“পরে ঈশ্বর কহিলেন, জলের মধ্যে বিতান হউক ও জলকে দুইভাবে পৃথক করুক। ঈশ্বর এইরূপে বিতান করিয়া বিতানের উধ্বস্থিত জল হইতে বিতানের অধঃস্থিত জল পৃথক করিলেন, তাহাতে সেইরূপ হইল। পরে ঈশ্বর বিতানের নাম আকাশমণ্ডল রাখিলেন। আর সন্ধ্যা ও প্রাতঃকাল হইলে দ্বিতীয় দিবস হইল।” –বাণী ৬ থেকে ৮ :
এখানেও পানির অস্তিত্বের সেই অলীক বক্তব্য টেনে আনা হয়েছে। সেইসঙ্গে সেই পানিকে দুই ভাগে ভাগ করে একভাগ আকাশমণ্ডলে আর এক ভাগ পৃথিবীতে প্রবাহিত করার কথা বলা হয়েছে। পানিকে এভাবে দ্বিধাবিভক্ত করার কাল্পনিক বক্তব্য বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে আদৌ গ্রহণযোগ্য নয়।
“পরে ঈশ্বর কহিলেন, আকাশমণ্ডলের নিন্থ সমস্ত জল একস্থানে সংগৃহীত হউক ও স্থল সপ্রকাশ হউক; তাহাতে সেইরূপ হইল। তখন, ঈশ্বর স্থলের নাম ভূমি ও জলরাশির নাম সমুদ্র রাখিলেন। আর ঈশ্বর দেখিলেন যে, তাহা উত্তম। পরে ঈশ্বর কহিলেন, ভূমি, তৃণ বীজোৎপাদক ঔষধি ও সবিজ স্ব স্ব জাতি অনুযায়ী ফলের উৎপাদক ফলবৃক্ষ, ভূমির উপরে উৎপন্ন করুক; তাহাতে সেইরূপ হইল। ফলত ভূমি-তৃণ, স্ব স্ব জাতি অনুযায়ী বীজোৎপাদক ঔষধি ও স্ব স্ব জাতি অনুযায়ী সবিজ ফলের উৎপাদক, বৃক্ষ, উৎপাদন করিলো, আর ঈশ্বর দেখিলেন যে, সে-সকল উত্তম। আর সন্ধ্যা ও প্রাতঃকাল হইলে তৃতীয় দিবস হইল।”–বাণী ৯ থেকে ১৩ :
পৃথিবী সৃষ্টির ইতিহাসে দেখা যায়, মহাদেশসমূহ পানি থেকে ধীরে ধীরে জেগে উঠেছে। এক্ষেত্রে, বাইবেলের বর্ণনা তাই গ্রহণযোগ্য। কিন্তু যেখানে বলা হয়েছে যে, পরিকল্পিতভাবে গাছপালা, ঘাস-আগাছা, সজি ইত্যাদি গজিয়ে উঠেছে এবং তাদের বীজ থেকে পুনরায় চারা হচ্ছে, সে বক্তব্য কোনোক্রমেই সত্য বলে গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা, সূর্যের আলো ছাড়া এই সৃষ্টির প্রক্রিয়া সম্ভব নয়। (বাইবেলের এই আদিপুস্তকেই বলা হয়েছে যে, চতুর্থ দিবসের আগে সূর্য সৃষ্টি হয়নি। সুতরাং, এই পর্যায়ে দিন-রাত্রির আগমন তথা তৃতীয় দিবসের যে কথা বলা হয়েছে, তাও একই যুক্তিতে নাকচ হয়ে যায়।
“পরে ঈশ্বর কহিলেন, রাত্রি হইতে দিবসকে বিভিন্ন করণার্থে আকাশমণ্ডলের বিতানে জ্যোতির্গণ হউক; সে সমস্ত চিহ্নের জন্য, ঋতুর জন্য এবং দিবসের ও বৎসরের জন্য হউক, এবং পৃথিবীতে দীপ্তি দিবার জন্য দীপ বলিয়া আকাশমণ্ডলের বিতানে থাকুক, তাহাতে সেইরূপ হইল। ফলতঃ ঈশ্বর দিনের উপর কর্তৃত্ব করিতে এবং মহাজ্যোতিঃ ও রাত্রির উপরে কর্তৃত্ব করিতে তদপেক্ষা ক্ষুদ্র এক জ্যোতিঃ এই দুই বৃহৎ জ্যোতিঃ এবং নক্ষত্রসমূহ নির্মাণ করিলেন। আর পৃথিবীতে দীপ্তি দিবার জন্য, এবং দিবস ও রাত্রির উপর কর্তৃত্ব করণার্থে, এবং দীপ্তি হইতে অন্ধকার বিভিন্ন করণার্থে ঈশ্বর ঐ জ্যোতিসমূহকে আকাশমণ্ডলের বিতানে স্থাপন করিলেন এবং ঈশ্বর দেখিলেন যে, সে-সকল উত্তম। আর সন্ধ্যা ও প্রাতঃকাল হইলে চতুর্থ দিবস হইল।”–বাণী ১৪ থেকে ১৯ :
এখানে বাইবেলের রচয়িতার এইসব বক্তব্য গ্রহণ করা যেতে পারে; কিন্তু তবুও এখানে সামগ্রিকভাবে সৃষ্টির যে বর্ণনা দেয়া হয়েছে, তা সমালোচনার উর্ধ্বে নয়। পৃথিবী এবং চন্দ্র উভয়ই তাদের মূল নক্ষত্র সূর্য থেকে উৎপন্ন। তাছাড়া, আধুনিক বিজ্ঞান সৌরমণ্ডল ও তার কার্যকারণ পদ্ধতি সম্পর্কে যেসব তথ্য আবিষ্কার করেছে, তা একান্তভাবে সুপ্রমাণিত ও সুপ্রতিষ্ঠিত। সেই অবস্থায় পৃথিবীসৃষ্টির পরে সূর্য ও চন্দ্রসৃষ্টির বক্তব্য বৈজ্ঞানিক সত্যের সম্পূর্ণ বিরোধী।
“পরে ঈশ্বর কহিলেন, জল নানাজাতীয় জঙ্গম প্রাণিবর্গে প্রাণিময় হউক এবং ভূমির উধে আকাশমণ্ডলের বিতানে পক্ষিগণ উড়ক। তখন ঈশ্বর বৃহৎ তিমিগণের ও যে নানা জাতীয় জঙ্গম প্রাণিবর্গে জল প্রাণিময় আছে, সে সকলের এবং নানা জাতীয় পক্ষির সৃষ্টি করিলেন। পরে ঈশ্বর দেখিলেন যে, সে সকল উত্তম। আর ঈশ্বর সে সকলকে আশীর্বাদ করিয়া কহিলেন, তোমরা প্রাণবন্ত ও বহুবংশ হও, সমুদ্রের জল পরিপূর্ণ কর, এবং পৃথিবীতে পক্ষিগণের বাহুল্য হউক আর সন্ধ্যা ও প্রাতঃকাল হইলে পঞ্চম দিবস হইল।”–বাণী ২০ থেকে ২৩ :
বাইবেলের এইসব বাণীতে যে বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে, তাও গ্রহণযোগ্য নয়। আদিপুস্তকের বর্ণনা অনুসারে সামুদ্রিক প্রাণী ও পাখিদের সাথে সাথে পৃথিবীতে প্রাণিজগতের আবির্ভাব ঘটেছে। অথচ, এই বাইবেলেই অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, পঞ্চম দিবসে নয়, বরং ষষ্ঠ দিবসে পৃথিবীতে প্রাণিজগতের সৃষ্টি করা হয়েছিল।
এটা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, প্রাণের উৎপত্তি সমুদ্র থেকেই। সমুদ্র থেকে প্রাণের আবির্ভাব হয়ে পৃথিবীর বুক ভরে তুলেছে, আর এভাবেই গড়ে উঠেছে প্রাণিজগৎ। পক্ষান্তরে, পৃথিবীর বুকে বিরাজমান প্রাণী থেকে এবং বিশেষত পৃথিবী সৃষ্টির দ্বিতীয় পর্যায়ে একশ্রেণীর সরীসৃপ প্রজাতি থেকে পক্ষিকুলের আবির্ভাব ঘটেছে বলে ধারণা করা হয়। এই ধারণার কারণ এই উভয় ধরনের প্রজাতির মধ্যে একই ধরনের দেহগত বৈশিষ্ট্য। অথচ, আদিপুস্তকে ষষ্ঠদিনের আগের পৃথিবীতে পশুপ্রাণী সৃষ্টির কথা বলা হয়নি। অথচ, এর আগেই পাখি সৃষ্টি হয়েছে বলা হয়েছে। সুতরাং, পৃথিবীতে পশুপ্রাণীর আগে পক্ষিকুলের আবির্ভাবের এই বক্তব্য গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
