ত্যাগরাজ ছিলেন সমস্ত সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে।
যখন তার খ্যাতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে, দূর-দূরান্ত থেকে সঙ্গীতজ্ঞরা তাঁর কাছে আসত তাঁকে দর্শন করতে তিনি তাদের নিজের গৃহে আমন্ত্রণ করতেন, সেবা করতেন, নতুন গান যা তিনি রচনা করতেন তা শেখাতেন।
ত্যাগরাজ গানের সঙ্গে বীণা বাজাতেন। এই বীণাটিকে তিনি প্রত্যহ পূজা করতেন, গান শেষ হলে বীণাটি থাকত তাঁর পূজার ঘরে।
ত্যাগরাজের জীবন কাহিনী অবলম্বন করে বহু অলৌকিক প্রচলিত। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ হল স্বরার্ণব (ঈশ্বরের অনুগ্রহে প্রাপ্ত)। এই গ্রন্থে শিব ও পার্বতীর কথোপকথনের মধ্যে দিয়ে সঙ্গীত বিষয়ে নানান আলোচনা করা হয়েছে। এই স্বরার্ণব গ্রন্থটি নাকি স্বয়ং নারদ ত্যাগরাজকে উপহার দিয়েছিলেন।
একটি কাহিনী প্রচলিত যে এক সন্ন্যাসী ত্যাগরাজের বাড়িতে এসে তার গান শুনে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে কিছু পুঁথি দিয়ে যান। রাওতে ত্যাগরাজ স্বপ্ন দেখলেন স্বয়ং দেবর্ষি তাঁর সামনে এসে বলছেন, তোমার গানে আমি তৃপ্ত হয়েছি, তাই পুঁথিগুলো রেখে গেলাম। এর থেকে তুমি নতুন পুঁথি রচনা কর। সেই সব পুঁথি থেকে রচিত হয় ‘স্বরার্ণব।
ত্যাগরাজের জীবনে এই ধরনের ঘটনা আরো কয়েকবার ঘটেছে। যখনই তিনি গভীর কোন সংকটের মুখোমুখি হয়েছেন, কোন অলৌকিক শক্তির কৃপায় রক্ষা পেয়েছেন। যখন তিনি মাত্র পাঁচ বছরের বালক, গুরুতর অসুখে পড়েন, সকলেই তাঁর জীবনের আশা ছেড়ে দিয়েছিল, এমন সময় এক সন্ন্যাসী এসে ত্যাগরাজের বাবাকে বললেন, কোন চিন্তা করো না, তোমার পুত্র কয়েকদিনেই সুস্থ হয়ে উঠবে। পরদিনই একেবারে সুস্থ হয়ে গেলেন ত্যাগরাজ।
জীবনে শুধু ঈশ্বর অনুগ্রহ পাননি ত্যাগরাজ। তাঁর জীবনও ঈশ্বরের মতই পবিত্র। তাঁকে দেখে মনে হত সাক্ষাৎ যেন পুরাকালের কোন ঋষি–স্থির শান্ত নম্র। চোখে-মুখে সর্বদাই ফুটে উঠত এক পবিত্র আভা। যে মানুষই তাঁর সান্নিধ্যে আসত তারাই মুগ্ধ হয়ে যেত ঔদার্যপূর্ণ ব্যবহারে। কেউ যদি কখনো তার সাথে রূঢ় আচরণ করত, তাঁর প্রতিও তিনি ছিলেন উদার। কখনো তার মুখ দিয়ে একটিও কটু বাক্য বার হত না। তিনি বলতেন, যাই হোক না কেন সর্বদাই সত্যের পথ আঁকড়ে ধরে থাক। ঈশ্বরের করুণা একদিন না একদিন তোমার উপর বর্ষিত হবেই।
ত্যাগরাজের জীবনের দু একটি ঘটনার বিবরণ থেকে তাঁর উদার মহৎ চরিত্রের ধারণা পাওয়া যায়। ত্যাগরাজের সময়ে একজন বিখ্যাত শিল্পী ছিলেন ত্রিভুবন সীতারামাইয়া। সীতারামাইয়ার সবচেয়ে প্রিয় ছিল আনন্দ ভৈরবী রাগ। এই রাগটি ছিল অপূর্ব এবং এই রাগের উপর কয়েকটি গানও লিখেছিলেন। ত্যাগরাজের শিষ্যরা সীতারামাইয়ার কণ্ঠে আনন্দ ভৈরবী শুনে মুগ্ধ হয়ে গুরুকে গিয়ে বললেন।
একদিন সীতারামাইয়ের কণ্ঠে আনন্দ ভৈরবী শোনবার জন্যে একটি অনুষ্ঠানে এলেন ত্যাগরাজ। তাঁকে দেখা মাত্রই উপস্থিত দর্শকরা তাঁকে মঞ্চের কাছে যাবার পথ করে দিল। তখন সীতারামাইয়া আনন্দ ভৈরবী গাইছিলেন। ত্যাগরাজকে দেখামাত্রই তিনি গান থামিয়ে মঞ্চ থেকে নেমে এসে ত্যাগরাজের পায়ে লুটিয়ে পড়লেন। “আপনার মত সঙ্গীতসাধক যেখানে উপস্থিত সেখানে আমি কেমন করে গাইব!”
ত্যাগরাজ তাকে তুলে ধরে বললেন, “তোমার আনন্দ ভৈরবী শুনে আমি মুগ্ধ হয়েছি। এমন মধুর সঙ্গীত বহুদিন শুনিনি।”
ত্যাগরাজের কথা শুনে সীতারামাইয়া বললেন, “আপনার কাছে আমার একটি প্রার্থনা আছে।”
ত্যাগরাজ বললেন, “আমি আগেই তোমার প্রার্থনা মঞ্জুর করলাম, এবার বল কি তোমার প্রার্থনা।”
সীতারামাইয়া বললেন, “আপনি কোনদিন আনন্দ ভৈরবী রাগে সঙ্গীত রচনা করবেন না। ভবিষ্যতে যদি কেউ কোনদিন এর কারণ জানতে চায় তবে আপনার সাথে আমার নামটিও উচ্চারিত হব।”
সীতারামাইয়ার এই অদ্ভুত প্রস্তাব শুনে সকলে বিস্মিত হল। শিষ্যদের মধ্যে কয়েকজন ক্রুদ্ধ হল। কিন্তু ত্যাগরাজের মধ্যে কোন ভাবান্তর দেখা গেল না, হাসিমুখেই তিনি বললেন, “তোমার প্রার্থনা আমি পূরণ করব।”
ভবিষ্যতে আর কোন দিন তিনি আনন্দ ভৈরবী রাগে কোন গান রচনা করেননি। এবং ইতিপূর্বে যে গান রচনা করেছিলেন তাও আর কাউকে শেখাননি।
আর একবার এক গরীব দারোয়ানের শখ হল সে ত্যাগরাজের কাছে একটি ভজন শিখবে। কিন্তু দেখা গেল তার কন্টস্বর, ত্যাগরাজের রচিত যে সব ভজন ছিল তা গাইবার উপযুক্ত নয়, তখন ত্যাগরাজ অত্যন্ত সহজ একটি গান লিখে “নী দয়াচে” ( তোমার কৃপায়) তা দারোয়ানকে শিখিয়ে দিলেন।
ত্যাগরাজ যে বীণাটি বাজাতেন তা অত্যন্ত পবিত্রভাবে রাখতেন। কেউ তার বীণাটি স্পর্শ করত না। ত্যাগরাজের এক শিষ্য ছিল কুপ্পায়ার। তিনি বীণাবাদনে খুবই দক্ষ ছিলেন। কিন্তু সে কথা কোনদিন ত্যাগরাজের কাছে প্রকাশ করেননি। তার খুব ইচ্ছা ছিল একেবার গুরুর বীণাটি বাজাবেন। একদিন ত্যাগরাজ কোথাও গিয়েছিলেন। সেই সুযোগে কুপ্পায়ার তার পূজার ঘরে ঢুকে বীণা বাজাতে আরম্ভ করলেন। অল্পক্ষণের মধ্যে
গভীর সুরের জগতে হারিয়ে গেলেন কুপ্পায়ার। কিছুক্ষণ পর বাড়িতে ফিরে এলেন ত্যাগরাজ। তাঁর পূজার ঘর থেকে অপূর্ব বীণার ধ্বনি শুনে বিস্মিত হয়ে ঘরে ঢুকতেই কুপ্পায়ার বীণা নামিয়ে ত্যাগরাজের পায়ের উপর লুটিয়ে পড়লেন। আপনার অনুমতি ছাড়া আপনার বীণা স্পর্শ করেছি, আমাকে ক্ষমা করুন।
