সিজারের এই পর্বের বিজয় অভিযান শুধু রোমেরই গৌরব বাড়ায়নি, সেই সঙ্গে বাড়িয়েছে তারও গৌরব। কিন্তু সিজার তো শুধু বিজয়ী হয়ে থেমে থাকতে শেখেননি। তিনি চেয়েছিলেন শাসক হতেও। এবং তিনি শাসন করেও গেছেন দূরদৃষ্টি দিয়েই। বিজিতদের নাগরিকত্ব দিয়ে, একই ধরনের সরকার দিয়ে তিনি রোমের ঐতিহ্যকে প্রসারিত করেছিলেন বৃহত্তর ইউরোপে। ছোট ছোট জন গোষ্ঠীকে তিনি শক্তিশালী করেছিলেন। বড় বড় সড়ক নির্মাণে উৎসাহ জুগিয়েছিলেন তিনিই এবং ইউরোপের কৃষক গোষ্ঠীকেও শক্তিশালী করে তুলেছিলেন তিনিই। এইসব সংস্কারের মধ্যে দিয়ে তিনি ইউরোপের নাগরিকদের মধ্যে গড়ে তুলেছিলেন সংহতি।
রাইনের দুপার থেকে আসা অন্যান্য সংঘাত সত্ত্বেও এই উপজাতিগুলোর ওপর প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠা করেন সিজারই। ৫৫ খ্রিস্ট পূর্বাব্দে রাইন নদীর ওপর সেতু বেঁধে তিনি জার্মানদের আক্রমণ করেন। জার্মান অভিযান থেকে ফিরেই তিনি সেতুটি ধ্বংস করে দিয়ে দৃষ্টি ফেরান ব্রিটেনের দিকে। অবশ্য বলা যেতে পারে, প্রকৃত দেশজয়ের চেয়ে যুদ্ধের মহড়া দেওয়া বা শক্তি প্রদর্শনই ছিল এসব অভিযানের লক্ষ্য। কেননা, এদের মধ্যেই কয়েকটি উপজাতি ফেলজিদের সাহায্য করেছিল এবং সিজারের সেনাদলকে মাত্র দুটি বাহিনীতে সীমাবদ্ধ করে কোনদিন। এক একটি বাহিনীতে সৈন্য সংখ্যা ছিল তিন থেকে ছয় হাজার মাত্র। পরের বছর অবশ্য সিজার আবার আক্রমণ চালান। এবার তিনি আসেন পাঁচটি বাহিনী এবং শক্তিশালী অশ্বারোহী বাহিনী নিয়ে। এবার তিনি টেমস নদীর উপড়ে পর্যন্ত চলে যান এবং গলে ফিরে যাবার আগে পরাজিতদের কাছে করও দাবি করেন। তবে এই কর অবশ্য কখনই আদায় করা হয়নি। সিজারের সামরিক জীবনে ব্রিটেন অভিযানের প্রভাব ক্ষণস্থায়ী। কেননা পরবর্তী বছর দুই তিন সিজার ব্যস্ত ছিলেন গলদের অধীনে আনার কাছে। উপজাতিগুলো বিদ্রোহ করেছে, পরাজিতও হয়েছে।
দেশের বিভিন্ন অংশে কঠিন কঠিন অভিযান চালাতে হয়েছে। কিন্তু সে সময় সিজারের বৃহস্পতি ছিল তুঙ্গে। ভাগ্যের সহায়তায় সে সময় সিজার যাতে হাত দিয়েছেন তাতেই সফল হয়েছেন। ৫২ খ্রিস্ট পূর্বাব্দে জারগোভিয়ায় গলনেতা ভার্সিন গেটোরিক্সের হাতে পরাজিত হয়ে তিনি অ্যালেসিয়া (মল্ট-অক্সিস) দখল করে সম্মিলিত গণ বাহিনীকে বিধ্বস্ত করেন। তিনি গলকে তার সাম্রাজ্যের একটি প্রদেশে পরিণত করে বার্ষিক কর ধার্য করেন। কর আদায় বিজিতরা যাতে শান্ত থাকে সে ব্যবস্থাও তিনি করেন। রোমান ঐহিত্য অনুযায়ীই তিনি যতটা সম্ভব পরাজিত শত্রুকে বন্ধুতে পরিণত করার চেষ্টা চালান।
বিজয়ী সিজার কিন্তু এবার রোমে শত্রুতার মুখোমুখি হন। শত্রুরা এবার তার বিরুদ্ধে সক্রিয় হয়ে ওঠে। সিজার জানতেন তার কর্তৃত্ব ভালভাবে প্রতিষ্ঠা করা সত্ত্বেও, ব্যর্থতার বিপদ যে কোন সময়েই আসতে পারে।
৫৬ খ্রিস্ট পূর্বাব্দে যে শাসক ত্রয়ী চক্র গড়ে উঠেছিল, তার মধ্যেও ফাটল দেখা দেয়। তিন বছর পরে ক্রাসাস সিরিয়ায় নিহত হন। ক্ষমতার গগনে তখন দুই সূর্য সিজার এবং পম্পে। অথচ আকাশে তো থাকে একটিই সূর্য। তাই সংঘর্ষ অনিবার্য।
পম্পে সেনেটের পক্ষে চলে গেলেন। সিজারের অধিনায়কত্বে সময় কাল পার হয়ে যাবার পরই সেনেট দাবি করেন, সিজার এবার তার বাহিনী ভেঙে দিক। উত্তরে ইতালির সীমা নির্দেশক ছোট্ট নদী রুবিকন পার হয়ে চলে এলেন সিজার তার বাহিনী নিয়ে। তিনি বলেন, মৃত্যুই ভবিষ্যৎ। এবং সেই অসাংবিধানিক কাজের জন্য যুদ্ধ ঘোষণা করতে বাধ্য হলেন তিনি।
পম্পে পালিয়ে গেলেন। সিজার পূর্ব উপকূলে ব্রিলেশি পর্যন্ত অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করলেন। কিন্তু তখন স্পেনে রয়েছে পম্পের একটি বাহিনী। তাকে তখন প্রথমে সেনাপতিহীন একটি বাহিনীর সঙ্গে লড়তে হবে এবং তারপর তাড়া করতে হবে পম্পেকে এবং লড়তে হবে বাহিনীহীন এক সেনানায়কের সঙ্গে। পশ্চিমে সংক্ষিপ্ত এবং সফল অভিযান চালিয়েই তিনি রোমে ফিরে এলেন। ফিরে আসার পরেই তিনি কন্সল নির্বাচিত হলেন এবং পূর্বাঞ্চলে অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। ৪৮ খ্রিস্ট পূর্বাব্দে থেশানির ফ্যারশালস যুদ্ধে সিজার বিপুল ভাবে জয়লাভ করলেন। পম্পে এবার পালালেন মিশরে কিন্তু সেখানে তাকে খুন করা হয়।
শক্রর সন্ধানে সিজার মিশরে আসেন। বলা হয় এখানে তিনি বন্দি হন। বন্দি হন যুদ্ধে নয়, বন্দি হন রানি ক্লিওপেট্রার রূপের আগুনে। এখানে সিজারের একটি ছেলেও হয়। সিজার যখন মিশরে ক্লিওপেট্রার রূপমুগ্ধ সেই সময় তার শত্রুরা শক্তি সংগ্রহের সময় পেয়ে যান। সিজার শত্রুর সামনেই ফিরতে বাধ্য হন।
সিজার এবার এশিয়া মাইনরের দিকে যান। সেখানে তিনি পম্পের এক পুরনো সহযোগীকে পরাজিত করেন। এই সহযোগী হলেন পন্টাসের রাজা ফারনাসেস। তাঁরা জিলার কাছে এক তুমুল যুদ্ধে লিপ্ত হন। এই যুদ্ধে জয়ের ফলে সিজার নিজের অবস্থা
আরও জোরদার করেন। এই যুদ্ধে জয়ের ফলে সিজার নিজের অবস্থা আরও জোরদার করেন। এই অভিযানের সময় সিজার উচ্চারণ করেন সেই বিখ্যাত উক্তিভিনি, ভিডি, ভিসি–এলাম, দেখলাম, জয় করলাম।
ইতালিতে ফেরার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই আবার সিজারকে বেরতে হল বিদ্রোহ দমনে। এবার তিনি ভূমধ্যসাগর পার হয়ে আফ্রিকা অভিযানে গেলেন।
