নেপোলিয়নের মা ছিলেন উদার শান্ত প্রকৃতির মহিলা। বাবা-মার চারিত্রিক প্রভাবও নেপোলিয়নের জীবনকে অনেকাংশে প্রভাবিত করেছিল।
নেপোলিয়নের বাল্যশিক্ষা শুরু হয় তাঁর বাড়িতে পিতার কাছে। দশ বছর বয়সে একটি ফরাসী স্কুলে ভর্তি হলেন। প্রথমে কর্সিয়া ছিল জেনোয়ার অধিকারে। পরে এই দেশ ফরাসীরা দখল করে নেওয়ার ফলে কর্সিয়া ফরাসী অধিকারভুক্ত হয়। নেপোলিয়ন ফরাসী নাগরিক হিসাবে জন্মগ্রহণ করলেও ফরাসীদের প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন ছিলেন না। কারণ তাঁর মনে হত ফরাসীরা তাঁদের স্বাধীনতা হরণ করেছে।
ছেলেবেলা থেকেই নেপোলিয়নের ইচ্ছা ছিল সৈনিক হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবেন। স্কুলের পাঠ শেষ করে তিনি ভর্তি হলেন একটি সামরিক কলেজে। সামরিক শিক্ষায় নিজেকে গড়ে তুললেও ইতিহাস ও দর্শনের প্রতি তাঁর ছিল গভীর আগ্রহ। তিনি প্লেটো, ভলতেয়ার, রুশো প্রভৃতি দার্শনিকদের রচনা গভীর মনোযোগ সহকারে পড়তেন, আলোলাচনা করতেন। তবে তাঁকে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করত বিভিন্ন দেশের ইতিহাস, সেই সব দেশের সম্রাট রাজাদের বীরত্ব সাহস কীর্তি তাকে মুগ্ধ করত।
তার যৌবনে একটি মাত্র উদ্দেশ্য ছিল কর্সিয়ার স্বাধীনতা অর্জন। তিনি বিশ্বাস করতনে একমাত্র সামরিক শক্তিতেই এই স্বাধীনতা পাওয়া সম্ভব। মাত্র একুশ বছর বয়সে তিনি ফরাসী সামরিক বাহিনীতে ক্যাপ্টেন হিসাবে ভর্তি হলেন।
এই সময় ফ্রান্সের রাজা ষোড়শ লুই-এর বিরুদ্ধে দেশ জুড়ে শুরু হয়েছে বিপ্লব। রাজাকে পদচ্যুত করে দেশের ক্ষমতা দখল করল বিপ্লবী পরিষদ। তৈরি হল কনভেনশন। বা প্রজাতান্ত্রিক ফরাসী সরকার। সমস্ত দেশ জুড়ে আরম্ভ হল হানাহানি মারামারি আর সন্ত্রাসের রাজত্ব। নিহত হল রাজা ষোড়শ লুই। ফ্রান্সের এই রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার ফলে বিভিন্ন রাষ্ট্র ফ্রান্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করল। এ সব দেশের সৈন্যদের একত্রিত করে তৈরি হল শক্তি সঙ্ঘ।
ফরাসী বিপ্লব শুরু হওয়ার পর যখন নতুন শক্তি দেশের ক্ষমতা দখল করল, তারা ফরাসী অধিকারভুক্ত বিভিন্ন দেশকে স্বতন্ত্র প্রদেশ হিসাবে ঘোষণা করে অভ্যন্তরীণ শাসনের পূর্ণ স্বাধীনতা দান করল। এই ঘোষণার ফলে নেপোলিয়নের মনে ফ্রান্সের প্রতি। যে ঘৃণা ছিল তা সম্পূর্ণ দূর হয়ে গেল।
১৭৯৩ সালে ইউরোপের শক্তি সঙ্রে তরফে ইংরেজ নৌবাহিনী ফরাসী সামরিক বন্দর টুলো অবরোধ করল। সেখানকার স্থানীয় নাগরিকরাও রাজার সমর্থনে ইংরেজদের সাহায্য করতে এগিয়ে এল।
নেপোলিয়ন বোনাপার্ট তখন ফরাসী বাহিনীর এক ক্যাপ্টেন, ইংরেজ বাহিনীর অবরোধ মুক্ত করবার ভার পড়ল তাঁর উপর। সসৈন্যে এগিয়ে গেলেন নেপোলিয়ন। দুপক্ষে শুরু হল তুমুল যুদ্ধ। ইংরেজ বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা ফরাসীদের তুলনায় বেশি হওয়া সত্ত্বেও নেপোলিয়নের সুদক্ষ রণনীতির সামনে তারা সম্পূর্ণভাবে পরাজিত হয়ে ফ্রান্স পরিত্যাগ করতে বাধ্য হল। এই জয়ে নেপোলিয়নের খ্যাতি সুনাম চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ল।
যুদ্ধে বিজয়ী হওয়ার জন্য তাঁকে ফরাসী সামরিক বাহিনীর ব্রিগ্রেডিয়ার জেনারেল হিসাবে ঘোষণা করা হল। এর অল্প কিছুদিন পর মিথ্যা সন্দেহবশত নেপোলিয়নকে বন্দী করে কারারুদ্ধ করা হল। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল তিনি বিপ্লব বিরোধী কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। অনুসন্ধানে এই অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ায় তাকে মুক্তি দেওয়া হল।
এ সময় ফ্রান্সের বিরুদ্ধে যে শক্তি সঙ্ গড়ে উঠেছিল, একে একে অনেক দেশ সেই সঙ্ থেকে নিজেদের সম্পর্ক ছিন্ন করে নতুন ফরাসী সরকারকে অস্বীকৃতি করে যুদ্ধ ঘোষণা করল।
একদিকে বিদেশী শত্রুর আক্রমণের আশঙ্কা, অন্যদিকে দেশের মধ্যে নানান বিশৃঙ্খলা গণ্ডগোল। এই অবস্থায় জনগণও বিপ্লবকে রক্ষা করবার জন্য ১৭৯৫ সালে কনভেনশন ডাইরেক্টরী নামে নতুন শাসনতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হল, এই কনভেনশন দেশের শাসনভার পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করল।
এই নতুন কলভেনশনের বিরুদ্ধে বিপ্লবের সময় প্রতিষ্ঠিত জাতীয় রক্ষীবাহিনী ও প্যারিসের কিছু সাধারণ মানুষ ক্ষোভে ফেটে পড়ল। কনভেনশনের সদস্যরা প্যারিসের প্রাসাদে এক অধিবেশনে যোগ দিয়েছিলেন। জাতীয় রক্ষীবাহিনীও এক বিরাট জনতা সেই প্রাসাদ আক্রমণ করল। এই গুরুতর বিপদের মুহূর্তে কনভেনশনকে রক্ষা করার জন্যে এগিয়ে এলেন নেপোলিয়ন। তাঁর অধীনে তখন ছিল মাত্র পাঁচ হাজার সৈন্য, অপরদিকে বিরোধী দলে ত্রিশ হাজার রক্ষী। নেপোলিয়ন সৈন্যবাহিনীকে দুটি দলে ভাগ করে ঝটিকা বেগে আক্রমণ করলেন রক্ষীবাহিনীকে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিপর্যত হয়ে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হল রক্ষীবাহিনী। উচ্ছখল জনতা প্রাণ ভয়ে পালিয়ে গেল। রক্ষা পেল কনভেনশন। এই সাহসিকতার জন্য নেপোলিয়নকে জেনারেল পদে নিয়োগ করা হল।
খ্যাতি সম্মানের শীর্ষে উঠে নেপোলিয়ন বিয়ে করলেন সুন্দরী তরুণী জোসেফাইনকে। ইতিপূর্বে জোফেফাইন বিবাহ করেছিলেন। তার স্বামী বিপ্লবের সময় নিহত হন। বিবাহের অব্যবহিত পরেই শত্রু সৈন্যের বিরুদ্ধে লড়াই-এ যেতে হল নেপোলিয়নকে। যুদ্ধে যখন তাঁর সৈন্যবাহিনী বীরদর্পে এগিয়ে চলেছে তখন তিনি সদ্য বিবাহিতা স্ত্রীকে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে চিঠি লিখছেন–
