এ কথা সত্য যে, প্রাণিজগতে বিবর্তনের যে ধারা বিদ্যমান, সেই একইধারায় মানুষ যে বানরের বংশধর, তা প্রতিপন্ন করার কাজেই সাধারণত ডারউইন-থিওরিকে ব্যবহার করা হয়। তবে, মূলকথা এই যে, মানুষ যেকোন এক জানোয়ারের বংশধর, এই ধারণা আদৌ ডারউইনের নয়। বরং, প্রথম ১৮৬৮ সালে হেকেল এই ধারণার কথা ব্যক্ত করেন। অধুনা, প্রায় সবাই সাধারণভাবে ডারউইনের মতবাদের সাথে বিবর্তনবাদকে গুলিয়ে ফেলেন। অথচ, এই গুলিয়ে ফেলার ব্যাপারটি ঘটে থাকে এতদ্সংক্রান্ত ভুল ধারণার দরুন।
এই দুই মতবাদের (ডারউইনবাদ ও বিবর্তনবাদ) মধ্যে এ ধরনের গুলিয়ে ফেলার ব্যাপারটা আদতেই বিভ্রান্তিজনক ও বিরক্তিকর। কারণ, ডারউইন নিজেই তাঁর মতবাদকে উপস্থাপন করে গেছেন সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে।
উল্লেখ্য যে, ডারউইনের পুস্তকটির নাম হল : “অন দ্য অরিজিন অব স্পেসিস বাই মিনস অব নেচারাল সিলেকশন অব দি প্রিজারভেশন অব ফেভার্ড রেসেস ইন দা স্ট্রাগল ফর লাইফ।” এটি লন্ডন থেকে প্রকাশিত হয় প্রথম, ১৮৫৯ সালে।
পরবর্তীতে ‘অন দি অরিজিন অব স্পেসিস’ পুস্তক থেকেই ডারউইনের এতদ্সংক্রান্ত নিজের বক্তব্য তুলে ধরা হচ্ছে। এখানে ডারউইনের ওই পুস্তকের যে উদ্ধৃতি তুলে ধরা হল, তা ১৯৮১ সালে ‘পেঙ্গুইন বুকস্’ হিসেবে প্রকাশিত পেলিক্যান ক্লাসিক্স সংস্করণ থেকে গৃহীত :
“অতএব, যতজনের টিকে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে তারচেয়ে বেশিজন যখন জন্ম নেবে, তখন প্রতিটি ক্ষেত্রেই টিকে থাকার জন্য শুরু হয়ে যাবে সংগ্রাম। একে বলা হয় অস্তিত্বের লড়াই। এ লড়াই দেখা দেবে একই প্রজাতির প্রতিটি প্রাণীর মধ্যে, অপরাপর নির্দিষ্ট কোন প্রজাতির বিরুদ্ধে অথবা জীবনের প্রাকৃতিক অবস্থার সঙ্গেই।… এই অবস্থায় দেখা যায়, মানুষের উপযোগী পরিবর্তন ঘটে চলেছে সন্দেহাতীতভাবেই। এবং জীবনযুদ্ধের বিরাট ও ব্যাপক জটিলতায় কোন-না-কোন পরিবর্তন কোন-না-কোনভাবে কারো-না-কারো জন্যে অধিকতর উপযোগী হয়ে ধরা দিয়ে থাকে। সুতরাং, হাজার হাজার প্রজন্মেরধারায় এইরকম কোন অবস্থার সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় কি? বরং, সম্ভাবনার ঐতিহ্যকেই স্বীকার করে নিতে হয়। আর এরকম অবস্থা যখন দেখা দেবে (মনে রাখতে হবে যে, এটা হচ্ছে সেই অবস্থা যখন যতজন টিকে থাকা সম্ভব তারচেয়েও অধিকসংখ্যক জন্ম নিয়ে সেরেছে) তখন এটা সন্দেহ করা কি অমূলক হবে যে, যারা অন্যদেরচেয়ে–যত সামান্যই হোক–অধিক সুবিধা লাভ করবে, তারাই তখন টিকে থাকার এবং নিজস্বধারায় প্রজনন বৃদ্ধির সর্বাধিক সুযোগ পেয়ে যাবে? পক্ষান্তরে, এটাও আমরা নিঃসন্দেহে ধরে নিতে পারি যে, অনুরূপ কোন পরিবর্তনে তা যত সামান্যই হোক, কেউ যদি প্রতিকূলতায় আক্রান্ত হয়ে পড়ে তাহলে তার বা তাদের ধ্বংসই হবে অনিবার্য। এই যে অনুকূল পরিবর্তনের ধারায় সংরক্ষণ আর ক্ষতিকর পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রত্যাখ্যাত হওয়া, এটাকেই আমি নেচারাল সিলেকশন বা প্রকৃতির নির্বাচন বলেছি।”
প্রকৃতপক্ষে, এখানে ডারউইন যা-কিছু বোঝাতে চেয়েছেন, তাতে তার উদ্দেশ্য ছিল একটাই। আর তা হল, প্রকৃতির নির্বাচনে কিংবা জীবন-সংগ্রামে পরিবর্তনের আনুকূল্যপ্রাপ্তির মাধ্যমে জাতিসমূহের টিকে যাওয়ার ধারা বিশ্লেষণ করে বিভিন্ন প্রজাতির অরিজিন বা আদি উৎস সম্পর্কে একটি থিওরি দাঁড় করানো। অথচ, তাঁর এই থিওরিকেই নিজেদের পতাকা হিসেবে লুফে নিয়েছিলেন বিবর্তনবাদীরা। শুধু তাই নয়, বিবর্তনবাদীরা এরপর ডারউইনের সেই থিওরিকে ব্যবহার করে চললেন ধর্মীয়-বিশ্বাসের বিরুদ্ধ-সংগ্রামে বস্তুবাদী চিন্তাধারার হাতিয়ার হিসেবে। এখনো ডারউইনের মতবাদের সেই পতাকা বস্তুবাদী দার্শনিকদের সমান উদ্দীপনার সঙ্গে আন্দোলিত করে।
ডারউইন তাই এখনও নাস্তিক্যবাদী শিবিরের একজন হিরো–পূজনীয় ব্যক্তিত্ব। বস্তুবাদীগণ যখন তাঁদের মতবাদের যাতাকলে কোনকিছুকে গুঁড়িয়ে দিতে বা উড়িয়ে দিতে চান, তখনই তারা ডারউইন এবং তাঁর এই থিওরির দোহাই পাড়েন। অথচ, পাঠক-পাঠিকাবর্গ ‘অন দি অরিজিন অব স্পেসিস পুস্তকের অধ্যায়ের পর অধ্যায় পড়ে গেলে দেখতে পাবেন, ডারউইনের বিবর্তনবাদ আদৌ ধর্মবিরোধী কোন বিষয় নয়। এমনকি, সে বিবর্তন যদি মানব প্রজাতিরও হয়, তাহলেও তা ধর্মীয় বিশ্বাসকে হেয়প্রতিপন্ন করে না।
মূলত, জীবকোষের জৈবপ্রক্রিয়া-সম্পর্কিত বৈজ্ঞানিক গবেষণার সর্বশেষ ফলাফল বিবর্তনবাদকে সত্য বলে প্রমাণিত করেছে, তবে তা ভিন্নধারায়। এতকাল এই কথাটিকে কেউ কেউ ক্ষীণকণ্ঠে উচ্চারণ করেননি এমন নয়। তবে যেহেতু তাদের কথিত সেই বিবর্তনবাদ ছিল ভিন্নধারার, সেহেতু, বিবর্তনবাদীরা তাঁদের বিরুদ্ধে সমালোচনার ঝড় বহাতে এতটুকু কার্পণ্য করেননি। কিন্তু, আধুনিক সর্বশেষ বিজ্ঞান-গবেষণা বিবর্তনবাদকে জীবন সাংগঠনিক পদ্ধতির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত বিষয় বলে রায় দিয়েছেন। আধুনিক বিজ্ঞানের সুপ্রতিষ্ঠিত এই সত্য অবশ্য তথাকথিত বিবর্তনবাদীদের ধ্যান-ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীত। তবুও, অতীতে বিবর্তনবাদ নিয়ে যে ধরনের বিতর্ক ও বাদানুবাদ চলত, আধুনিক বিজ্ঞানের এই আবিষ্কারের দরুন সেই বিতর্কের অবসান সূচিত হয়েছে এবং সম্পূর্ণ ভিন্ন পর্যায়ে, বলতে গেলে, সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থানে থেকেও এই বিবাদকারীরা এখন একটি অভিন্ন ঐক্যমত্যে একত্রিত হতে পারছেন।
