নেপোলিয়নের অবর্তমানে সিংহাসনে বসলেন ফ্রান্সের বুরবো পরিবারের অষ্টাদশ লুই। সাথে সাথে অভিজাত সম্প্রদায় দেশে ফিরে এল। দেশে নতুন করে রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হল। ফরাসী জনগণ কিছুতেই এই নতুন শাসনব্যবস্থাকে মেনে নিতে পারছিল না। ফরাসী সৈন্যবাহিনীও নেপোলিয়নকে আদর্শ বীর হিসাবে মনে করত। দেশের মধ্যে গোলযোগ শুরু হল।
এলবা দ্বীপে অবস্থানকালে ফ্রান্সের এই অবস্থার কথা শুনে গোপনে দেড় হাজার সৈন্য নিয়ে নেপোলিয়ন প্যারিসে এসে উপস্থিত হলেন।
এই সংবাদ পেয়ে রাজা লুই তার সৈন্যবাহিনীকে পাঠালেন নেপোলিয়নকে বন্দী। করবার জন্য। সৈন্যবাহিনী এসে যখন চতুর্দিকে তাদের সামনে এসে বললেন, তোমরা যদি আমাকে হত্যা করতে চাও, তবে স্বচ্ছন্দ মনে তা করতে পার। আমি তোমাদের সম্রাট, তাই তোমাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছি।
তাঁর এই ব্যক্তিত্ব, সাহস, আকর্ষণীয় শক্তিতে মুগ্ধ হয়ে সৈনিকরা লুই এর পক্ষ ত্যাগ করে তাকে সমর্থন করল। ফরাসী সেনাপতি বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে নেপোলিয়নের পক্ষে যোগ দিলেন।
রাজা লুই বুঝতে পারলেন আর তাঁর পক্ষে প্যারিসে সমর্থন পাওয়ার জন্য উদার শাসনব্যবস্থা চালু করলেন। সাধারণ প্রজাদরে মধ্যে থেকে যোগ্য লোকদের বিভিন্ন পদে বসালেন। যারা রাজা লুই-এর সময় ক্ষমতা দখল করেছিল, তিনি তাদের বিতাড়ন করলেন।
নেপোলিয়নের এই প্রত্যাবর্তনে ইউরোপের সমস্ত দেশ আবার একত্রিত হয়ে তাঁকে বিতাড়ন করবার জন্য বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে আক্রমণ করল। নেপোলিয়ন বুঝতে পারলেন এই বিশাল সৈন্যের সাথে লড়াই করা সম্ভব হবে না। আলাদা আলাদাভাবে লড়াই করতে হবে। প্রথম আক্রমণ করলেন বেলজিয়াম। তার প্রচণ্ড আক্রমণের মুখে পরাজিত হয়ে পিছু হটতে বাধ্য হল বেলজিয়ামের বাহিনী। প্রাশিয়ান বাহিনীও যুদ্ধে পিছু হটতে বাধ্য হল। ইংরেজ বাহিনীর অধিনায়ক ছিলেন ওয়েলিংটন। তিনি স্থির করলেন প্রাশিয়ান বাহিনীর সঙ্গে একসাথে মিলিত হয়ে নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবেন। এই দুটি সেনাদল যখন একত্রিত হবার জন্যে এগিয়ে চলেছে তখন তাদের বাধা দেওয়ার কোন চেষ্টাই করলেন না নেপোলিয়ন। এবং এটাই ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল।
জেনারেল ওয়েলিংটন ওয়াটারলু নামে এক জায়গায় সৈন্যবাহিনী নিয়ে জমায়েত হলেন। নেপোলিয়নের সেখানে পৌঁছতে একদিন বিলম্ব হয়ে গেল। (১৮ই জুন ১৮১৫} দুই পক্ষে তুমুল যুদ্ধ শুরু হল। ওয়েলিংটনের বাহিনী যখন পরাজয়ের মুখোমুখি এসে পড়েছে, জয় যখন প্রায় নিশ্চিত, প্রাশিয়ান বাহিনী এসে যোগ দিল ইংরেজদের সাথে। সম্মিলিত বাহিনী নতুন উদ্যমে যুদ্ধ শুরু করল। একটানা কয়েকদিনের যুদ্ধে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল ফরাসী বাহিনী। আর তারা সম্মিলিত বাহিনীর প্রতিরোধ করতে পারল না। প্রবল যুদ্ধ করে পরাজিত হলেন নেপোলিয়ন।
এই পরাজয়ের সংবাদ এসে পৌঁছাল প্যারিসে। যখন নেপোলিয়ন প্যারিসে এসে পৌঁছলেন তখন তিনি যুদ্ধের পরিশ্রমে, ক্লান্তিতে মৃতপ্রায়। তবুও তিনি তাঁর মন্ত্রীদের সাথে আলোচনায় বসলেন। তিনি বললেন, অবশিষ্ট আট হাজার সৈন্য সম্মিলিত বাহিনীকে বাধা দিক। কিন্তু মন্ত্রিসভা রাজি হল না। তারা নেপোলিয়নকে পদত্যাগের জন্য চাপ দিতে আরম্ভ করল।
অবশেষে ২২শে জুন নেপোলিয়ন পদত্যাগ করে প্যারিস ত্যাগ করলেন। কারণ সম্মিলিত বাহিনী প্যারিসের দ্বারপ্রান্তে এসে পড়েছে। তিনি জানতেন ধরা পড়লে সাথে সাথে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে।
তিনি তাঁর প্রথম রানী জোসেফাইনের প্রাসাদে গিয়ে আশ্রয় নিলেন। সেখানে ছিল তার পালিত কন্যা। দুজনে আমেরিকায় পালিয়ে যাওয়া স্থির করলেন। কিন্তু তাঁকে নিয়ে যাবার জন্য কোন জাহাজই এল না। সম্মিলিত বাহিনীর নেতারা তাকে সুদূর আফ্রিকার এক দ্বীপ সেন্ট হেলেনায় নির্বাসন দিল। সেখানে ব্রিটিশ গভর্নরের অধীনে জীবনের অবশিষ্ট ছটি বছর কাটাতে হল।
১৮২১ সালের ৫ই মে মাত্র বায়ান্ন বছর বয়সে ক্যানসার রোগে তাঁর মৃত্যু হল।
ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে ইউরোপের সর্বশ্রেষ্ঠ বীর খাঁচার পোষা পাখির মত বন্দী জীবনে প্রাণত্যাগ করলেও তিনি ইউরোপের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী পুরুষ।
৪২. ভাস্করাচার্য (১১১৪-১১৮৫)
প্রায় ৮৫০ বছর আগেকার কথা। দক্ষিণ ভারতের বিজ্জবিড় নামে এক নগরে বসে করতেন এক ব্রাহ্মণ। নাম ভাস্করাচার্য। অঙ্ক এবং জ্যোতিষ দুটি বিষয়েই ছিল তাঁর অসাধারণ পাণ্ডিত্য। নগরের সীমানা ছাড়িয়ে তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল দূর দেশে। দেশের রাজা মহারাজা থেকে সাধারণ মানুষ সকলেই তাঁকে শ্রদ্ধা করত। এত সম্মান খ্যাতি তবুও মনে সুখ ছিল না। ভাস্করাচার্যের। তার একমাত্র সন্তান। লীলাবতী রূপে সরস্বতী গুণে লক্ষ্মী। শান্ত ধীর, অসাধারণ মেধাবী। মুখে মুখে পিতার কাছ থেকে শাস্ত্রের নানান পাঠ নিয়েছে। এমন গুণবতী, রূপবতী কন্যা তবুও ভাস্করাচার্য নিদারুণ মানসিক যন্ত্রণায় কষ্ট পান। জন্ম সময়ে তিনি কন্যার ভাগ্য গণনা করে কোষ্ঠী প্রস্তুত করেছেন। তাতে স্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে কন্যার বৈধব্যযোগ। এ কথা তিনি ছাড়া আর কেউ জানেন না। এতদিন ভুলেই ছিলেন। কিন্তু এখন যে কন্যা বিবাহযোগ্য হয়ে উঠেছে। প্রতিবেশীরা মেয়ের বিবাহের কথা বলছে। অনেকেই লীলাবতাঁকে বিবাহ করতে চায়। দিবারাত্র ভাবতে থাকেন ভাস্করাচার্য। কার সাথে তার কন্যার বিবাহ দেবেন? জেনেশুনে একটি ছেলের জীবন নষ্ট করবেন! এক সময় তার মনে হল গণনায় কোন ভুল হয়নি তো? আরো কয়েকজন গণৎকারকে দিয়ে নতুন করে গণনা করালেন। সকলেই একমত, এই কন্যার বিবাহ দেওয়া উচিত নয়। বিবাহের অল্প দিনের মধ্যেই এর স্বামীর মৃত্যু হবে। কিন্তু এর কি কোন প্রতিকার নেই? ভাবতে থাকেন ভাস্করাচার্য। সমস্ত পুঁথিপত্র নিয়ে বসলেন। কয়েক দিন ধরে অবিশ্রান্ত গণনা করার পর একটি মাত্র শুভক্ষণ পেলেন। ঐ শুভক্ষণে বিবাহ হলেই একমাত্র কন্যার বৈধব্যযোগ রোধ করা সম্ভব। কন্যার উপযুক্ত পাত্রের সন্ধান পেতে দেরি হল না। বিবাহের প্রস্তুতি আরম্ভ হল।
