এই প্রশ্নের দ্বারা ডারউইন যা বুঝাতে চেয়েছেন, তাহল, মানুষ যেভাবে উন্নতজাতের পশু উৎপাদনে ক্রস-ব্রিডিং পদ্ধতি ব্যবহার করে থাকে। প্রকৃতির রাজ্যেও প্রাণিকুলের জন্য তেমনিধারায় প্রাকৃতিক কোন পদ্ধতি বিদ্যমান। লক্ষ্য করলেও স্পষ্ট বুঝা যায়, প্রকৃতির রাজ্যে প্রাণিজগতের মধ্যে একধরনের প্রাকৃতিক-নির্বাচন রয়েছে, এবং তা স্বতঃস্ফূর্ত। ডারউইনের মাধ্যমে এভাবেই একসময় একটি জিজ্ঞাসার উদ্ভব ঘটেছিল এবং একটি ধারণাভিত্তিক তত্ত্ব গড়ে উঠার পথ হয়েছিল প্রশস্ত। কিন্তু জিজ্ঞাসার জবাব যে ধারায় এগিয়ে গেছে, তা সঠিক কোন ভিত্তি বা বাস্তবতা খুঁজে নিতে পারেনি।
ডারউইন যে কিভাবে মালথাসের ধারণাকে তার তত্ত্বের যৌক্তিকতা প্রমাণের উপাদান হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছেন, তা বুঝে উঠা সত্যি মুশকিল। মালথাস ছিলেন একজন এ্যাংলিক্যান পাদরি। অর্থনীতিতে জনসংখ্যা এবং জনসংখ্যার বৃদ্ধি কি পরিণতি বয়ে আনে, গোড়া থেকে সে বিষয়টার ওপরে মালথাসের ছিল দারুন আগ্রহ। ১৭৯৮ সালে মালথাস বেনামিতে একখানা পুস্ত ক প্রকাশ করেন। “এসে অন দি প্রিন্সিপাল অব পপুলেশন” শীর্ষক এই পুস্তকে তিনি জনসংখ্যা বৃদ্ধিজনিত সমস্যার ব্যাপারে বিভিন্ন সমাধানের পন্থা নির্দেশ করেন। যেমন, ‘পুওর ল’।
তাঁর প্রস্তাবিত এই আইনের মূলবক্তব্য হচ্ছে, যে-সব ব্যক্তি নিজে কিছুই উৎপাদন করে না এবং ধনীদের দান-খয়রাতে বেঁচে থাকে, তাদের সকলরকম সাহায্য-সহযোগিতা বাতিল করা উচিত। মালথাসের বক্তব্য ছিল, মানুষেরা নিজেরাই নিজেদের টিকে থাকার ব্যাপারটা বেছে নেবে; উৎপাদনে যারা সক্রিয় ও সক্ষম শুধু তাদেরই বেঁচে থাকার অধিকার থাকবে। পক্ষান্তরে, প্রকৃতিগতভাবে যারা অক্ষম অথবা দুর্বল তারা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।
সময়টা ছিল শিল্প-বিপ্লবের প্রাথমিক যুগ। তখন শ্রমিক সমাজের মধ্যে এমনিতেই দুঃখ-দুর্দশার সীমা-পরিসীমা ছিল না। সেই দুর্বিষহ পরিস্থিতিতে মানবিক দানশীলতাকে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় করার এই প্রস্তাব জনসমক্ষে পেশ করা হয়। কিন্তু মালথাসের এই অমানবিক প্রস্তাবনার মধ্যেই ডারউইন তাঁর নিজস্ব ‘প্রকৃতির-নির্বাচন তত্ত্বের আকর্ষণীয় উপাদান পেয়ে যান ও মালথাসের ধারণাকে তিনি নিজস্ব তত্ত্বে প্রয়োগ করে ‘যোগ্যতমের উদ্বর্তন’ সুনিশ্চিত করার কাজে কোমর বেঁধে মাঠে নেমে পড়েন। তিনি দেখানোর প্রয়াস পান যে, প্রকৃতি নিজেই তার নির্বাচনে দুর্বলদের বাদ দিয়ে শক্তিমানদের সংরক্ষণ করে থাকে।
ইতোপূর্বে যা বলা হল, তার কোনটিই অসত্য নয়। প্রকৃতপক্ষে, কাগজে কলমে ডারউইনের এই স্বীকৃতি যদি আমরা না পেতাম তাহলে কে ভাবতে পারত যে, তিনিও মালথাসের সমাধানের মত এত কঠিন ও নিষ্ঠুর এক মতবাদকে নিজ তত্ত্বের সঙ্গে সংযুক্ত করে নিয়েছিলেন। এভাবে মালথাসের নিকট থেকে গোড়াতে ডারউইনের প্রেরণালাভ এবং পরবর্তী পর্যায়ে তাঁর মতবাদ দিয়ে সবকিছুর ওপরে প্রভাব বিস্তারের বিষয়টাকে পি. পি. গ্রাশে কঠোরভাবে সমালোচনা করেছেন। গ্রাশে তাঁর “ম্যান স্ট্যান্ডস্ এ্যাকিউজড়” পুস্তকে গোটা ব্যাপারটাকেই দুর্ভাগ্যজনক আখ্যায়িত করে বলেছেনঃ
“এ ধরনের মূলনীতি ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কারণেই ডারউইনবাদ এ যাবতকালের সব মতবাদের মধ্যে চরম ধর্মবিরোধী ও চরম বস্তুবাদী মতবাদ হিসেবে বিরাজ করছে।” পি. পি. গ্রাশে এই মর্মে বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, ডারউইন মতবাদের এই দিকটির ব্যাপারে খ্রিস্টান বিজ্ঞানীরাও তেমন অবহিত নন। তিনি আরো মন্তব্য করেছেন, “ডারউইনের থিওরিই কার্ল মার্কস-কে তাঁর মতবাদে অনেক বেশি আস্থাবান হতে সহায়তা করেছে। ডারউইনের ‘অন দি অরিজিন অব স্পেসিস’ পুস্তকেই কার্ল মার্কস তাঁর বস্তুবাদী ও নাস্তিক্যবাদী তত্ত্বের জোরালো প্রেরণা খুঁজে পাননি এবং এ কারণেই তিনি ডারউইনের এই পুস্তকের প্রশংসায় ছিলেন পঞ্চমুখ। শুধু তাই নয়, ডারউইনের এই পুস্ত ককে কার্ল মার্কস্ তার নিজস্ব মতবাদ প্রতিষ্ঠায় ইচ্ছামত ব্যবহারও করেছেন।”
মানবসৃষ্টি : বাইবেলের আলোকে
বাইবেলে প্রকৃতিবিজ্ঞান-সম্পর্কিত এমন কোন বাণী বা বক্তব্য নেই যা নিয়ে কোন গবেষণা-পর্যালোচনা পরিচালিত হতে পারে। পক্ষান্তরে, পবিত্র কোরআনে প্রকৃতিবিজ্ঞান-সংক্রান্ত এত অধিক বাণী ও বক্তব্য বিদ্যমান যা নিয়ে মানব ইতিহাসের যেকোন পর্যায়েরই গবেষণা চালান সম্ভব। শুধু তাই নয়, কোরআনের সেই গবেষণা-পর্যালোচনায় এমনসব তথ্য ও উপাদান পাওয়া যেতে পারে যা পরম স্রষ্টার সৃষ্টি সম্পর্কে মানুষকে সম্যক ধারণা দিতে সক্ষম। সৃষ্টিতত্ত্ব সম্পর্কে কোরআনে এমনসব বক্তব্য রয়েছে, যা আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ জ্ঞান-বিজ্ঞানের কষ্টিপাথরে নিখাদ সত্য হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত।
যাহোক, বাইবেলের সৃষ্টিতত্ত্বের বিবরণীতে পাওয়া যায়, নিছক কতগুলো অতীত ঘটনার বর্ণনা। এসব তথ্য বিজ্ঞানীদের কৌতূহলী করে বটে, কিন্তু সে সব তথ্যের বিচার-পর্যালোচনা পরিচালনার কোন অবকাশ থাকে না। বরং, প্রাথমিক বিচারেই প্রমাণিত হয়ে যায় যে, বাইবেলের ওইসব তথ্য বিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠিত সত্যের আলোকে মোটেও বাস্তবসম্মত নয়; এমনকি ক্ষেত্রবিশেষ বাস্তব সত্যের সম্পূর্ণ বিরোধী। সৃষ্টিতত্ত্ব–সম্পর্কিত বাইবেলের বর্ণনা এমনিতেই অপ্রতুল। বাইবেলের সেইসব কৌতূহলোদ্দীপক বক্তব্যের বিবরণ পুস্তকে বিশদভাবে তুলে ধরা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, নূহের তুফান সম্পর্কে বাইবেলের বর্ণনার কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। ঠিক কোন্সময় এই তুফানরূপী বিপর্যয়টি ঘটেছিল এবং কিভাবে সেই তুফানে দুনিয়ার সবকিছু ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল বাইবেলে তার উল্লেখ রয়েছে।
