১৩১ হিজরীতে উমাইয়া শাসনের অবসান ঘটলে আব্বাসীয় খিলাফতের সূচনা হয়। ইমাম আবু হানিফা (রঃ) মক্কা থেকে কুফায় ফিরে আসেন। আব্বাসীয়গণ ইতিপূর্বে আহলে বাইয়াতদের পক্ষে আন্দোলন করলেও, ক্ষমতা লাভের পর আহলে বাইয়াতদের প্রতি খড়গহস্ত হয়ে উঠেন এবং ধর্মীয় নেতাদের প্রতি নিষ্ঠুর ও অমানবিক নির্যাতন চালাতে শুরু করেন। আব্বাসীয়গণ তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী উমাইয়া বংশীয়দের প্রায় সম্পূর্ণ রূপে ধ্বংস করে দিয়েছিল। এমন কি উমাইয়া খলিফাঁদের কবর খুঁড়ে তাদের অস্থি পাজর তুলে এনে জ্বালিয়ে ফেলেছিল। আব্বাসীয় বংশীয় খলিফা মনসুর সিংহাসনে বসে আহলে বাইয়াত ও আলেম সমাজের প্রতি অত্যাচারের স্টীম রোলার চালান।
১৪৫ হিজরীতে মুহাম্মদ নাফসে জাকিয়া খলিফা মনসুরের অনৈসলামিক ও অমানবিক কার্যকলাপের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন এবং যুদ্ধে শহীদ হন। ইমাম মালেক (রঃ) ও ইমাম আবু হানিফা (রঃ) সহ প্রায় সকল ধর্মীয় নেতাগণ মুহাম্মদ নাফসে জাকিয়ার পক্ষে ছিলেন। নাফসে জাকিয়া শহীদ হবার পর তাঁর ভ্রাতা ইব্রাহীম বিদ্রোহের পতাকা স্বহস্তে তুলে নেন এবং তঙ্কালীন দীনদার মুসলমান ও আলেম সমাজ ইব্রাহীমের পতাকাতলে সমবেত হতে লাগলেন। জানা যায়, একমাত্র কুফা নগরেই বিশ লক্ষ মুসলমান মনসুরের বিরুদ্ধে মুহম্মদ ইব্রাহীমের পক্ষে যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত গ্রহণ করেছিল। ইমাম আবু হানিফা (রঃ) মুহাম্মদ ইব্রাহীমকে গোপনে পূর্ণ সমর্থন দিয়েছিলেন এবং সংগ্রাম চালিয়ে যাবার জন্যে প্রচুর অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করেছিলেন। যুগের নিষ্ঠুর ও জালেম মনসুর গোপনে বহু উপঢৌকন পাঠিয়ে ইমাম আবু হানিফা (রঃ) কে হাত করতে চেষ্টা করলেন। কিন্তু ইমাম আবু হানিফা (রঃ) এগুলোকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। অবশেষে ১৪৬ হিজরীতে খলিফা মনুসুর ইমাম আবু হানিফা (রঃ) কে বাগদাদে খলিফার দরবারে তলব করেন। তিনি খলিফার দরবারে উপস্থিত হলে তাঁকে প্রধান বিচারপতির পদ গ্রহণ করার অনুরোধ জানান। কিন্তু ইমাম আবু হানিফা (রঃ) জালেম সরকারের অধীনে এ পদ গ্রহণ করতে রাজি হলেন না। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে একটা মনসুরের গভীর ষড়যন্ত্র। এছাড়া এ পদ গ্রহণ করার অর্থ হবে ন্যায়, ইনসাফ ও ব্যক্তিত্বকে বিসর্জন দিয়ে জালেমের পূজারী করা। তাই ইমাম আবু হানিফা (রঃ) খলিফা মনসুরকে বললেন, “আমি প্রধান বিচারপতির পদ গ্রহণ করার যোগ্য নই।” এতে খলিফা রাগান্বিত স্বরে বললেন, আপনি মিথ্যাবাদী। প্রতুত্তরে ইমাম সাহেব বললেন, “আপনার কথা যদি সত্যি হয় (অর্থাৎ আপনার কথানুযায়ী আমি যদি মিথ্যাবাদী হই) তাহলে আমার কথাই সঠিক। কারণ একজন মিথ্যাবাদী রাষ্ট্রের প্রধান বিচারপতি পদের যোগ্য নয়।” অতঃপর খলিফা মনসুর কোন উত্তর দিতে না পেরে ক্রুদ্ধ হয়ে ইমাম আবু হানিফা (রঃ) কে গ্রেফতার করে কারাগারে বন্দী করার নির্দেশ দেন। কারাগারে বসেও ইমাম আবু হানিফা (রঃ) ফিকাহ শাস্ত্রে তাঁর কঠোর সাধনা চালিয়েছিলেন। কারাগারে বসেই তিনি বিভিন্ন কঠিন মাসআলার জবাব দিতেন। বিভিন্ন জায়গা থেকে শত শত মানুষ এসে কারাগারেই মাসআলা শিক্ষা লাভ করে যেতেন। ইমাম আবু ইউসুফ (রঃ) লিখেছেন, ইমাম আবু হানিফা (রঃ) কেবল মাত্র কারাগারে বসেই ১২ লক্ষ ৯০ হাজারের অধিক মাসআলা লিপিবদ্ধ করেছিলেন। এরপর খলিফা মনসুর একদিন খাদ্যের সাথে বিষ মিশিয়ে দেন। ইমাম আবু হানিফা (রঃ) বিষ ক্রিয়া বুঝতে পেরে সিজদায় পড়ে যান এবং সিজদা অবস্থায়ই তিনি ১৫০ হিজরীতে এ নশ্বর পৃথিবী থেকে বিদায় গ্রহণ করেন। এ সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৭০ বছর।
ইমাম আবু হানিফা (রঃ) এর মৃত্যুর সংবাদ বিদ্যুতের গতিতে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং দেশের সর্বস্তরের লোকজন মৃত্যুর সংবাদ শুনে শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়ে। কথিত আছে, তার জানাজায় পঞ্চাশ হাজারের অধিক লোক অংশ গ্রহণ করেছিল; কিন্তু লোকজন আসতে থাকায় ৬ বার তাঁর জানাজা পড়া হয়েছিল। তাঁর অছিয়ত অনুযায়ী বিজরান গোরস্তানে তাকে দাফন করা হয়।
৪০. ত্যাগরাজ (১৭৬৭–১৮৪৭)
পাশ্চাত্য সঙ্গীতের ইতিহাসে যেমন বিঠোফেন মোৎসার্টের নাম শ্রদ্ধার সাথে উচ্চারিত হয়, ভারতীয় সঙ্গীতের জগতে তেমনি এক মহান পুরুষ ত্যাগরাজ। ভারতীয় সঙ্গীতের অতলান্ত সৌন্দর্যকে তিনি তুলে ধরেছিলেন সাধারণ মানুষের কাছে। তার জীবনে সঙ্গীত আর ধর্ম মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল। এই সাধক সঙ্গীতশিল্পীর জন্ম দক্ষিণ ভারতের তাঞ্চোর জেলার তিরুভারুর নগরে। জন্ম তারিখ ৪ঠা মে ১৭৬৭ সাল। যদিও জন্ম তারেখ নিয়ে বিতর্ক আছে। শোনা যায় ত্যাগরাজের পিতা রাম ব্ৰহ্মণকে স্বপ্নে দেখা দিয়ে বলেন, তিনি খুবই শ্রীঘ্রই একটি পুত্র সন্তানের পিতা হবেন, এই পুত্র সঙ্গীত সাহিত্য ক্ষেত্রে মহাকীর্তিমান হবে।
ত্যাগরাজের পিতা রাম ব্রাহ্মণ ছিলেন বিদ্বান ধার্মিক সৎ মানুষ। ছেলেবেলায় রামনবমী উৎসবের সময় ত্যাগরাজ বাবার সাথে গিয়ে রামায়ণ পড়তেন। তাঞ্জোরের রাজা রাম ব্ৰহ্মণকে খুব শ্রদ্ধা করতেন। তিনি কিছু জমি আর একটি বাড়ি দিয়ে যান। এইটুকুই ছিল তাঁর সম্পত্তি।
ত্যাগরাজের মা সীতামামার কণ্ঠস্বর ছিল অপূর্ব। ত্যাগরাজের সঙ্গীতশিক্ষা শুরু হয় তাঁর মায়ের কাছে। সীতামামার ছিলেন সৎ উদার স্নেহশীলা। মায়ের এই সব চারিত্রিক গুণগুলো ত্যাগরাজের জীবনকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছিল।
