নেপোলিয়নের বাস্তব বুদ্ধিবোধ এত প্রখর ছিল, তিনি গণভোটের আয়োজন করলেন, যাতে সর্বসমক্ষে প্রমাণিত হয়ে যায় তিনি জনগণের দ্বারা নির্বাচিত হয়েই সম্রাট পদে অভিষিক্ত হয়েছেন। তখন ফ্রান্সের জনগণের কাছে নেপোলিয়ন এক অলৌকিক শক্তিসম্পন্ন সকলের ধারণা ছিল তিনিই ফ্রান্সের রক্ষাকতা। তাই নির্বাচনে সমগ্র জনগণের জনসমর্থন লাভ করে হয়ে উঠলেন ফ্রান্সের একচ্ছত্র অধিপতি।
এইবার দেশের উন্নয়নের কাজে হাত দিলেন। দীর্ঘদিন বিপ্লবের উন্মাদনায়, যুদ্ধবিগ্রহের তাণ্ডবে প্রকৃতপক্ষে দেশের সমস্ত উন্নয়নের কাজ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, দেশের অর্থনৈতিক অবস্থাও ভেঙে পড়েছিল।
নেপোলিয়ন দেশকে ৮৩টি প্রদেশে ভাগ করে প্রতিটি প্রদেশ দেখাশুনার জন্যে একজন করে শাসক নির্বাচিত করলেন। সেই শাসকের উপর তার প্রদেশের সম্পূর্ণ দায়িত্ব আরোপ করা হল। বিচার বিভাগের সংস্কার করলেন, নতুন বিচারক নিয়োগ করলেন। যাতে কোন দুর্নীতিগ্রস্ত লোক বিচারক হিসাবে নিযুক্ত হতে না পারেন সেই জন্যে বিচারক নির্বাচনের ভার নিজের হাতে নিলেন।
দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নতির জন্য তৈরি করা হল ব্যাঙ্ক অব ফ্রান্স’ নামে জাতীয় ব্যাঙ্ক। এই ব্যাঙ্কের উদ্দেশ্য ছিল যাতে জনগণ, ব্যবসায়ীরা তাদের সঞ্চিত অর্থ এখানে জমা রাখতে পারে, এবং শিল্প ব্যবসা বাণিজ্যের প্রয়োজনে অর্থ ঋণ হিসাবে পেতে পারে।
তিনি কর ব্যবস্থাকে সুবিন্যস্ত করলেন। এতদিন সরকারের তরফে কর আরোপ করা হত। লোকেরা সেই কর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জমা দিত না। কর আদায়ের ক্ষেত্রেও কোন সুষ্ঠু নীতি ছিল না। নেপোলিয়ন শুধু পুরনো নীতিকে নতুনভাবে বলবৎ করলেন না, জনগণ যাতে প্রবর্তিত কর ব্যবস্থাকে গ্রহণ করে স্বেচ্ছায় কর দেয় তার জন্যে তাদের উৎসাহিত করতে লাগলেন। কর আদায়ের ক্ষেত্রে সুষ্ঠু ব্যবস্থা গ্রহণ করা হল। এর ফলে অল্পদিনের মধ্যেই ভেঙে পড়া অর্থনীতি সজীব হয়ে উঠল।
আইন বিচার অর্থনৈতিক উন্নতির সাথে নগর উন্নয়নের দিকে নজর দিলেন নেপোলিয়ন। তৈরি হল নতুন রাস্তাঘাট শিক্ষাকেন্দ্র।
তবে নেপোলিয়নের গুরুত্বপূর্ণ এবং বিখ্যাত কাজ হল নতুন আইন বিধি যা নেপোলিয়ন কোড (Code Nepoleon) নামে পরিচিত, তাকে প্রচলন করা। নেপোলিয়ন অনুভব করেছিলেন দেশের প্রচলিত আইন সাধারণ মানুষের প্রয়োজন মেটাতে অক্ষম। সেই কারণেই দেশের বিশিষ্ট আইনজ্ঞদের পরামর্শে নতুন আইন বিধি গড়ে উঠল।
এই সময় কাজের জন্য দেশের মানুষের গভীর আস্থা অর্জন করলেন নেপোলিয়ন।
নেপোলিয়ন যতই তার ক্ষমতা প্রভুত্ব বিস্তার করছিলেন, ততই বিপ্লবের মূল আদর্শ থেকে ফ্রান্স দূরে সরে আসছিল। নেপোলিয়ন নিজেও বিপ্লবের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন না। তাই তিনি বলেছিলেন, আমিই বিপ্লবকে ধ্বংস করেছি।
সেই মুহূর্ত ফ্রান্সে শান্তি-শৃঙখলা প্রতিষ্ঠিত হল, সেই সময় ইংরেজদের সাথে আবার নেপোলিয়নের বিবাদ শুরু হল। ১৮০৫ সালে ইংরেজ নৌবাহিনী ফরাসী নৌবহরকে পরাজিত করল। নৌযুদ্ধ ইংরেজদের কাছে পরাজিত হয়ে নেপোলিয়ন তাদের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ শুরু করলেন। তিনি ইংরেজদের বলতেন ‘দোকানদারের জাত’। ইউরোপের কোন বন্দরে যাতে ইংলন্ডের কোন পণ্য প্রবেশ করতে না পারে তার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করলেন। এর ফলে শুধু ইংলন্ড নয়, অন্য দেশের উপর অর্থনৈতিক প্রভাব পড়ল। ফলে ইউরোপের প্রতিটি দেশই নেপোলিয়নের উপর ক্রদ্ধ হয়ে উঠল।
রাশিয়ার সঙ্গে ফ্রান্সের মৈত্রী সম্পর্ক ছিল। কিন্তু নেপোলিয়নের আচার-আচরণ মেনে নিতে পারছিলেন না রাশিয়ার জার। তিনি নিজের দেশের সমস্ত বন্দর ইংলন্ডের জন্য উন্মুক্ত করে দিলেন এবং তাদের সঙ্গে ব্যবসা শুরু করলেন।
রাশিয়ার এই আচরণে ক্রুদ্ধ হয়ে উঠলেন নেপোলিয়ন। তিনি স্থির করলেন রাশিয়া আক্রমণ করবেন। ছয় লক্ষ সৈন্য সংগ্রহ করা হল। এই বিশাল বাহিনী নিয়ে এগিয়ে চললেন নেপোলিন। এই রাশিয়া আক্রমণ নেপোলিয়নের জীবনের সবচেয়ে বড় ভ্রান্তি।
রাশিয়ার জার জানতেন নেপোলিয়নের সৈন্যবাহিনীর মোকাবিলা করা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়, তাই রুশ বাহিনী ফরাসী সৈন্যদের আক্রমণ না করে পিছু হটতে আরম্ভ করল। শহর নগর গ্রাম যা কিছু ছিল সব নিজেরাই ধ্বংস করে দিল। যুদ্ধক্ষেত্রে এই কাজকে বলে পোড়ামাটির নীতি। ফরাসী সৈন্যবাহিনী বিনা বাধায় মস্কোয় প্রবেশ করে শহর দখল করে নিল। জার তখন মস্কো ত্যাগ করে পিটসবার্গ দুর্গে অবস্থান করেছিলেন। নেপোলিয়ন মস্কো জয় করার অল্পদিনের মধ্যেই শীত এসে গেল। রাশিয়ার ভয়াবহ ঠাণ্ডা সহ্য করবার ক্ষমতা ছিল না ফরাসী সৈন্যদের। তারা ফিরে চলল ফ্রান্সের দিকে। তখন বরফ পড়তে আরম্ভ করেছে। নিজেদের সঞ্চিত খাবার ফুরিয়ে গিয়েছে। পথের কষ্টে শত শত সৈনিক মারা পড়তে আরম্ভ করল। তাদের দুর্বলতার সুযোগে রুশ সৈন্যবাহিনী ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে ফরাসীদের উপর অতর্কিতে আক্রমণ শুরু করল। তার সাথে রুশ গোলন্দাজ বাহিনীর আক্রমণে ফরাসী সৈন্যবাহিনীর প্রায় সমস্ত সৈন্যই মারা পড়ল। ছল লক্ষ সৈন্যের মধ্যে মাত্র বিশ হাজার সৈন্য নিয়ে ফ্রান্সে এসে পৌঁছেলেন নেপোলিয়ন।
তাঁর এই পরাজয়ে ইউরোপের সমস্ত দেশ একত্রিত হয়ে সম্মিলিতভাবে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করল। এই বিশাল শক্তির সাথে লড়াই করবার ক্ষমতা ছিল না নেপোলিনের। রাশিয়া আক্রমণের ফলে তার সৈন্য সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়েছিল। বিরোধী পক্ষের আক্রমণের মুখে পিছু হটতে আরম্ভ করলেন। বিরোধী পক্ষ চারদিক থেকে প্যারিস অবরুদ্ধ করে ফেলল। নেপোলিয়নের সৈন্যরাও তাঁকে ত্যাগ করল। নিরুপায় নেপোলিয়ন ১৮১৪ সালের ১১ই এপ্রিল সিংহাসন ত্যাগ করলেন। তাঁকে এলবা দ্বীপে নির্বাসন দেওয়া হল।
