শেষ পর্যন্ত তিনি ইতালিতে ফিরে এলেন। এলেন গ্রামে প্রথম হতে নয়। রোমে প্রথম হতে। তিনি প্রথমে দশ বছরের জন্য, পরে আমৃত্যু নিজেকে একনায়ক হিসাবে ঘোষণা করেলেন। স্বল্পকাল ক্ষমতায় থাকার সূত্রেই সিজার সুবিচারক হিসাবে প্রতিষ্ঠা পেলেন এবং তার এই আত্মশ্লাঘাই ডেকে আনল তার মৃত্যুকে। তবুও ওই সময়েই আল্পসের ওপারেও বিস্তৃত করলেন তিনি ভোটাধিকার ও অন্যান্য রাজনৈতিক সুবিধা, উপজাতির গুলি পেল বন্ধুত্ব, ক্যালেন্ডার সংস্কার হল, স্বাধীন মানুষ পেল আরও স্বাধীনতার সুনিশ্চিত আশ্বাস, এবং জনস্বার্থে হাত দেওয়া হল বড় বড় কাজে।
এত করার পরও উচ্চাকাঙ্ক্ষা তাকে যেন নেশাগ্রস্ত করে তুলল। তাঁর বংশের সঙ্গে দৈবী যোগাযোগ আছে এই বিশ্বাসের বসেই তিনি নিজেকে দেবতা বলে ভাবতে থাকলেন। চাইলেন দেবতাকে দেয় সুযোগ সম্মান। রোমকে যারা মহান গৌরবে ভূষিত করলেন, তাঁদের মধ্যেই তাঁর মূর্তি প্রতিষ্ঠা করলেন তিনি, যে মূর্তির তলায় লেখা হল ‘অজেয় দেবতার প্রতি। আধুনিক চিত্রতারকাদের মতই বিনয় দেখিয়ে আগেভাগেই তাঁর প্রতি আরোপিত গুণাবলী ও মর্যাদার কথা ঘোষণা করা হত। ‘ইশায়েটর’-লাতিনে যে শব্দটি ম্রাটের উৎস, সেই ‘ইম্পায়েটর’ দিল তার সবচেয়ে পছন্দসই উপাধি। সোনার সিংহাসন থেকে তিনি রোমকে শাসন করেছেন, অথচ রোম ছিল প্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্র!
সেনেট হাউসে পম্পের মূর্তির পাদদেশে ঘন ঘন অশনি সম্পাতে আলোকিত ঝড়ো হওয়ার মধ্যে ঘাতকের ছুরিকাঘাতে নিভে যায় তার জীবনদীপ। বলা হয় যারা তাঁকে খুন করে তার মধ্যে শত্রুর চেয়ে তার মিত্রই ছিল বেশি। আমরা জানি তার শেষ কথাটি ছিল, হায় ব্রুটাস, তুমিও!
সিজার সেই মৃত্যুর মুখে দেখেছিলেন তার ঘনিষ্ঠজনরাই তাঁকে নিঃসঙ্গ করেন। বুঝলেন তার সাফল্যই পরাজিত করল তাকে।
সিজারই রোমের দৃষ্টিকে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চয় থেকে উত্তর ইউরোপের দিকে প্রসারিত করেন। বিচ্ছিন্ন জাতিগুলোকে তিনিই আনেন রোমের পতাকাতলে। শুধু অসি চালনাতেই নয় মসি অর্থাৎ লেখনীতেও তিনি পারদর্শিতার চিহ্ন রেখে গেছেন তার যুদ্ধ বিবরণীতে আর গড়ে দিয়ে গেছেন তার ভাগ্নে অগস্টাসের জন্য সাম্রাজ্য গড়ার রাস্তা। সিজার চরিত্রকে অল্প কয়েকটি কথার মধ্যে তুলে ধরেছেন লর্ড টুহউসমুরি এইভাবে
“এই পৃথিবীর গুরুভার কাঁধে নিয়েও তিনি লঘুপদে চলার ক্ষমতা হারাননি। যুদ্ধ কিংবা প্রশাসন কখনই তাকে করে তোলেনি এক সঙ্কীর্ণ বিশেষজ্ঞ। তার সংস্কৃতি তাঁর সমকালের যে কোন মানুষের চেয়ে ছিল বিস্তৃত। তিনি ভালবাসতেন শিল্প এবং কবিতা, সঙ্গীত এবং দর্শনকে। জীবনের কঠিনতম মুহূর্তেও তিনি এরই মধ্যে নিমগ্ন হতেন। তাঁর মধ্যে ছিল এক সক্রিয় মানুষের বাস্তবতাবোধ, শিল্পের অনুভূতি, সৃজনশীল স্বপ্নাল ব্যক্তির কল্পনাপ্রবণতা। এতগুলো গুণের সমাহার, আমি মনে করি, আর কোথাও ঘটেনি।”
৪৭. গুলিয়েলমো মার্কোনি (১৮৭৪-১৯৩৭)
বিজ্ঞানের বিস্ময়কর আবিষ্কারের মধ্যে রয়েছে টেলিফোন, গ্রামোফোন, রেডিও, চলচ্চিত্র, টেলিভিশন, মোটগাড়ি ও এরোপ্লেন। এইগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বিস্ময়কর আবিষ্কার হচ্ছে রেডিও। পৃথিবীর যে কোন প্রান্ত থেকে একটা লোকের কণ্ঠস্বর সারা পৃথিবীর মানুষ একই সাথে শুনতে পারে। এই রেডিওর আবিষ্কারক হচ্ছেন দি মার্কিস গিলেরসো মার্কোনি। ইতালির বোলোনিয়া শহরে ১৮৭৪ সালে ২৫ শে এপ্রিল মার্কোনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন ইতালীর এক ধনী ব্যক্তি, মা ছিলেন আয়ারল্যান্ডের।
এই রেডিও আবিষ্কারের আগে মানে মার্কোনির জন্মের আগে আকাশ পথে দূর দূরান্তে শব্দ ও ধ্বনি প্রেরণের বিষয়ে বৈজ্ঞানিক কাজ হয়েছিল। ১৮৬৪ সালে অঙ্ক শাস্ত্রের প্রতিভাবান বিজ্ঞানী জেমস্ ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল বলেছিলেন বিদ্যুৎ তরঙ্গের অস্তিত আছে। যার থেকে জানা যায় বেতার তরঙ্গের দ্রুতি ও বেতার তরঙ্গের দৈর্ঘ্য নির্ণয় করেন। দুঃখের কথা ম্যাক্সওয়েলের এই কথা পরীক্ষা দ্বারা প্রমাণিত না হওয়ায় কেউই তার তত্ত্বকে সম্মান করেনি বরং তাঁকে বিদ্রূপ করেছে। তবে ম্যাক্সওয়েলের তত্ত্বকে স্বীকৃতি দিতে এগিয়ে এলেন বিখ্যাত জার্মান পদার্থবিদ হেনরিখ রুডলফ হার্জ। হার্জের আবিষ্কার ১৮৮৭ ও ১৮৮৯ সালের মধ্যে খুব জনপ্রিয়তা পায়, বহু বিজ্ঞানী বেতর তরঙ্গের উপর গবেষণা করতে লাগলেন। এদের মধ্যে আছেন ইংলন্ডের আলিভার নাজ, রাশিয়ার আলেকজান্ডার পোপোভ, ভারতের জগদীশচন্দ্র বোস, সত্যেন বোস আরও অনেক বিজ্ঞানী, ইতালির অগাস্টো রিঘি তখন বোলোনা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক, রিঘির ছাত্র ছিলেন তরুণ যুবক মার্কোনি।
হার্জের আবিষ্কারের সময় মার্কোনির বয়স ছিল পনের বছর। মার্কোনি তাঁর গৃহশিক্ষকদের কাছ থেকে ব্যাপারটা বুঝে নেন। সেই তখন থেকেই তিনি এই বিষয়ে ভাবনা চিন্তা করতে থাকেন। তিনি ছিলেন ধনী ঘরের ছেলে। তাই বাড়িতে বসেই শিক্ষকদের কাছ থেকে পড়তেন। ১৮৯৫ সালে নিজের বাড়িতে বসে পরীক্ষা চালান। পুরানো সব যন্ত্রপাতি নিয়ে কাজ শুরু করেন। প্রথমে তিনি বেতার সংকেতের কার্যকরী পদ্ধতি তৈরি করেন। এর সাহায্যে তিনি এক মাইল দূরে বেতারবার্তা পাঠাতে পারেন। ১৮৯৬ সালে তিনি দুই মাইল দূরত্বে বেতারবার্তা পাঠাতে পারেন, মার্কোনি তার এই আবিষ্কারের কথা ইতালি সরকারকে জানালেন। কিন্তু ইতালি সরকার তাঁকে অবজ্ঞা করে। উড়িয়ে দিলেন, সে বছরই তিনি ইংল্যান্ডে আসেন তাঁর যন্ত্রের পেটেন্ট করতে। এখানে এসেডাকঘরের প্রধান ইঞ্জিনিয়ারের সাথে তার পরিচয় হয়। তিনি তাদের দেখালেন দশ মাইল পর্যন্ত বেতার বার্তা পাঠানো যায়।
