যার ফলে ইতালির সরকার মার্কোনির মূল্যটা বুঝতে পারল। তাই সঙ্গে সঙ্গে মার্কোনিকে আমন্ত্রণ জনালেন ও এক বেতার কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করে দিলেন। এখানে বার মাইল দূরে যুদ্ধ জাহাজে বেতারবার্তা পাঠানো যায়। দূরত্ব ক্রমশ বাড়তে থাকে, এর সাথে বিজ্ঞানীরাও বুঝতে পারলেন এর গুরুত্ব ও ভবিষ্যতের সম্ভাবনার কথা।
১৮৯৭ সালে মার্কোনি তার আবিষ্কার ইতালির সম্রাট হামবার্ট ও রানী মারগেরিটারে সামনে প্রদর্শন করেন। সেই সময় তিনি জায়গায় বেতার স্টেশন তৈরি হয়।১৮৯৯ সালে মার্কোনির আবিষ্কারের সম্পর্কে সাধারণ মানুষও সজাগ হয়ে উঠেন। কারণ সে বছরই একটি স্টিমারে সাথে সংঘর্ষে আরোর সংকেতদতা ইস্ট গুডউইন জাহাজ ডুবে যাচ্ছিল, ঠিক সেই সময় বেতারবার্তা পাঠানো হল লাইটহাউসে, সাথে সাথে নৌকা পাঠিয়ে নাবিকদের জীবন বাঁচানো হল। এরপর ইংলিশ চ্যানেলের এপার থেকে ওপারে বেতার যোগাযোগ করা সম্ভব হয়। তারপর মার্কোনি আটলান্টিক মহাসাগরের এপার থেকে ওপারে বেতারবার্তা পাঠানোর কাজে লেগে যান। ১৯০১ সালে ১২ ডিসেম্বর তিনি সফল হন।
১৯০৫ সালে বেতার যন্ত্রের আরও উন্নতি ঘটে। বেতার গ্রাহক যন্ত্রের সমস্ত অসুবিধাগুলো দূর হয়ে যায়। ১৯১১ সাল থেকে ১৯৩৪ সালের মধ্যে বেতারবার্তা পাঠানো পদ্ধতি অনেক উন্নত হয়। যার ফলে তখনই রেডিও তৈরি হয়। ১৮৯৫ সাল থেকে ১৯৩৫ সালের মধ্যে মার্কোনি প্রচুর পুরস্কার ও সম্মান পান। ১৯০১ সালে তিনি পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কার পান। তাঁকে দি মার্কিন’-এ ভূষিত করা হয়। ১৯৩৭ সালে তার মৃত্যু হয়।
৪৮. রাণী এলিজাবেথ (১৫৩৩-১৬০৩)
ইংল্যাণ্ডের রাণী প্রথম এলিজাবেথ তাঁর প্রথম আইন সভার অধিবেশনে যে স্মরণীয় উক্তিটি করেছিলেন, সম্ভবতঃ সেটাই ছিল তাঁর জীবনের আন্তরিকতার ছোঁয়ায় রাঙানো প্রথম ও শেষ বক্তব্য। তিনি বলেছিলেন, “আমার প্রজাদের শুভেচ্ছা ও ভালবাসা ভিন্ন আমার কাছে পৃথিবীর কোন কিছুই মূল্যবান নয়।” যদিও টিউডরদের হাতে প্রাণ দিতে হয়েছিল অসংখ্য মানুষকে, আর সেই রক্তস্নাত পিচ্ছিল পথ ধরেই তিনি আরোহণ করেছেন সিংহাসনে, তবুও কিন্তু তিনি তাদের ভালবাসা অর্জনে সমর্থ হয়েছিলেন। শুধু অর্জন নয়। সে ভালবাসা তিনি রক্ষাও করেছিলেন; হ্যাঁ, তাঁর রাজত্বের শেষ দিকের দুঃখময়, বিবর্ণ দিনগুলোতেও যখন তাঁকে চিত্রিত করা হয়েছে শয়তানিতে ভরা ঝগড়াটের এক রক্তবর্ণা স্ত্রীলোক হিসাবে তিনি লালায়িত ছিলেন যুব-সম্প্রদায়ের ভালবাসার জন্য; যদিও অবশ্য এর জন্য উচ্চ-পদস্থ বা সাধারণ, কোন ব্যক্তিকেই বঞ্চিত করতে বা বিপদে ফেলতে তাঁর হাত এতটুকু কঁপেনি। পৃথিবীর সবচেয়ে কাঙ্খিতা মহিলা এই এলিজাবেথ প্রেমাসক্তিতে ছিলেন উদ্দাম, বল্পহারা, নির্মম, নিষ্ঠুর। একটুকরো নিখাদ ভালবাসার জন্য তিনি পারতেন না এমন কোন কাজই পৃথিবীতে ছিল না।
সিংহাসনে যখন তিনি বসেন তখন তার বয়স মাত্র পঁচিশ পূর্ণ যৌবনবতী, অসম্ভব সুন্দরী, প্রচণ্ড বুদ্ধিমতী এবং ভাবপ্রকাশহীন চতুর ও কুটিল এক মহিলা। তাঁর জন্মের বৈধতা নিয়ে হাজারটা প্রশ্ন উঠতে পারে, যে কাগজে অ্যারাগণের ক্যাথারিন-এর বিবাহকে অস্বীকার করে অ্যান বোলিনকে রাণী করার কথা বলা হয়েছিল সেই কাগজের বক্তব্যের সত্যাসত্যকে ঘিরে অনেক শ্লেষোক্তি থাকতে পারে কিন্তু কেউ কখনোই এটা অস্বীকার করতে পারবে না যে এলিজাবেথ ছিলেন রাজা অষ্টম হেনরীর কন্যা। তাই তাঁর কেশদামে লালচে-সোনালীর স্পর্শ, চোখের মণিতে নীলিময় আভা এবং গোলাপী ত্বকে সজীবতা ও মসৃণতার ছোঁয়া লাগা ছাড়াও জন্মসূত্রে তিনি তার বাবার কাছ থেকে লাভ করেছিলেন তার তীক্ষ্ণ উপস্থিত বুদ্ধি, কূটনৈতিক দক্ষতা, প্রচণ্ড ঔদ্ধত্য, সৌজন্যহীন অহংভাব, চূড়ান্ত বিবেকহীনতা এবং শিক্ষানুরাগ। আর, অ্যানববালিনের মেয়ে হিসাবে এইসব বৈশিষ্ট্য এবং গুণের সঙ্গে তিনি যোগ করেছিলেন নারীসুলভ সমস্ত রকমের চাতুর্য ও কৌশল। এলিজাবেথ সম্পর্কে স্পেনে-–এর রাষ্ট্রদূত তার নিজস্ব তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা লিখে জানিয়েছিলেন ফিলিপকে–“শত সহস্র নারকীয় জীবের সমাহার হল এই মহিলা”।
এলিজাবেথ জন্মগ্রহণ করেন ১৫৩৩ খ্রিস্টাব্দে; কিন্তু তাঁর পিতা অষ্টম হেনরী তাকে খুশি মনে মনে নিতে পারেন নি। কেননা তিনি চেয়েছিলেন যে কোন পুরুষ বংশধর এসে বহন করুক ঐতিহ্যশালী এই টিউডর বংশের ধারা; বিশেষতঃ অজস্র বাধা আর প্রতিবন্ধকতাকে উপেক্ষা করে তিনি যেখানে অ্যান বোলিমকে রাণী করেছিলেন সেখানে। সামান্য প্রতিদান হিসাবে সেও তো তাকে একটা পুত্র-সন্তান উপহার দিতে পারত। এলিজাবেথ যদি কন্যাসন্তান না হয়ে পুত্রসন্তান হতেন তো অ্যান বোলিনকে হয়ত তিন বছরের শিশুকে ফেলে রেখে ফাঁসি কাঠে তার উচ্চাকাঙ্খী জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটাতে হতো না। শিশু হিসাবে একাকীত্ব, ভীতি, বেদন এবং দুঃখ সম্বন্দে এলিজাবেথ-এর অভিজ্ঞতা আর পাঁচটা শিশুর থেকে ছিল অনেক বেশি। খুব ছোট্ট বয়স থেকে হঠাৎ মৃত্যুজনিত ভয় ছিল তার চিরসাথী এবং নিজের জন্মের কলঙ্ক ছিল কায়ার ছায়ার মতো সর্বদা সম্মুখে লম্ববান। তাঁর ছোটবেলার বেশির ভাগ সময়টাই কেটেছে প্রকৃত পক্ষে বন্দীদশায়। তবু ভাল, গৃহশিক্ষক, প্রচুর পুস্তক এবং ছোট্ট বৈমাত্রেয় ভাই এডোয়ার্ড-এর সাহচর্যে তিনি কিছুটা তৃপ্তি লাভ করেছিলেন। সর্বোপরি, রজার অ্যাস্চাস এবং ব্যালডাসেয়ার-এর অভিভাবকত্বে ‘হ্যাটফিলড হাউস’–এ কাটানো শান্ত দিনগুলো ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে সুখের স্মৃতিগুলোর অন্যতম।
