এরপর ১৫৪৭ খ্রিস্টাব্দে অষ্টম হেনরী মারা গেলেন এবং সিংহাসনে বসলেন দশ বছরের বালক ষষ্ঠ এডোয়ার্ড, সঙ্গে অভিভাবক হিসাবে থাকলেন তার মামা ডিউক অব সমারসেট। কিছুদিনের মধ্যেই দিকচক্রবালে ঘনিয়ে এল চক্রান্ত আর ষড়যন্ত্রের কালো মেঘ। সমারসেট ক্ষমতালোভী হলেও সেরকম ধূর্ত ছিলেন না; তাছাড়া এটাও নিদারুণ ভাবে সত্য ছিল যে ওই বালক রাজা শারীরিকভাবে এমনই দুর্বল ও অথর্ব ছিল যে তার পক্ষে পরিপূর্ণ বয়স্ক অবস্থায় পৌঁছানো কখনই সম্ভব ছিল না। তাই অষ্টম হেনরীর উইল অনুযায়ী উত্তরাধিকারী হিসাবে তার পরেই ছিল অ্যারাগণের ক্যাথারিন-এর কন্যা মেরী টিউডর–এর নাম এবং সবশেষে ছিল এলিজাবেথ এর নাম। তবে, এদের দুজনের কাছেই ভয়াবহ বিপদস্বরূপ ছিল ফ্রান্সের পঁফের স্ত্রী ও অষ্টম হেনরীর বড় বোন মার্গারেট, এর নাতনী এবং স্কটল্যাণ্ডের সিংহাসনের ভবিষ্যৎ দাবীদার মেরী স্টুয়ার্ট। আসলে, ইংল্যান্দ্রে সিংহাসনের উপরও মেরী স্টুয়ার্ট–এর দাবী ওই দুই টিউডর যুবরাণীর চেয়ে অনেক বেশি ও জোরালো ছিল; কিন্তু মেরী টিউডর এর মতো তার ক্যাথলিক ঘেষা মনোভাব তাকে ইংল্যাণ্ডের জনগণের সহানুভূতি থেকে বঞ্চিত করেছিল, এবং এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল তার ফ্রান্সের রাণী হওয়া, যা তার ইংলণ্ডেশ্বরী হওয়ার পক্ষেও অন্তরায় সৃষ্টি করেছিল।
এই পরিস্থিতি যেমন ঘোরালো হয়ে উঠল তার ফলে জন্ম নিল পারপরিক সন্দেহ, কুটিল ষড়যন্ত্র এবং নোংরা চক্রান্ত ও তার পাল্টা চক্রান্ত। এদিকে ষোল বছর পূর্ণ হবার আগেই মারা গেলেন ষষ্ঠ এডোয়ার্ড এবং সঙ্গে সঙ্গে মাথাচড়া দিয়ে ওঠবার চেষ্টা করল লেডী জেন গ্রেই। অবশ্য, সে প্রচেষ্টা অঙ্কুরেই বিনষ্ট করা হল; তবে এই ব্যর্থ অভ্যুথানের সঙ্গে যেহেতু এলিজাবেথ-এর যোগসাজসের খবর যথেষ্ট যুক্তি সহকারে সমর্থিত হল। তাঁর এই সৎবোনকে মেরী, তৎক্ষণাৎ পাঠিয়ে দিলেন দুর্গের অন্তরীণ; এবং বিশ্বাসঘাতকতা ও গুপ্তচরবৃত্তির যে অবধারিত শাস্তি মৃত্যু– সেটা এলিজাবেথ এড়াতে পারল কেবলমাত্র স্পেনের ফিলিপ ও তার বাবার হস্তক্ষেপের জন্য। পরবর্তীকালে যখন ফিলিপ ও এলিজাবেথের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী খন্ডযুদ্ধ শুরু হয়েছিল তখন ফিলিপ এটা স্মরণ করিয়ে দিতে ভোলেন নি যে তারই জন্য এলিজাবেথ আজ জীবিত। আর, জীবন ফিরে পেয়ে সে কিনা তর জীবনদাতারই জীবন নিতে উদ্যত। যাই হোক, নিষ্ঠুর মেরীর রাজত্বের পাঁচটা যন্ত্রণাময় বছর এলিজাবেথ কাটালেন লর্ড সেমুর-এর রাজসংসারে। এই সেমুর হলেন অষ্টম হেনরীর শেষ রাণী ক্যাথারিন পার–এর দ্বিতীয় স্বামী, বয়সে যিনি তার স্ত্রীর থেকে অনেক ছোট ছিলেন।
এলিজাবেথ অবশ্য তাঁর বিমাতা ক্যাথারিন-এর নতুন স্বামীর বেশ প্রিয় পাত্রীই হয়ে উঠেছিলেন। কারণ, পঞ্চদশবর্ষীয়া রাজকুমারীর হৃদয়ে সুখের যে ঢেউ সুদর্শন সেমুর তুলেছিলেন তাঁর যৌবনের তটে। তাই ১৫৪৮ খ্রিস্টাব্দে ক্যাথারিন মারা যেতেই সেমুর এলিজাবেথ এর কাছে সরাসরি প্রস্তাব করলেন। সেমুর-এলিজাবেথ সম্পর্কের প্রকৃত চেহারা হয়ত আমরা কোনদিনই জানতে পারব না, কিন্তু যে লোকনিন্দা ও কলঙ্কের আর্বতে তিনি নিজেকে এবং এলিজাবেথকে ডুবিয়েছিলেন তাতে যুগ্ম মৃত্যুদণ্ড প্রায় অবধারিত ছিল। কারণ, সেমুর-এর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল রাজদ্রোহিতার; তিনি চেয়েছিলেন এলিজাবেথকে বিয়ে করে ইংল্যাণ্ডের সিংহাসন অধিকার করতে। শেষ পর্যন্ত একদল পুঁদে উকিলের প্রাণান্তকর জেরায় জেরবার হয়ে এলিজাবেথ তার নির্দোষিতা প্রকাশ্যে ঘোষণা করার পর তারা দুজনে তাদের শির ও সম্মান কৌনক্রমে বাঁচালেন।
এদিকে প্রোটেস্টান্ট শহীদদের রক্তে ইংল্যাণ্ডের মাটি তখন লাল। প্রতিশোধের উন্মত্ত আক্রোশে ও চিৎকারে ইংল্যাণ্ডের আকাশ-বাতাস রীতিমত উত্তপ্ত। প্রেমের জোয়ারে অবগাহন করে থাকলেও এলিজাবেথ কিন্তু স্বচ্ছ, তীক্ষ্ণ, কঠিন ও নীরব দৃষ্টিতে লক্ষ্য করে যাচ্ছেন তার সৎ-বোন মেরীর একটার পর একটা ভুল ও অন্যায় পদক্ষেপ। অবশেষে ১৫৫৮ খ্রিস্টাব্দে করুণ ব্যর্থতার প্রতিমূর্তি এই নিঃসন্তানা এবং ঘৃণিতা মেরীকে মৃত্যু এসে মুক্তি দিয়ে গেল। সমগ্র ইংল্যাণ্ড আনন্দের আর খুশির কলতানে মুখরিত হয়ে উঠল– তবে সে খুশি ও আনন্দ এলিজাবেথ এর সিংহাসন আরোহণের জন্য ততটা নয় যতটা মেরীর মৃত্যুর জন্য।
যে বছরে মেরী মারা গেল, সেই বছরেই নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি নাগাদ এলিজাবেথ ইংল্যাক্সে রাণী হলেন, আর এমন একটা সময়ে তিনি সে দেশের হাল ধরলেন যখন ইংল্যাণ্ড ধুকছে মারাত্মক মহামারীর কবলে পড়ে এবং সাংঘাতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে ফ্রান্সে রক্তক্ষয়ী ও অর্থক্ষয়ী যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করে। মেরীর পাঁচ বছরের ওই রাজত্বকালে দেশটা একেবারে ধ্বংসের গহ্বরে তলিয়ে গিয়েছিল–তার সম্মান ও মর্যাদা ভুলুণ্ঠিত হয়ে ছিল, মুদ্রার মূল্যমান হ্রাস পেয়েছিল এবং দেশবাসীরা ধর্মীয় মতদ্বৈধলয় জর্জরিত ছিল। অনেকে নাকি এই মত পোষণ করে যে এলিজাবেথ এর রাজ্যাভিষেকে যে খুশির রোশনাই আর আনন্দের বন্যা বয়ে গেছিল সেটা দেশবাসীর কাছে প্রায় অপরিচিত নতুন এক রাণীকে বরণ করার জন্য নয়, বরং তার বোনের স্বস্তিদায়ক মৃত্যুকে স্বাগত জানাবার জন্য।
