যাহোক, এ কথা মানতেই হবে যে, ডারউইনের মতবাদ বা তত্ত্ব খুবই স্পষ্ট। ডারউইন তাঁর গবেষণাকর্মের দ্বারা এক সাধারণ সত্যের দিকেই অঙ্গুলি নির্দেশ করেছেন, আর তা হল, নির্দিষ্ট কোন প্রজাতির প্রতিটি প্রাণীর স্ব-স্ব চরিত্রের মধ্যেই রয়েছে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ভিন্নতার এবং বৈচিত্র্যের দিকথেকে তা ব্যাপক। এই বৈচিত্র্য ও ভিন্নতার যে-সব কারণ ডারউইন উল্লেখ করে গেছেন, তা স্পষ্টতই লামার্ক-এর নির্দেশিত কারণের কাছাকাছি। ডারউইন বর্ণনা করেছেন যে, পরিবেশের পরিবর্তনের দরুন প্রাণিজগতের প্রজনন-কোষসমূহের আকৃতির পরিবর্তন ঘটে থাকে এবং এর ফলে গুণগত যে পরিবর্তন সাধিত হয় তা বংশানুক্রমে সঞ্চারিত হয়। ডারউইন অবশ্য একটি দিক থেকে লামার্ককেও ছাড়িয়ে গেছেন। সে দিকটি হল, প্রকৃতি তার নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় কোন কোন প্রাণীকে পরিবর্তনের ক্ষেত্রে আনুকূল্য প্রদর্শন করে থাকে। এভাবে, প্রকৃতির একটি নিষ্ঠুরপন্থায় যারা দুর্বলতর, তাদের বিনাশ ঘটে; আর প্রকৃতির আনুকূল্যপ্রাপ্তরা টিকে যায়। ডারউইনের আরো অভিমত, প্রকৃতির এই নির্বাচনীয়ধারার পাশাপাশি প্রাণিজগতে যৌনসঙ্গী নির্বাচনের একটা ধারাও অব্যাহত রয়েছে। এই ধারায় স্ত্রী-জাতীয় প্রাণিরা তাদের যৌনসঙ্গী নির্বাচনে শক্তিশালী পুরুষ প্রাণীকেই বাছাই করে থাকে।
নেচারাল সিলেকশন বা প্রকৃতির নির্বাচনের এই যে মতবাদ, তা প্রচারিত হওয়ার পরপরই চারদিকে প্রচুর সাড়া পড়ে যায়। এমনকি এখনও ডারউইনের অনুসারীরা প্রকৃতির নির্বাচন-মতবাদের প্রবক্তা হিসেবে ডারউইনকে এ যাবতকালের সেরা প্রকৃতিবিজ্ঞানী বলে বিবেচনা করেন। জীববিজ্ঞানী হিসেবেও ডারউইন সর্বজনশ্রদ্ধেয় ব্যক্তি। মৃত্যুর মধ্যদিয়েই যেন তিনি এ বিষয়ে সর্বাধিক গৌরব অর্জন করেছেন। ডারউইনের রচনাবলী যদিও ধর্ম ও বিজ্ঞানের সংঘাতে নাস্তিক্যবাদের পক্ষে যুক্তি যুগিয়েছিল এবং এ বিষয়টি ঊনিশ শতকের দ্বিতীয় ভাগে সর্বত্র উম্মার সঞ্চার করেছিল, কিন্তু তবুও ব্রিটিশ জাতি তার মতদেহ ওয়েস্ট মিনিস্টার এ্যাবোতে সমাহিত করতে কোন দ্বিধা বা কুণ্ঠাবোধ করেনি।
প্রকৃতপক্ষে, ডারউইনের মতবাদের দুটো আলাদা দিক রয়েছে। প্রথমটি বিজ্ঞানভিত্তিক। স্বীকার করতে বাধা নেই যে, ডারউইন তাঁর গবেষণায় গ্রহণযোগ্য সুপ্রচুর তথ্য-উপাত্ত ব্যবহার করেছেন। তবে এ কথাও অস্বীকার করার উপায় নেই যে, এতদ্সত্ত্বেও তিনি তাঁর পর্যালোচনা ও সিদ্ধান্তের ভিত বৈজ্ঞানিক দিক থেকে তেমন মজবুত করতে সক্ষম হননি। বিশ্লেষণের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে, খোদ বিবর্তনবাদ সম্পর্কেও গ্রহণযোগ্য খুব বেশিকিছু তিনি দিয়ে যেতে পারেননি। অবশ্য, তা আলাদা ব্যাপার। তবে মানতেই হবে যে, বিভিন্ন প্রজাতির ক্ষেত্রে বিবর্তনের ধারা-সম্পর্কিত বিষয়ে তাঁর যে পর্যবেক্ষণ, তা খুবই আকর্ষণীয়।
ডারউইনের মতবাদের দ্বিতীয় ধারাটি হচ্ছে দর্শনভিত্তিক। এই বিষয়ে ডারউইন সমধিক গুরুত্ব আরোপে সমর্থ হয়েছেন এবং তাঁর দর্শন-সংক্রান্ত বিষয় ও বক্তব্যের প্রকাশ আকর্ষণীয় ও স্পষ্ট।
মালথাসের মতবাদ এবং…
ডারউইন প্রকৃতির নির্বাচন-সংক্রান্ত তত্ত্ব উদ্ভাবনার ক্ষেত্রে তার ওপরে মালথাসের প্রভাবের কথা অস্বীকার করেননি। নিচে এ বিষয়ে তাঁর যে বক্তব্য তুলে ধরা হল, সেটি পি. পি, গ্রাশের ‘ম্যান স্ট্যান্ডস এ্যাকিউজড’ পুস্তক থেকে উদ্ধৃতি :
এতে দেখানো হয়েছে, কিভাবে এই প্রাণিকূল জ্যামিতিক হারে তাদের বংশবিস্তার ঘটিয়ে থাকে। এই তত্ত্ব মালথাসের এবং এই তত্ত্ব প্রাণিজগৎ ও সবৃজি-জগতের ক্ষেত্রে সমভাবে প্রযোজ্য। উল্লেখ্য, ডারউইনের এই স্বীকৃতি পরিবেশিত হয়েছে তাঁর “অন দি অরিজিন অব স্পেসিস” পুস্তকের দ্বিতীয় সংস্করণের ভূমিকায়, ১৮৬৯ সালে।
ডারউইন প্রাণিজগৎ পর্যবেক্ষণে প্রচুর তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছিলেন। পরবর্তী পর্যায়ে তিনি তাঁর পর্যবেক্ষণজাত-তত্ত্বকে আর্থ-সামাজিক তত্ত্বের আলোকে ঢেলে সাজিয়ে নিয়েছিলেন। কিন্তু, ‘আর্থ-সামাজিক তত্ত্বে’র সংজ্ঞাই। বলে দেয় যে, কোন আর্থ-সামাজিক বিষয়ের সঙ্গে প্রাণিজগতের কোন সম্পর্ক নেই। অবশ্য, এর আগেপর্যন্ত ডারউইন তাঁর প্রাণিজগতের এই পর্যবেক্ষণকে প্রকৃতির বিভিন্ন বিষয়ের ব্যাখ্যায় অত্যন্ত যৌক্তিকভাবেই প্রয়োগ করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
ডারউইন প্রকৃতিবিজ্ঞানী হিসেবে ১৮৩১ থেকে ১৮৩৬ সাল পর্যন্ত বিগলে জাহাজের মিশনের দক্ষিণ আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকাসমূহ পর্যবেক্ষণের সুযোগ পান। তিনি এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করেন সম্পূর্ণভাবে। তখনই ডারউইন বিস্ময়ে হতবাক হয়ে লক্ষ্য করেন যে, এসব এলাকায় যেসব প্রাণীর বসবাস, পরিবেশগত কারণে তাদের আকৃতিগত পরিবর্তন কত ব্যাপক। এ থেকেই তিনি এই ধারণায় উপনীত হন যে, প্রাণিজগৎ অপরিবর্তনীয় নয়। তিনি এই বিষয়টিকে কৃত্রিম প্রজনন-পদ্ধতির মাধ্যমে মানুষ কর্তৃক গৃহপালিত পশুর উন্নতি বিধানের প্রয়াস-প্রচেষ্টার সঙ্গে তুলনা করেন। এই পর্যায়ে তার মনে যে প্রশ্নের উদ্ভব ঘটে, তাহল, প্রকৃতির রাজ্যে প্রাণিজগতের আকৃতিগত কাঠামোর ওপরে এ ধরনের নির্বাচন-পদ্ধতির প্রয়োগ কিভাবে সম্ভব?
