গুটেনবার্গের কাঠের টাইপ আজও বিজ্ঞান জগতে এক শ্রেষ্ঠ অবদান। তার সময়ে চৌষট্টি পৃষ্ঠার জীবনীগ্রন্থ ও বাইবেলকেও বিস্ময়কর ঘটনা ছাড়া ভাবা যায় না। এই বিজ্ঞানী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ১৪৬৮ সালে।
আজ পৃথিবীতে ছাপাখানার অনেক আধুনিক উন্নতি হয়েছে। ১৮৮৬ সালে ওটসার মারগেন থ্যাসার নামে এক আমেরিকান যন্ত্রবিদ লাইনো পাইপ যন্ত্র আবিষ্কার করেন। পরে অবশ্য মনোটাইপ, অফটেস আবিষ্কার হয়ে মুদ্রণ শিল্পকে উন্নত হয়েছে। তবে গুটেনবার্গ হচ্ছে মুদ্রণ শিল্পের প্রথম ও প্রধান জন্মদাতা।
৪৬ জুলিয়াস সিজার (খ্রি: পূ: ১০০খ্রি: পূ: ৪৪)
কপালের লিখনই ছিল তাই। প্রথম, সিজার প্রথমই হবে। রোমে যদি দ্বিতীয় হতে হয় তবে সিজার বরং গ্রামে যাবে– যেখানে সে প্রথম হয়ে থাকবে। তবুও প্রথমই হতে হবে তাকে। সেটাই তার ভাগ্যলিপি! সিজারের ভাগ্যই ঠিক করে রেখেছিল, গ্রাম নয়, রোমেই প্রথম হবে সিজার। সে নেবে ‘পিতৃভূমির পিতা’ এই গর্বিত উপাধি। এসবই যেন ছিল পূর্বনিদিষ্ট। সিজার যদি আরও একটু কম উচ্চাকাঙ্ক্ষী হতো, তাহলে ইউরোপের ইতিহাস, তার সভ্যতার ধারা হয়তো বইতো অন্য খাতে।
সিজার এমন এক ব্যক্তি, যার দাবি ঈশ্বরের সঙ্গে আত্মীয়তার সূত্রে বদ্ধ তিনি। আর সিজার যখন ক্ষমতার মধ্যগগনে, তখন তার ঘোষণা, আত্মীয় নয়, তিনিই স্বয়ং ঈশ্বর। সিজার হল সেই ব্যক্তি যিনি রোমান সাম্রাজ্যের সীমানাকে উত্তর ও পশ্চিমে বিস্তৃত করেছেন, মানব ইতিহাসে এমন এক চিহ্ন রেখে গেছেন যা মুছবে না কোন সময়ই।
একদিন যে পথে সিজারের বাহিনী রোম থেকে বেরিয়েছিল বিশ্বজয়ে, একদিন পৌত্তলিক প্রতিভা সাম্রাজ্যের যে ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল–তারই ওপর গড়ে উঠেছিল খ্রিষ্ট্রীয় ইউরোপের বিরাট পরিকাঠামো। সিজারের সেই পথ ধরেই কয়েক শতাব্দী পরে খ্রিষ্ট্রীয় মিশনারিরা বেরিয়েছিল খ্রিস্ট ধর্মের অনুশাসনে পৃথিবী জয়ে।
১০২ খ্রিস্ট পূর্বাব্দে সেই মাসে–যে মাসটার নাম তারই প্রতি সম্মান জানাতে চিহ্নিত হয়েছিল জুলাই নামে, সেই ১০২ খ্রিস্ট পূর্বাব্দের জুলাইয়ে তাঁর জন্মের কয়েক প্রজন্ম আগেও একটা সংগ্রাম শুরু হয়েছিল। কিন্তু তার গতি ছিল এলোমেলো। কখনও এদিকে। কখনও ওদিকে। ভূমধ্য সাগরের তীরে সভ্যতার কেন্দ্র হবার জন্য ছিল সে সংগ্রাম। গ্রীকরা তাদের যুদ্ধ জয়ের মধ্য দিয়ে দর্শন, সাহিত্য এবং শিল্পে বিস্ময়কর অগ্রগতির মধ্য দিয়ে মানব ইতিহাসে রেখে গেছে তাদের সদম্ভ উপস্থিতির চিহ্ন। কার্থে জিয়রা উন্নীত হয়েছিল বণিক জাতি হিসেবে শাসিত হয়েছিল বণিক ও ধনীদের দ্বারা আর সব সময় অন্তরে পুষে রেখেছিল ক্ষমতা দখলের বাসনা। আর সেই সময়ই গর্ভলক্ষ্মণহীন ইতালির মাটিতে নয়া উপনিবেশ গড়ছিল যারা তারা গ্রীক পর্যটক এবং বণিকদের কাছে থেকে দ্রুত শিখে নিচ্ছিল অনেক কিছু এবং ক্রমেই ধনী প্রতিবেশীদের ভয়ের কারণ হয়ে উঠছিল।
সে সময় রোমকে কেন্দ্র করে বলিয়ান হয়ে উঠলি যে রোমিওরা, তাদের সঙ্গে কাথেজিওদের শুরু হয়ে গিয়েছিল ক্ষমতা দখল ও শ্রেষ্ঠত্বের এক তীব্র লড়াই। সে লড়াই ছিল অস্তিত্ব রক্ষারও লড়াই। কার্থেজওদের শাসন বিস্তৃত ছিল স্পেন এবং গলের দক্ষিণ উপকূল ভাগ ধরে। রোমানরা তাদের দেখতে রীতিমত ভয়ের চোখে। কার্থেজিও নেতা হানিবলের সঙ্গে লড়াইয়ে তরা বিপর্যস্তও হয়। তাদের পরাজিত করেই হানিবলের বাহিনী অতিক্রম করে আল্পস পর্বতমালাও, বিধ্বস্ত করে ইতালিকে। এই ব্যর্থতা, এই বিপর্যয় সত্ত্বেও রোমানরা কিন্তু জাতি হিসেবে নিশ্চিহ্ন হয়ে হয়ে যায়নি। সে সময় রোম যে আশ্চর্য অনুষ্ঠানের কৌশল নিয়েছিল তারই কাছে হেরে যেটুকু জয় করেছিল সেটুকুই খুইয়ে বসে হানিবল। পরিণতিতে পূর্ণ প্রতিশোধই নেয় রোম। শুধু অধিকার নয়, কার্থেজকে ধ্বংস করে দেয় তারা। এবং শেষ পর্যন্ত তারাই হয় ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের শ্রেষ্ঠ।
রোমানদের শক্তিই নিহিত ছিল এর মধ্যে। সব কিছু গ্রহণ ও আত্মস্থ করার অসামান্য দক্ষতা ছিল তাদের। সেই সঙ্গে তারা জানত জয়ের ফলাফলকে নিজেদের কাজে লাগাতে। কার্থেজের সাধারণ মানুষের নৈতিক বল ছিল খুবই কম। তারা ছিল মুনাফা তৈরির যন্ত্রের একটি অংশ মাত্র। গ্রীসের শাসকরা অধীনস্থ রাজ্যগুলোকে হেয় করে রেখে করেছিল বিরাট ভুল। কিন্তু রোম যেমন অন্যর কাছ থেকে চিন্তাধারা গ্রহণের ব্যাপারে অকৃপণ ছিল তেমনি গ্রীক দেবতাদের মেনে নিয়েও তারা সেই দেবতাদের দেয় নতুন নতুন নাম। সেই সঙ্গে এই ভূমির অভিবাসনকারী অথবা তার অধিকৃত অঞ্চলের লোকজনের সঙ্গে ও সে এমন ব্যবহার করত যাতে তারা স্বেচ্ছায় এর সঙ্গে একাত্ম হয়ে যেত।
রোম বরাবরই শিক্ষা নিত ইতিহাস থেকে। সে জানত, একটি বিজয়ী শক্তি যখন জোর করে বিজিতের ওপর সবকিছু চাপিয়ে দেয়, তখন সঙ্কটের সময় একটা বড় ফাটল দেখা দিতে বাধ্য। অন্যের নীতি অনুসরণের মধ্য দিয়ে রোম খুঁজে পেত তার শক্তি। ঔপনিবেশিকদের চাতুর্যে, নাগরিকত্ব দানের মধ্য দিয়ে, সরকারের সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি রূপায়ণের মধ্য দিয়ে রোম তার প্রতিপক্ষের সামনে খাড়া করে শক্ত প্রতিরোধের প্রাচীর।
জুলিয়াস সিজারের জীবন ও কর্মধারা আলোচনার সময় ইতিহাসের ঐ প্রেক্ষাপটটি মনে রাখা দরকার। এই প্রেক্ষাপট জানা না থাকলে, জুলিয়াস সিজার কিভাবে তার সমকালের বহু গুণাবলী এবং দোষ ত্রুটি ও অন্যায়ের বিরল নজির হয়ে উঠেছিলেন তা ঠিক বোঝা যাবে না।
