রোমের যে সম্ভ্রান্ত পরিবারে সিজারের জন্ম, সেই পরিবারটি নিজেদের মনে করত স্বর্গের দেবতা ভেনাস এবং ইলিয়াসের উত্তরপুরুষ হিসেবে। এই দেবতার সঙ্গে সংযোগের এই ধারণাটাই স্ফীত করেছিল সিজারের গর্বকে এবং হয়তো এই গর্বই পরবর্তীকালে তাকে ভাবতে শিখেছিল, তার সমস্ত শক্তি সত্যই অতিমানবিক।
যুবক জুলিয়াসে যুক্ত হয়েছিলেন তার মহান জেনারেল ম্যারিয়াসের দলে। এই দল যখন ক্ষমতা দখল করে তখন পুরস্কার হিসেবেই রোমানদের প্রধান দেবতা জুপিটারের অর্চক পদে নিযুক্ত হন জুলিয়াস। কিন্তু এই সাফল্য ছিল ক্ষণস্থায়ী। এর কিছুদিন পরেই সপ্তমবারের জন্য কনশান পদে নির্বাচিত ম্যারিয়াসের জীবনাবসান হয়। আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই পদ এবং সম্পত্তি দুই হারিয়ে রোম ছাড়তে হয় ম্যারিয়াসের অনুগামীদের।
বিরোধী দল নেতা সুল্লা বিজয়ীর বেশে ফিরে আসেন রোমে। সুল্লা সিজারকে ক্ষমা করতে রাজি ছিলেন একটি মাত্র শর্তে। সে শর্ত, ঘৃণিত গণতান্ত্রিক দলের সঙ্গে যুক্ত তার যুবতী স্ত্রীকে পরিত্যাগ করতে হবে। সিজার রাজি হলেন না। এই রাজি না হওয়ার জন্য সিজারকে বরণ করতে হয় ভয়ানক বিপদকে। রোম আর তার পক্ষে তখন নিরাপদ জায়গা নয়। সিজার তাই তার সৈন্য বাহিনী নিয়ে ঘুরতে থাকেন পূর্বদিকে। এই সময়েই যুদ্ধ সম্পর্কে প্রথম শিক্ষাটি নেন তিনি, সেই শিক্ষাই পরবর্তীকালে তাকে বিরাট ভূমিকা নিতে সাহায্য করেছিল। রাজনীতির দাক্ষিণ্য আবার যখন তার ওপর বর্ধিত হল, তখন তিনি রোম ফিরে এলেন আইন শিক্ষার জন্য। সেটাই হল তাঁর রাষ্ট্র নায়ক হবার সোপান।
রোডসে বিখ্যাত অ্যাপেলেনিয়াস মোলোনের কাছে বাগীতা শিখতে গিয়ে সিজার কিছু অসৎ আমোদ প্রমোদের প্রতি আকৃষ্ট হলেন। সেনাজীবনের নানা অসুবিধা আর শিক্ষণজীবনের নিষ্ঠার বাইরে এই জীবন বেশি করে টানতে থাকল সিজারকে। নাগরিক জীবনের বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম জুয়ায় কেটে যেত তার দিনের অনেকটা সময়। ধারের পর ধারে তিনি যেন আকণ্ঠ ডুবে যেতে থাকলেন। শোনা যায় এক সময় তার ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় দুলক্ষ পাউন্ড। এই সময়ই স্পেনের গভর্নর পদে নিয়োগ করা হয় সিজারকে। কিন্তু তার মহাজনেরা তার স্পেনে যাওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তাদের এক কথা, আগে ঋণের অর্থ মেটাও তারপর যেখানে খুশি যাও।
এই সময় সিজারের ত্রাতা হিসেবে দেখা দিলেন রোমের বিখ্যাত ধনী ক্রাসাস। সিজারের হয়ে তিনি সব ঋণ মিটিয়ে দিলেন। কথা রইল, সিজার যখন আবার আর্থিক দিকে সচ্ছল হবে এবং সামরিক অভিযানের মাধ্যমে নিজের সুনামকে বাড়াবেন সেই সময় মিটিয়ে দেবেন ক্রাসাসের সব টাকা।
অসাধারণ দক্ষতায় সিজার এবার ধনী ক্র্যাসাসের সঙ্গে বরি পম্পের বিরোধ মিটিয়ে আবার তাদের বন্ধু করে তুললেন। এই পম্পের সামরিক দক্ষতা তাঁকে রোমের সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যক্তি করে তুলেছিল। ৬০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে, এই তিনজন মিলে যে শাসক চক্র গড়ে তুললেন তাই হল রোমের প্রথম ত্রয়ীশাসক চক্র। সিজার কন্সাশ হলেও সামরিক বিভাগের পরিবর্তে পেলেন সড়ক ও বনাঞ্চল রক্ষার দায়িত্ব।
ইউরোপের উত্তরাঞ্চলের ঘটনাপ্রবাহ তখন নজরে পড়ার মত। রাইন নদীর উত্তর তীরে জার্মান উপজাতিরা নিজেদের ততদিন প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছে। সেই প্রতিষ্ঠার ফলেই তারা গলে রোমকে চ্যালেঞ্জ করার সাহসও অর্জন করেছে। এসব ক্ষেত্রে অতীতে রোম তার শত্রুকে পূর্বদিকে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের দিকে ঠেলে নিয়ে যেত। কিন্তু এবার সিজার তাদের উত্তর পশ্চিমে ঠেলে দিলেন। ইউরোপ যখন উপজাতি বা জাতির মহাসজ্ঞা হিসেবে গড়ে উঠছে সে সময়ও সিজারের এই দক্ষতার প্রকাশ ঘটল। আল্পসের অপর পারে যে অঞ্চল সেখানকার দায়িত্বভার চাইলেন সিজার। যখন সে ভার তাকে দেওয়া হল তিনি উৎফুল্ল হলেন বেশ ভাল পরিমাণেই। কিন্তু এই সময়ই তাকে মোকাবিলা করতে হয় বেশ কিছু কঠিন পরিস্থিতিও। শুধু যে জার্মানরাই শক্তিশালি হয়ে উঠে রোমকে চ্যালেঞ্জ করেছে তা নয়, বর্তমানের সুইজারল্যান্ড অঞ্চল থেকে এক সময় জার্মানরা বিতাড়িত করে ছিল হেলভেশিদের। সেই হেলভেশিরাও এবার রোমানদের আটলান্টিকে পৌঁছাবার যে অঞ্চলটি ১২১ খ্রিস্টপূর্বাব্দে থেকে রোমের দখলে ছিল সেই অঞ্চল দিয়ে যাতায়াতের অধিকার দাবি করল। এই দ্বিতীয় দাবির মোকাবিলায় সিজার অসাধারণ বুদ্ধির পরিচয় দেয়। তিনি তার সেনাবাহিনীকে দ্রুত ফিরিয়ে এনে নতুন করে সংগঠিত করে হিন্দুমাত্র দেরি না করে আক্রমণ চালান এবং শেষ পর্যন্ত হেলভেশিদের পরাজিত করেন।
এই জয়ের পরেই সিজারকে জার্মানদের হাত থেকে গল গোষ্ঠীগুলোকে রক্ষা করতে বলা হয়। জার্মান রাজ অ্যারিভিসটাসের সঙ্গে সিজারের বৈঠকও হল। রাইনের এপার থেকে গলদের নতুন করে অভিযান চালানোটাই তখন সমাধানের একমাত্র রাস্তা। তাই সিজার আক্রমণই চালালেন। আক্রমণকারীদের হঠিয়ে দিলেন রাইনের ওপারে।
পরবর্তীকালে ৫৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দে উত্তর গলে নার্ভি এবং বেলজিদের উত্থানকে দমন করার সময় সিজারকে বেশি বেগ পেতে হয়েছিল। সে সময় বেলজিয়াম যুদ্ধের যে বিবরণ সিজার লিখে রেখেছিলেন ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ও গর্বের সঙ্গেই স্মরণ করা হত। পরের বছরই সিজার ব্রিটেনের ভেনেশি এবং অন্যান্য উপজাতির পরাজিত করে আরও একবার আগ্রাসী জার্মানদের রাইনের ওপারে হঠিয়ে দেন।
