারে ব্রতী হলেন। প্রথম কয়েকটা বছরে প্রচন্ড ব্যয় সংকোচ করে এবং ব্যাপক হারে কর বসিয়ে তিনি দেশকে ঋণমুক্ত করলেন। ফ্রান্সের সাথে যখন তার শান্তি। চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে যাচ্ছে, সেই সময় ফ্রান্সের বন্দর শহর ক্যালেই যাতে তার হস্তগত না হয় তার জন্য তোষামোদ করে ও ভয় দেখিয়ে তার উপর চাপ সৃষ্টি করে যাচ্ছেন স্পেন এর রাজকুমার ফিলিপ; তাকেও তিনি কৌশলে বাগে আনতে সচেষ্ট হলেন; কিন্তু শেষ চাল হিসাবে যখন ফিলিপ তাঁর কাছে বিয়ের প্রস্তাব রাখলেন, এবং উল্টোদিকে আবার ইংল্যাণ্ডের ক্যাথলিকদের ক্ষয়িষ্ণু ক্ষমতার দিকেও শঙ্কিত নেত্রে চেয়ে থাকলেন এলিজাবেথ তখন খানিকটা দোটানার মধ্যে পড়ে গেলেন। তারপর আলাপ আলোচনায় ক্যালেকেই বিক্রি করে দিলেন এবং সেই সঙ্গে একেবারে নাকচ করে দিলেন ফিলিপ এর প্রস্তাব। ওই মাসেই চার্চ অফ ইংল্যাণ্ড তার অস্তিত্ব লাভ করল।
এলিজাবেথ এর বিরুদ্ধে বরাবরই একটা অভিযোগ ছিল যে তিনি ছিলেন এক মোহিনী নারী। আপাতবিরোধীভাবে এটা যেমন সঠিক, তেমনি বেঠিকও। শোনা গেছে, তার বৃত্তের ধারে কাছে যে যুবকই এসেছে, পাগলের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে তিনি তার যৌবনরস পান করেছেন। সম্ভবতঃ এসেক্স এর সঙ্গেই তার প্রেম যথেষ্ট গভীরতা লাভ করেছিল; কিন্তু স্পেন-এর ফিলিপ, তার সম্পর্কিত ভাই ডন জন এবং অস্ট্রিয়ার আর্কডিউক চার্লস, আনজাউ এর হেনরী কিংবা তার ভাই ফ্রান্সিস–এদের সকলের সঙ্গেই তার সলাজ সম্পর্ক ছিল ঠাণ্ডা রাজনীতি সঞ্জাত। তাঁর এই নিস্পৃহ এবং শীতল আবরণ কিন্তু তার পরিকল্পিত সাফল্যেরই অঙ্গীভূত। দুঃসাহস ও যৌবনের আগুনে উত্তপ্ত এবং বিত্ত ও ভোগের লালসায় উত্তেজিত একটা দেশে তিনি চোখ ঝলসানো কোন স্বর্ণ শিখর নয়, ছিলেন রজতশুভ্র পর্বত শৃঙ্গের মতো মহিমান্বিত এক শীতল ব্যক্তিত্ব, যাকে ধরা যায় কিন্তু বেঁধে রাখা যায় না, যার স্পর্শে জাগে শিহরণ কিন্তু তা দেয় না কোন নির্ভরতা। জাঁকজমক, আড়ম্বর ও যে কোন বিলাসিতার প্রতি তার তীব্র আসক্তি। রাজকীয় কোন অনুষ্ঠান বা শোভাযাত্রা, যা বর্ণাঢ্যতায় ও জৌলুষে সাধারণ মানুষের চোখকে ধাঁধিয়ে দেয় এবং তাদেরকে বিস্ময়ে বিমূঢ় করে দেয় তার জন্য তিনি স্বয়ং পৃষ্ঠাপোষকতা করতেন। অন্যদিকে আপামর জনসাধারণের কাছে তিনি হয়ে উঠেছিলেন উৎসাহ ও প্রেরণার এক জ্বলন্ত প্রতিমূর্তি যাকে আদর্শ করে অসংখ্য সাহসী, মেধাবী, এমনকি বিবেক বুদ্ধিহীন মানুষও বেরিয়ে পড়েছিল স্থলে, জলে ও রণাঙ্গণে কিছু একটা করে দেখাবার নেশায়। তবে ধর্মীয় মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে তিনি মোটেই প্রশ্রয় দিতেন না। কারণ, তার এটা ভালভাবেই জানা ছিল যে ইংল্যাণ্ডে পূর্ণধর্মান্তরিত করার জন্য স্পেন থেকে যে বিশেষ সম্প্রদায়ের ধর্ম প্রচারকদের পাঠানো হয়েছিল, তাদের আসল উদ্দেশ্য ছিল তার দেশে বিদ্রোহ ও রাজদ্রোহের বীজ বপন করা। ওদিকে ওই ধর্মসংস্কারকের তাদের অন্ধ বিশ্বাসের প্রতি অকপট ও অবিচল আস্থা নিয়ে থাকায় এবং সমগ্র ইংল্যাণ্ডেরও ক্যাথলিক ভাবধারার প্রতি সহানুভূতি পোষণ করায় তার সিংহাসনের গায়ে তিনি অনুভব করলেন মৃদু তরঙ্গাঘাত। অতএব, এলিজাবেথ ক্যাথালিকদের অযথা হয়রান এবং তাদের উপর নির্যাতন করতে শুরু করে দিলেন। কিন্তু গ্রণি-র বক্তব্য ছিল অন্যরকম তার মতে–“এলিজাবেথই হলেন প্রথম ইংরেজ শাসক যিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে ধর্মীয় নির্যাতনের অভিযোগ তাঁর শাসন ব্যবস্থার উপর একটা বিরাট কলঙ্ক স্বরূপ হয়ে দাঁড়াবে। তাই শুধু মাত্র ধর্মীয় মতদ্বৈধতার কারণে কোন মানুষকে হত্যা করার চেষ্টাকে তিনি সরাসরি অপরাধ হিসাবে গণ্য করেছিলেন।”
তবে ক্যাথলিকদের ধর্মবিশ্বাসের উপর তার সহানুভূতি থাকলেও ‘চার্চ অফ ইংল্যাণ্ড’ ছিল তার নিজের দেশের ধর্মকে বিশ্বের দরবারে পরিচিত করাবার জন্য তিনি তো তাকে একটু উঁচুতে তুলে ধরবেন; কারণ এই ধর্মের উপর তার দুর্বলতা অনেক বেশি। আর সেই জন্যই ১৫৬৮ খ্রিস্টাব্দে লংসাইড-এর যুদ্ধে পরাজিত হয়ে স্কটল্যাও এর রাণী মেরী যখন সীমান্ত পেরিয়ে তার দেশে আশ্রয় ভিক্ষা করলেন, সঙ্গে সঙ্গে তিনি তা পেলেন– তবে তা কারাগারে। তার মানে এই নয় যে এলিজাবেথ তার সৎ-বোনকে ঘৃণা করতেন; আসলে, একজন ক্যাথলিকের ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে বিপুল সংখ্যক পোটস্টান্ট এর বিরাগভাজন তিনি হতে চান নি। অতএব মেরির স্থান হল কারাগারে দীর্ঘ আঠারো বছর তাকে এক দূর্গ থেকে আরেক দুর্গে স্থানান্তরিত হতে হল।
