নেপোলিয়ন তার নৌবহর নিয়ে এসে উপস্থিত হলেন নীলনদের মোহনায়। সেখানে সুসজ্জিত নৌবহরকে রেখে নেপোলিয়ন তাঁর সৈন্যবাহিনী নিয়ে মিশরের অভ্যন্তরে প্রবেশ করলেন। এই সুযোগে ইংরেজ নৌ সেনাপতি নেলসন তার সুদক্ষ নৌবাহিনী নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল ফ্রান্সের নৌবহরের উপর। ফ্রান্সের নৌবাহিনী সম্পূর্ণভাবে পরাজিত বিধ্বস্ত হল।
নেপোলিয়ন মিশরের বিস্তৃত অঞ্চল দখল করলেও নৌবাহিনীর পরাজয়ে ফ্রান্সের সাথে তাঁর সমস্ত সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল এবং নেপোলিয়ন যাতে ফ্রান্সে ফিরে যেতে পারেন তার জন্যে সমস্ত জলপথ অবরোধ করে ফেললেন নেলসন।
নেপোলিয়নের কাছে সংবাদ এল, ফ্রান্সের রাজনৈতিক পরিস্থিতি মোটেই সন্তোষজনক নয়। দেশ জুড়ে শুরু হয়েছে বিক্ষোভ আর বিদ্রোহ। যে সমস্ত দেশকে তিনি পরাজিত করে ফ্রান্সের অধিকার ভুক্ত করেছিলেন তারা নতুন শক্তি সংগ্রহ করে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। দেশের নেতৃত্বের ভার যাদের উপর আরোপ করা হয়েছে তারা সকলেই অযোগ্য। দেশ শাসনের সামান্যতম ক্ষমতা নেই।
ফ্রান্সের এই সংকটময় পরিস্থিতিতে সেখানে ফিরে যাওয়া একান্ত প্রয়োজন বিবেচনা করে প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে মাত্র দুখানা রণতরী নিয়ে নেলসনের নৌবাহিনীর সতর্ক দৃষ্টি এড়িয়ে ফ্রান্সে এসে পৌঁছলেন।
ফ্রান্সের শাসনভার পরিচালনার দায়িত্ব ছিল কিছু অযোগ্য লোকের দ্বারা পরিচালিত ডাইরেক্টরীর উপর। এই ডাইরেক্টরী দেশ শাসনের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, তারা সম্পূর্ণভাবে নেপোলিয়নের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল।
দেশের মানুষের ক্ষোভ অসন্তোষ ক্রমশই বেড়ে যাচ্ছিল। নেপোলিয়ন আর মুহূর্ত মাত্র বিলম্ব করলেন না। তিনি তাঁর সামরিক শক্তির প্রভাবে ডাইরেক্টরী ভেঙে দিয়ে কনসলেট ছিল সম্পূর্ণভাবে নেপোলিয়নের আজ্ঞাধীন। প্রকৃতপক্ষে নেপোলিয়ন হয়ে উঠলেন ফ্রান্সের সর্বময় কর্তা।
বহুদিন ধরেই নেপোলিয়ন রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করবার জন্য মানসিক দিক থেকে প্রস্তুত হচ্ছিলেন। তিনি জানতেন তাঁকে বাধা দেওয়ার ক্ষমতা কারো নেই। তবুও তিনি সামরিক ক্ষমতা বলে এই অধিকার অর্জন করতে চাননি। তিনি সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন। অবশেষে তাঁর সৌভাগ্যের সূর্য উদিত হল।
তিনি ইতালি জয়ের পরেই তাঁর প্রিয় সঙ্গীদের কাছে বলেছিলেন, “তোমরা মনে করো না যে আমি ডাইরেক্টরীর জন্য এই যুদ্ধ জয় করেছি, এই জয় আমার উন্নতির সূচনা মাত্র।”
নেপোলিয়ন নতুন যে শাসন ব্যবস্থা স্থাপন করলেন তার নাম দেওয়া হল কনসলেট। এই কনসলেট অল্প কয়েকজন সত্যের দ্বারা গঠিত হল। নেপোলিয়ন হলেন প্রথম কনসাল। তাঁর হাতেই সমস্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত ছিল। অন্য সদস্যরা ছিল প্রকৃত অর্থে পুতুল মাত্র।
নতুন এই ব্যবস্থা সম্বন্ধে জনগণের মত নেওয়ার জন্য সমস্ত ফ্রান্সে ভোট নেওয়া হল। সেই সময় নেপোলিয়ন বোনাপার্ট-এই একটি নাম সমগ্র দেশবাসীর কাছে এমন এক মোহজাল বিস্তার করেছিল, বিপুল ভোটে তারা নেপোলিয়নকে জয়যুক্ত করল।
ফ্রান্সের সর্বময় কর্তা হিসাবে আইনসংগতভাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে নেপোলিয়ন ঘোষণা করলেন, (১৭৯৯ সালের ১৫ই ডিসেম্বর) “বিপ্লবের উদ্দেশ্য সফল হয়েছে, এইবার বিপ্লবের সমাপ্তি ঘটল।”
ফ্রান্সের সাময়িক বিপর্যয়ের সুযোগ ইউরোপে গড়ে উঠল দ্বিতীয় শক্তি সঙ্। এই সঙ্গে যোগ দিয়েছিল ইংলন্ড, অস্ট্রিয়া, রাশিয়া। তাদের একটি মাত্র উদ্দেশ্য ছিল ফ্রান্সে নব গঠিত শাসন ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে পুনরায় রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা। ইউরোপের প্রতিটি দেশে রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত ছিল। ফরাসী বিপ্লবের দ্বারা যেভাবে সে দেশের মানুষ ক্ষমতা অর্জন করেছে, তার প্রতিক্রিয়া তাদের দেশেও পড়তে পারে। একদিকে যেমন এই আশঙ্কা ছিল অন্যদিকে নেপোলিয়নের রণকুশলতায় সকলেই ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছিল। তাই তাকে ধ্বংস করবার জন্য সম্মিলিতভাবে যৌথ উদ্যোগ পড়ে তুলল।
নেপোলিয়ন অনুভব করতে পেরেছিলেন এই সম্মিলিত শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা এই মুহূর্তে অসুবিধাজনক। তাই তিনি ইংলন্ডের প্রধানমন্ত্রী পিট ও অস্ট্রিয়ার রাজার কাছে সন্ধির প্রস্তাব করলেন। এর পেছনে তার দুটি উদ্দেশ্য ছিল। তিনি সাময়িকভাবে যুদ্ধ ও রক্তপাত থেকে নিবৃত হতে চাইছিলেন। দ্বিতীয়ত যদি সন্ধির প্রস্তাব অগ্রাহ্য হয়, সেক্ষেত্রেও তিনি নিজের শক্তি বৃদ্ধি করবার সময় পাবেন।
নেপোলিয়নের সন্ধির প্রস্তাব দুই তরফেই অগ্রাহ্য করা হল। মাত্র এক বছরের মধ্যে নেপোলিয়ন নিজের সৈন্যবাহিনীকে নতুন করে সুসংহত করে ইতালি আক্রমণ করলেন। অন্যদিকে তার সেনাপতি অস্ট্রিয়া আক্রমণ করল। এই যুদ্ধের ফলে বিশাল অঞ্চল ফ্রান্সের অধিকারভুক্ত হল। তারা ফ্রান্সের সঙ্গে সন্ধি করতে বাধ্য হল। এইভাবে দ্বিতীয় শক্তি সজ্ঞের অবসান ঘটল।
নেপোলিয়ন নিজেকে সম্রাট বলে ঘোষণা করে প্রকৃতপক্ষে একনায়কতন্ত্রের শাসন প্রতিষ্ঠা করলেন। যে প্রজাতন্ত্রের জন্য ফরাসী বিপ্লব ঘটেছিল তার উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ ব্যর্থ হল। এই ক্ষমতা দখল প্রসঙ্গে নেপোলিয়ন বলেছিলেন, “ফ্রান্সের রাজমুকুট মাটিতে পড়েছিল, আমি সেই মুকুট তরবারি দিয়ে মাথায় তুলে নিয়েছি।”
