“তোমার কাছ থেকে দূরে এখানে আমার কোন আনন্দ নেই। তুমি আমার প্রাণের আত্মাকে কেড়ে নিয়েছ, এখন তুমিই শুধু আমার ধ্যান-জ্ঞান।”
পরবর্তীকে যখন নেপোলিয়ন সেন্ট হেলেনা দ্বীপে নির্বাসিত হয়েছিলেন, তিনি বলেছিলেন, জীবনে যদি কোন নারীকে সামান্যও ভালবেসে থাকি তবে সে জোসেফাইন।
কিন্তু রণক্ষেত্রে যুদ্ধের দামামা শুনতে শুনতে কয়েকদিনেই নেপোলিয়ন ভুলে গেলেন তার প্রেম ভালবাসা প্রিয়তমা নারী। যুদ্ধের উন্মত্ততায় মেতে উঠলেন তিনি।
ফ্রান্সের বিরুদ্ধে যে শক্তি সঙ্ গড়ে উঠেছিল সেই শক্তি সঙ্ ভেঙে যাওয়ার পর তিনটি মাত্র দেশ ইংলন্ড, অস্ট্রিয়া এবং সার্ডিনিয়া ফ্রান্সের প্রবল প্রতিপক্ষ হয়ে দেখা দিল।
ইংলন্ডের নৌবাহিনী ফ্রান্সের জলপথ অবরোধ করল। উত্তরপূর্ব সীমান্তে তখন ইংলন্ড আর অস্ট্রিয়ার মিলিত বাহিনী। পূর্ব সীমান্ত অস্ট্রিয়ার বাহিনী, দক্ষিণপূর্ব সীমান্তে অস্ট্রিয়া আর সার্ডিনিয়ার যুগ্ম বাহিনী ফ্রান্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে।
দেশের এই বিপন্ন পরিস্থিতিতে সৈন্যবাহিনীর ভার নেওয়ার মত একটি মাত্র মানুষ ছিলেন, তিনি নেপোলিয়ন বোনাপার্ট।
কনভেনশন নেপোলিয়নের উপর যুদ্ধ পরিচালনার সম্পূর্ণ ভার অর্পণ করল। নেপোলিয়ন তখন মাত্র ২৭ বছরের এক যুবক। কিন্তু গভীর দূরদর্শিতা ও সামরিক বোধের দ্বারা উপলব্ধি করতে পারলেন তাঁর সর্বপ্রধান কাজ হবে সার্ডিনিয়া ও অস্ট্রিয়ার সৈন্যদের গতি রোধ করা। সীমান্ত অতিক্রম করার আগেই যদি না তাদের প্রতিহত করা যায় তবে দেশের সার্বভৌমত্ব বিপন্ন।
কিন্তু সমস্যা দেখা গেল। দুই দেশের যুগ্ম বাহিনীর বিশাল সৈন্যের মুখোমুখি হওয়ার মত সামরিক সামর্থ্য নেপোলিয়নের ছিল না। তাই স্থির করলেন দুই দেশের সাথে আলাদা আলাদাভাবে যুদ্ধ করবেন। প্রথমেই তিনি সৈন্যবাহিনী নিয়ে ঝড়ের গতিতে সার্ডিনিয়া আক্রমণ করলেন। সার্ডিনিয়া বাহিনী এই আক্রমণের জন্য প্রস্তুত ছিল না, তাছাড়া বিপন্ন ফ্রান্স যে এইভাবে তাদের উপর আঘাত হানবে এও তাদের ধারণার মধ্যে ছিল না।
নেপোলিয়নের সৈন্যবাহিনী কয়েকদিনের মধ্যেই স্যাভয় ও নিস শহর দখল করে নিল। সার্ডিনিয়ার সৈন্যবাহিনী তখন বহুদূরে। বিপন্ন সার্ডিনিয়া আত্মরক্ষার জন্য ফ্রান্সের সঙ্গে সন্ধিপত্রে স্বাক্ষর করল, এতে তারা তিনটি দুর্গ নেপোলিয়নকে ছেড়ে দিল, এবং ফ্রান্সের বিরুদ্ধে শক্রতার নীতি পরিত্যাগ করল।
এইবার নেপোলিয়ন তাঁর সৈন্যবাহিনী নিয়ে এগিয়ে চললেন ম্যান্টুয়ার দুর্গ অভিমুখে। ম্যাটুয়া অস্ট্রিয়ার এক সর্বপ্রধান দুর্গ। এই দুর্গ দখল করবার জন্যে এগিয়ে চললেন নেপোলিয়ন। এই দুর্গ রক্ষার জন্য অস্ট্রিয়া তার বিশাল সেনাবাহিনীকে নিয়োজিত করল। কিন্তু নেপোলিয়ন সুকৌশলে অস্ট্রিয়ার সেনাবাহিনীকে বিচ্ছিন্ন করে প্রথমে আরকোলা তারপর রিভেলি, সবচেয়ে লাফভভারিটার যুদ্ধে অস্ট্রিয়ার বাহিনীকে সম্পূর্ণভাবে পরাজিত করে ম্যাটুয়া দখল করে নিলেন।
দুই প্রধান শত্রুকে পরাজিত করে নেপোলিয়ন সৈন্যবাহিনী নিয়ে এগিয়ে চললেন ইতালির দিকে। তখন সমগ্র ইউরোপ পোপের প্রভাব-প্রতিপত্তির কথা নেপোলিয়নের অজানা ছিল না। পোপ ছিলেন রাজতন্ত্রের সমর্থক। ফ্রান্সের নবগঠিত শক্তিকে তিনি স্বাগত জানাতে পারেননি। নানাভাবে তার শত্রুতা করছিলেন।
নেপোলিয়ন পোপের অধিকারভুক্ত রাজ্যগুলো মাত্র দু সপ্তাহের মধ্যে দখল করে নিলেন। বিপন্ন পোপ নিরুপায় হয়ে নেপোলিয়নের সঙ্গে সন্ধি করলেন। এই সন্ধির শর্ত অনুসারে বহু অর্থ ও বহু নগর ছেড়ে দিতে বাধ্য হলেন।
নেপোলিয়ন ইতালি পরিত্যাগ করবার সময় রোম থেকে বহু প্রাচীন পুঁথিপত্র, শিল্পকলা, স্থাপত্য মূর্তি ফ্রান্সে নিয়ে গেলেন।
এই যুদ্ধ সাময়িকভাবে ফ্রান্সে বহিঃশত্রুর হাত থেকে রক্ষা পেলেও মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই অস্ট্রিয়া ফ্রান্সের বিরুদ্ধে আবার যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল ম্যান্টুয়া পুনরায় উদ্ধার করা।
কিন্তু নেপোলিয়ন অস্ট্রিয়াকে সেই সুযোগ দিলেন না। নিজেই সৈন্যবাহিনী নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন অস্ট্রিয়ার উপর। বিপন্ন অস্ট্রিয়া নিরুপায় হয়ে নেপোলিয়নের সাথে সন্ধি চুক্তি করতে বাধ্য হল (অক্টোম্বর ১৭, ১৭৯৭)। এই চুক্তির ফলে বিভিন্ন দ্বীপে অবস্থিত অস্ট্রিয়ার নৌবহর দখল করল ফ্রান্স। এছাড়াও বহু দেশ ছেড়ে দিতে বাধ্য হল।
দুই প্রধান শত্রুকে সম্পূর্ণভাবে পরাজিত করে যখন প্যারিসে ফিরে এলেন নেপোলিয়ন তখন সমস্ত দেশ তাকে অভিনন্দন জানাল। তাঁকে জাতীয় বীরের মর্যাদা দেওয়া হল। প্রকৃতপক্ষে বিপ্লব উত্তরকালে নেপোলিয়নই ছিলেন একমাত্র ব্যক্তি যিনি সমগ্র দেশের মানুষের ভালবাসা শ্রদ্ধা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
নেপোলিয়নের এই বিজয়ের মূলে ছিল তাঁর সাহস, রণনীতি, প্রখর বাস্তব বোধ। এছাড়াও তাঁর আর একটি প্রধান গুণ ছিল, তিনি সমগ্র সৈন্যবাহিনীকে দেশপ্রেমের আদর্শে উদ্বুদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
দুটি দেশের পরাজয়ের পর ফ্রান্সের একমাত্র শত্রু ছিল ইংলন্ড। নেপোলিয়ন চেয়েছিলেন প্রথমে মিশরের মধ্যে দিয়ে প্রবেশ করে সমস্ত ইংরেজ উপনিবেশগুলো দখল করে নেবেন। তারপর ইংরেজ নৌবাহিনীর উপর আক্রমণ হানবেন। প্রকৃতপক্ষে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা নেপোলিয়নের পক্ষে মারাত্মক একটি ভ্রান্তি ছিল। কারণ ইংরেজ নৌবাহিনীর শক্তি সম্বন্ধে তার কোন ধারণা ছিল না। তিনি ভেবেছিলেন যেমনভাবে অস্ট্রিয়া ও সার্ডিনিয়াকে পরাজিত করেছিলেন তেমনিভাবেই ইংলন্ডকে বিধ্বস্ত করতে সক্ষম হবেন।
