ত্যাগরাজ তাকে কাছে ডেকে বললেন, তুমি এমন অপূর্ব বীণা বাজাও অথচ আমাকে বলনি। এবার থেকে প্রত্যহ বীণা বাজাবে।
ত্যাগরাজের এই মহত্ত্বতা উদারতায় সকলেই মুগ্ধ হত। সে যুগের এক বিখ্যাত কবি নরসিংহ দাস একটি কবিতায় লিখেছেন, “ত্যাগরাজের মত রামভক্ত দ্বিতীয় কেউ নেই।”
তামিল ভাষায় এক বিখ্যাত গীতিকার হলেন গোপালকৃষ্ণ ভারতী। তখন গোপালকৃষ্ণ সামান্য কয়েকটি মাত্র ভজন রচনা করেছেন। একদিন বহুদুর পথ অতিক্রম করে এলেন ত্যাগরাজের গৃহে। অতিথিকে স্বাগত জানিয়ে তাগরাজ প্রশ্ন করলেন, আপনি কোথা থেকে। ত্যাগরাজ তার কথা শুনে বললেন, আপনি কি সেখানকার গোপালকৃষ্ণ জবাব দিলেন মায়াভরম থেকে। ত্যাগরাজ তার কথা শুনে বললেন, আপনি কি সেখানকার গোপালকৃষ্ণ ভারতাঁকে চেনেন যিনি অপূর্ব সব ভজন রচনা করেছেন?
তাঁর মত একজন নগণ্য কবিকে ত্যাগরাজের মত মহান শিল্পী এভাবে সম্মান জানবেন তা কল্পনা করতে পারেননি গোপালকৃষ্ণ। তিনি ত্যাগরাজের পদধূলি নিয়ে বললেন, আমিই সেই অধম কবি গোপালকৃষ্ণ। ত্যাগরাজের প্রশংসা অনুপ্রেরণায় পরবর্তীকালে গোপালকৃষ্ণ তামিল ভাষায় বহু বিখ্যাত ভজন রচনা করেছিলেন।
ত্যাগরাজ সচরাচর কোথাও যেতেন না। একবার কাঞ্চিপুর থেকে উপনিষধ বাহ্মণ নামে পণ্ডিত ব্যক্তি ত্যাগরাজকে একটি চিঠি লিখলেন।
তুমি আমার আশীর্বাদ নিও। আমি ছিলাম তোমার পিতার সহপাঠী বন্ধু। বহু মানুষের কাছে তোমার অসাধারণ সৃষ্টির কথা শুনেছি। তাই তোমাকে দেখবার জন্য আমার সমস্ত মন ব্যাকুল হয়ে উঠেছে। আমার বয়েস একশো বছরের বেশি তাই তিরুভাইয়ারে গিয়ে তোমার সঙ্গে দেখা করার সামর্থ্য নেই। সেই কারণে তোমাকে আমার গৃহে আসবার আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। পিতৃবন্ধুর এই আমন্ত্রণ অগ্রাহ্য করতে পারলেন না ত্যাগরাজ। শিষ্যদের সাথে নিয়ে রওনা হলেন কাঞ্চির দিকে। কাঞ্চিপুর কয়েকদিন কাটিয়ে ত্যাগরাজ এলেন তিরুপতিতে।
সেখানে মন্দির দর্শনের জন্য ৭ মাইল পাহাড়ি চড়াই ভাঙতে হত। যখন পাহাড়ের চুড়ায় এসে পৌঁছলেন তখন মন্দিরের দেবতার বিগ্রহের সামনে পর্দা পড়ে গিয়েছে। তার মনে হল ঐ পর্দা মানুষের মনের অহংকরের রূপ। তিনি পর্দার সামনে বসে স্বরচিত গান গাইতে আরম্ভ করলেন “কেন তুমি পর্দা সরাচ্ছ না।” দেবতাকে দেখার আকুল আকাঙ্ক্ষা ফুটে ওঠে তার গানের প্রতিটি ছত্রে। শোনা যায় ত্যাগরাজের গান শেষ হতেই ঠাকুরের সামনের পর্দা আপনা থেকেই ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়।
ত্যাগরাজ দেবতা বেঙ্কটেশ্বর-এর মূর্তি দর্শন করে সাথে সাথে আর একটি গান রচনা করে কল্যাণী রাগে গেয়ে উঠলেন, “তোমার মহিমা প্রকাশ করা কি আমার দ্বারা সম্ভব।”
ত্যাগরাজ যখন যেখানে যেতেন সেখানেই কোন না কোন রাগের উপর ভিত্তি করে গান রচনা করতেন। এই সব গানের মধ্যে একদিকে যেমন ফুটে উঠত তার কবিত্বশক্তি অন্যদিকে তাঁর ঈশ্বরভক্তি।
ত্যাগরাজ তার ভ্রমণ শেষ করে ফিরে চলেছেন গৃহের পথে। তার এক প্রিয় ভক্ত এক হাজার স্বর্ণমুদ্রার একটি থলি ত্যাগরাজের অজান্তেই পালকিতে রেখে দিয়েছিল। দু একজন শিষ্য শুধু সে কথা জানত। পথ চলতে চলতে সেই অর্থের কথা জানতে পেরে ত্যাগরাজ বললেন, এই অর্থ নিজেদের জন্য ব্যয় করা হবে না। রামনবমী উৎসবে গরীব দুঃখীদের জন্য ব্যয় করা হবে।
পথে নাগলাপুর বলে এক জায়গায় সকলে এসে পড়ল। সেখানে ছিল ভীষণ ডাকাতের ভয়। পালকি দেখেই ডাকাতেরা পিছু নিল–শিষ্যরা ভয় পেয়ে বলল, গুরুদেব এখন কি হবে? ঐ ১০০০ স্বর্ণমুদ্রা যে আমাদের কাছে রয়েছে।
ত্যাগরাজ বললেন, ঐ স্বর্ণমুদ্রা ওদের দিয়ে দাও। একজন শিষ্য বললেন, তাহলে রামনবমী উৎসব কেমন করে হবে? ত্যাগরাজ বললেন, যার উৎসব তিনিই সে কথা ভাববেন। আমরা ভাববার কে?
টাকা দিলেও যে ডাকাতেরা কোন ক্ষতি করবে না এমন নিশ্চয়তা ছিল না। তখন ত্যাগরাজ তার গান শুরু করলেন। হে রাম, তুমি লক্ষ্মণকে সাথে নিয়ে আমাদের উদ্ধার কর।
ডাকাদের দল প্রায় ত্যাগরাজের কাছাকাছি এসে পড়েছিল হঠাৎ কোথা থেকে ঝাঁকে ঝকে তাদের উপর তীর বর্ষণ হতে আরম্ভ করল। তারা চেয়ে দেখে দুটি ছোট ছেলে তীরধনুক হাতে ত্যাগরাজকে রক্ষা করছে।
ডাকাতদলও দূর হতে তাদের অনুসরণ করে চলল। সকালবেলায় ত্যাগরাজ এসে উঠলেন এক মন্দিরে। আর ডাকাতদের কি মনে হল কে জানে তারা সব অস্ত্র ফেলে দিয়ে ত্যাগরাজের কাছে জিজ্ঞাসা করল, কাল রাতের ঐ বালক দুটি কে?
ত্যাগরাজের মনে হল ও স্বয়ং রাম-লক্ষ্মণ ছাড়া আর কেউ নয়। তিনি ডাকাতদের বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, তোমরা কত ভাগ্যবান, তোমরা স্বয়ং বালক শ্রীরামের দর্শন পেয়েছ। ত্যাগরাজের সংস্পর্শে এসে ডাকাতদের জীবনের বিরাট পরিবর্তন হয়ে গেল। তারা ডাকাতি ছেড়ে দিয়ে চাষবাস আরম্ভ করল।
গুরু ত্যাগরাজ ও সঙ্গীত শিক্ষক হিসাবে ত্যাগরাজ ছিলেন অসাধারণ। তাঁর মত এত শিষ্য পৃথিবীর ইতিহাসে বোধহয় আর কোন গুরুরই ছিল না। এদের মধ্যে বহু শিষ্যই উত্তরকালে গীতিকার গায়ক হিসাবে খ্যাতিলাভ করে। এইভাবে শিষ্য পরম্পরায় ত্যাগরাজের সঙ্গীত ধারা সমগ্র দক্ষিণ ভারতে ছড়িয়ে পড়েছিল।
ত্যাগরাজ সকলকে একইভাবে শিক্ষা দিতেন না। যার যেমন সামর্থ্য যোগ্যতা প্রতিভা, তাকে তেমনিভাবেই শিক্ষা দিতেন। যদি দেখতেন তার উপযুক্ত সঙ্গীত নেই তখন তিনি নিজেই গীত রচনা করতেন। সাধারণত দুজন শিষ্যকে একসাথে শিক্ষা দিতেন। সমস্ত জীবন ধরে ত্যাগরাজ বিভিন্ন রাগের উপর অসংখ্য গান রচনা করেছেন। এই সব গান প্রথমে তিনি তার কয়েকজন কৃতি ছাত্রকে মুখে মুখে শিখিয়ে দিতেন তারপর তারা অন্যদের শেখাত।
