ত্যাগরাজের শিক্ষা শুরু হয় তাঁর পিতার কাছে। প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে ভর্তি হলেন তিরুভাইয়ের সংস্কৃত স্কুলে। ছেলেবেলা থেকেই তাঁর মধ্যে ফুটে উঠেছিল কবি প্রতিভা। যখন তিনি ছয় বছরের বালক, ঘরের দেওয়ালে প্রথম কবিতা লেখেন। তারপর থেকে নিয়মিতভাবেই তিনি কবিতা রচনা করতেন। এই সব কবিতাগুলোর মধ্যে শিশুসুলভ সরলতা থাকলেও তাঁর প্রতিভার প্রকাশ লক্ষ্য করা যায়। স্থানীয় কয়েকজন পণ্ডিত ত্যাগরাজের কবিতা পড়ে মুগ্ধ হয়েছিলেন।
বাবা যখন ভজন গাইতেন তিনিও তার সাথে যোগ দিতেন। অন্য সব গানের চেয়ে ভজন তাকে বেশি আকৃষ্ট করত। এই সময় তিনি দুটি ভজন রচনা করেন “নমো নমো রাঘবায়” ও “তব দাসোহম”–এই দুটি ভজন পরবর্তীকালে খুবই জনপ্রিয় হয়েছিল।
ত্যাগরাজের বাবা প্রতিদিন সকালে পূজা করতেন। তাঁর পূজার ফুল আনবার জন্য ত্যাগরাজ কিছুদূরে একটি বাগানে যেতেন। পথের ধারে সেন্টি বেঙ্কটরমানাইয়ারের বাড়ি। বেঙ্কটরমনাইয়ার ছিলেন নামকরা সঙ্গীত গুরু। বাড়িতে নিয়মিত ছাত্রদের সঙ্গী শিক্ষা দিতেন। ত্যাগরাজ বেঙ্কটরমনাইয়ার বাড়ির সামনে এলেই দাঁড়িয়ে পড়তেন। গভীর মনোযোগ সহকারে তাঁর গান শুনতেন। একদিন রাম ব্ৰহ্মণের ব্যাপারটি নজরে পড়ল। তিনি বেঙ্কটরমনাইয়ের উপর ছেলের সঙ্গীতশিক্ষার ভার দিলেন।
সঙ্গীত ত্যাগরাজের ছিল স্বভাবসিদ্ধ প্রতিভা। অল্পদিনের মধ্যেই গুরুর যা কিছু বিদ্যা ছিল তা আত্মস্থ করে নিলেন।
ত্যাগরাজের শৈশব কৈশোর কেটেছিল সঙ্গীত ও সাহিত্য শিক্ষার পরিবেশের মধ্যে বাবা-মায়ের কাছে একদিকে তেমনি সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চা করতেন বাবার সাথে। মহাকাব্য পুরাণ সঙ্গীত বিষয়ক বিভিন্ন রচনার সাথে অল্প বয়সেই পরিচিত হয়ে ওঠেন। উত্তরকালে সঙ্গীত বিষয়ে যে সব রচনা প্রকাশ করেছিলেন, প্রথম জীবনেই তার ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল।
সে যুগের সঙ্গীত শিল্পীদের সঙ্গীতশাস্ত্র সম্বন্ধে কোন জ্ঞান ছিল না। তাই তাদের গানের মধ্যে নানান ব্যাকরণগত ভুল-ত্রুটি লক্ষ্য করা যেত। ত্যাগরাজ প্রথম রাগসঙ্গীতকে সুনির্দিষ্ট নিয়মের মধ্যে চালিত করে সঠিক পথে নিয়ে আসেন।
ত্যাগরাজের পিতার আর্থিক অবস্থা ভাল ছিল না। তাই উত্তাধিকারসূত্রে বাড়ির অংশ ছাড়া আর কিছুই পাননি। কিন্তু তার জন্যে ত্যাগরাজের জীবনে কোন ক্ষোভ ছিল না। প্রকৃতপক্ষে তার জীবন ছিল সহজ সরল মহৎ আদর্শের সেবায় উৎসর্গীকৃত। নিজের, সংসারের ও শিষ্যদের ভরণপোষণের জন্য সামান্য কিছু জমি আর ভিক্ষাবৃত্তির উপরেই প্রধানত নির্ভরশীল ছিলেন।
১৮ বছর বয়সে ত্যাগরাজের বিবাহ হয়। স্ত্রী ছিলেন ত্যাগরাজের যোগ্য সহধর্মিণী। ত্যাগরাজের খ্যাতির কথা শুনে তাঞ্জোরের মহারাজা তাঁকে নিজের সভাগায়ক হিসাবে আমন্ত্রণ জানান। দক্ষিণ ভারতের তাঞ্জোর সঙ্গীতের ইতিহাসে এক উল্লেখযোগ্য স্থান। বহু মহান সঙ্গীত শিল্পী এখানে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। প্রায় তিনশো বছর ১৬০০-১৯০০ ধরে তাঞ্জোর ছিল সঙ্গীতের পীঠস্থান। এখানকার রাজারা ছিলেন সঙ্গীতের প্রধান পৃষ্ঠস্থান। কিন্তু রাজপরিবারের কোন সম্মানের প্রতি তার সামান্যতম আকর্ষণ ছিল না তাই এই লোভনীয় প্রস্তাব তিনি হেলায় প্রত্যাখ্যান করেন। অর্থের লালসাকে তিনি ঘৃণা করতেন।
তাঁর বাড়িতে সব সময়েই শিষ্য, গায়ক, পণ্ডিতদের ভিড় লেগেই থাকত। এদের কেউ থাকত কয়েকদিন, কেউ কয়েক সপ্তাহ আর কেউ কয়েক মাস। এদের ভরণপোষণের জন্য সপ্তাহে একদিন ভিক্ষায় বার হবেন ত্যাগরাজ। তাঞ্জোরের মানুষ তাকে এত সম্মান করত, একদিনের ভিক্ষায় যা পেতেন তাতেই ভালভাবে সমস্ত সপ্তাহের ব্যয় মেটাতে পারতেন।
তার এই ভিক্ষাবৃত্তি ছিল বড় অদ্ভুত। কোন গৃহের দ্বারে যেতেন না। পথ দিয়ে ভজন গাইতে গাইতে হাঁটতেন। তাঁর কণ্ঠস্বর ছিল যেমন উদাত্ত তেমনি মধুর। চারদিকে এক স্বর্গীয় পরিমণ্ডল সৃষ্টি হত। পথের দুপাশের গৃহস্থরা যার যা সামর্থ্য ছিল, ভক্তিভরে এসে দিত ত্যাগরাজকে।
ত্যাগরাজ তখন সবেমাত্র যৌবনে পা দিয়েছেন। একদিন কাঞ্চিপুরম থেকে হরিদাস নামে এক ব্যক্তি তাকে ৯৬ কোটি বার রামনাম জপ করতে বলেন। ত্যাগরাজের মনে হল এ ঈশ্বরের আদেশ-একে কোনভাবেই লঙ্ঘন করা যাবে না। তারপর থেকে দীর্ঘ ২১ বছর তিনি প্রতিদিন ১,২৫, ০০০ বার করে রামনাম জপ করতেন। তার স্ত্রীও তার সাথে এইভাবে জপ করতেন। শোনা যায় মাঝে মাঝে জপ করতে করতে একসময় এত আত্মমগ্ন হয়ে যেতেন, তখন তার মনে হত স্বয়ং রাম যেন তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন। তিনি দু চোখ মেলে তাকে প্রত্যক্ষ করতেন। মনের এই অনুভূতিতে তিনি রচনা করেছিলেন একটি বিখ্যাত গান “কানু গোন্টিনি” (আমি দেখা পেয়েছি)। মাঝে মাঝে যখন শ্রীরামের দর্শন পেতেন না, তার সমস্ত মন বেদনায় ভরে উঠত। এমনি এক সময়ে লিখেছিলেন “এলা নি দাইয়া রাহু”–তুমি কেন আমার প্রতি সদয় নও।
ক্রমশই ত্যাগরাজের খ্যাতি তাঞ্জোরের সীমানা ছাড়িয়ে দূর-দূরান্তরে ছড়িয়ে পড়ছিল। তাঁর রচিত গান বিভিন্ন অঞ্চলের গায়কেরা গাইতে আরম্ভ করল। শিক্ষার ব্যাপারে প্রাচীন কালের সঙ্গীত শিক্ষকদের মধ্যে লক্ষ্য করা যেত সংকীর্ণ গোঁড়ামি। তারা নিজেদের সঙ্গীতকলাকে শুধুমাত্র সন্তান আর শিষ্যদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখত। কিন্তু
