ত্যাগরাজের ত্রিশজন শ্রেষ্ঠ ছাত্রের মধ্যে একজন ছিলেন বেঙ্কটরমন। তিনি ত্যাগরাজের সমস্ত রচনাকে লিপিবদ্ধ করে যান। এছাড়াও তিনি ত্যাগরাজের জীবনের বহু উল্লেখযোগ্য ঘটনা লিখে গিয়েছেন।
গীতিকার ত্যাগরাজ ও ভগীরথ যেমন গঙ্গাকে মর্ত্যে আনয়ন করেছিলেন, ত্যাগরাজ তেমনি সঙ্গীতের প্রবাহিনী ধারাকে নিয়ে যে সঙ্গীত রচনা করেছেন তা স্বতস্ফূর্তভাবেই তার মধ্য থেকে উৎসারিত হত। ত্যাগরাজের সময়কে বলা যেতে পারে দক্ষিণ ভারতের সঙ্গীতের স্বর্ণযুগ। একই সময় একাধিক গীতিকারের জন্ম হয়েছিল দক্ষিণ ভারতে কিন্তু ত্যাগরাজের প্রতিভার পাশে সকলেই নিষ্প্রভ হয়ে গিয়েছিল।
ভারতের আধ্যাত্মিক গৌরব ও ঐতিহ্যকে তিনি সঙ্গীতের মধ্যে দিয়ে প্রকাশ করেছেন। তাঁর প্রতিটি গানে রয়েছে সুললিত ভাষা আর ছন্দ। শুধুমাত্র সাহিত্যকীর্তি হিসাবেও তার মূল্য অসীম।
একই সাথে তিনি কবি ও গীতিকার! এক টোড়ি রাগেই তিনি প্রায় ৩০টি গানে সুর দিয়েছেন। তার এই গানগুলোকে বলা হয় কৃতি। তার সুরের মধ্যে ঘটেছে একদিকে যেমন মনোহারিত্ব অন্যদিকে তেমনি গভীরতা। সঙ্গীতভাব, সাহিত্যভাব এবং ভক্তিভাব এই তিনের সংমিশ্রণেই তাঁর রচনা সমৃদ্ধ হয়েছে।
শুধু প্রচলিত রাগের উপর ভিত্তি করেই তিনি যে তাঁর সঙ্গীতে সুর দিয়েছেন তাই নয়–বহু লুপ্তপ্রায়, অবলুপ্ত রাগকে তিনি উদ্ধার করে তাকে নতুন করে প্রচলন করেছিলেন।
কলাসঙ্গীত, ধর্মসঙ্গীত, নাট্যসঙ্গীত, কীর্তন সর্বক্ষেত্রেই তার সৃজনীশক্তির প্রকাশ দেখা যায়। তবে ভজন গানের ক্ষেত্রে তাঁর দান অতুলনীয়। তার আগে ধারণা ছিল ভজন গানে সুরের আধিক্য ভক্তিভাবকে বিনষ্ট করে, কিন্তু প্রচলিত এই ধারণাকে ভেঙে দিয়ে তাঁর গানে সুর ও ভক্তির এক আশ্চর্য সংমিশ্রণ সৃষ্টি করলেন। তিনি যখন ভজন গাইতেন, মানুষ তা মুগ্ধ বিস্ময়ে শুনত। সাধারণ মানুষ, সঙ্গীতপিপাসু মানুষ সুরের লালিত্যে মুগ্ধ হত, আবার সাধক ভক্ত পুরোহিতের দল ভক্তিভাবে আপুত হত।
এই প্রসঙ্গে ত্যাগরাজ নিজেই বলেছেন, “ঈশ্বরের নামগান গুণকীর্তনের সাথে যদি শুদ্ধ শ্রুতি, শুদ্ধ স্বর, শুদ্ধ লয়ের সংমিশ্রণ ঘটে তবেই দিব্য আনন্দের উপলব্ধি হয়।”
ত্যাগরাজের স্ত্রী মারা যায় ১৮৪৫ সালে। তারপর থেকেই ত্যাগরাজের জীবনে পরিবর্তন শুরু হল। দিন-রাতের বেশির ভাগ সময়েই তিনি ঈশ্বরের ধ্যানে আত্মমগ্ন হয়ে থাকতেন।
মৃত্যুর দশ দিন আগে তিনি স্বপ্ন দেখলেন তার প্রভু যেন তাকে ডাকছেন। আর দশ দিনের মধ্যেই তার জীবন শেষ হবে।
তাঁর স্বপ্নকে গিরিপাইনেলা (কেন তুমি গিরি-চূড়া শীর্ষে) এই গানের মধ্যে প্রকাশ করেছেন। মৃত্যুর আগে তিনি সন্ন্যাস গ্রহণ করলেন। তাঁর সব শিষ্যদের বললেন, তোমরা নামগান কর, আগামীকাল আমি মহাসমাধিতে বসব।
চারদিক থেকে শিষ্য ভক্তের দল জমায়েত হতে থাকে। ভজন গানে চারদিকে মুখরিত হয়ে উঠল। নির্দিষ্ট সময়ে ধ্যানে বসলেন ত্যাগরাজ। কিছুক্ষণ পর তার দেহ থেকে এক অপূর্ব আলোকচ্ছটা বেরিয়ে এল। সেই সাথে মহাপ্রয়াণ ঘটল এই সাধক সঙ্গীত শিল্পীর।
তাকে কাবেরী নদীর তীরে শুরু সেঁন্টি বেঙ্কটরমানাইয়ার সমাধির পাশে সমাহিত করা হল। ১৮৪৭ সালের ৬ জানুয়ারি।
প্রায় দেড়শো বছর আগে ত্যাগরাজ পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেও তাঁর সঙ্গীত বেঁচে আছে লক্ষ লক্ষ মানুষের হৃদয়ে। তিনি তার সঙ্গীতের মধ্যে দিয়ে ভারতের সনাতন আত্মাকে তুলে ধরেছেন সাধারণ মানুষের কাছে। তাই আজও তাঁর সঙ্গীত মানুষকে আপুত করে। উত্তীর্ণ করে অন্য এক জগতে।
৪১. নেপোলিয়ন বোনাপার্ট (১৭৬৯-১৮২১)
ইতালির অন্তর্গত কর্সিয়া দ্বীপের আজাশিও নামে একটি ছোট শহরে বাস করতেন এক আইনজীবী, নাম চার্লস। তিনটি সন্তান তার। চতুর্থ সন্তানের জন্মের সময় চিন্তিত হয়ে পড়লেন। স্ত্রীর শরীরের অবস্থা ভাল নয়। কিন্তু ঈশ্বরের আশীর্বাদে যথাসময়েই চার্লসের স্ত্রী চতুর্থ পুত্র সন্তানের জন্ম দিলেন। দাই এসে সংবাদ দিতেই ঘরে ঢুকবেন চার্লস। নতুন কেনা গদির উপর শুয়ে রয়েছেন তাঁর স্ত্রী আর নবজাত শিশুসন্তান। সমস্ত গদির উপর যুদ্ধের ছবি আঁকা।
সেই দিন চার্লস কল্পনাও করতে পারেননি যুদ্ধের ছবির উপর জন্ম নিল যে শিশু, যুদ্ধ হবে তার জীবনসঙ্গী। যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে হবে তার প্রতিষ্ঠা। যুদ্ধের মধ্যে দিয়েই একদিন তিনি ক্ষমতার শীর্ষে আরোহণ করবেন। আবার যুদ্ধই তাঁর ধ্বংসের কারণ চার্লসের সেই নবজাত শিশু সন্তান (জন্ম ১৫ আগস্ট ১৭৬৯) ভবিষ্যতের বীর নায়ক নেপোলিয়ন বোনাপার্ট। যে সমস্ত মানুষ তাঁদের ব্যক্তিত্ব, কৃতিত্ব,কর্মপন্থা, অপরিসীম সাহস ও শক্তি দিয়ে ইতিহাসের গতি পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়েছিলেন, নেপোলিয়ন তাঁদের অন্যতম।
চার্লস বোনাপার্ট ছিলেন সুদর্শন, প্রতিভাবান, আইনজীবী। বক্তা হিসাবেও তাঁর খ্যাতি ছিল। পুত্রদের প্রাথমিক শিক্ষার সব ভার তিনি নিজেই গ্রহণ করেছিলেন।
শিশু নেপোলিয়ন দাদাদের সাথে পড়াশুনার অবসরে দ্বীপের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে বেড়াতেন। ভবিষ্যৎ জীবনে নেপোলিয়নের চরিত্রে কর্সিয়ার প্রাকৃতিক প্রভাব সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। সেখানকার পাহাড়-পর্বতের মতই অনমনীয় দৃঢ়তা, শান্ত অটল প্রকৃতি নেপোলিয়নের জীবনে মূর্ত হয়ে উঠেছিল।
