“পরে ঈশ্বর কহিলেন, ভূমি নানা জাতীয় প্রাণিবর্গ অর্থাৎ স্ব স্ব জাতি অনুযায়ী গ্রাম্য পশু, সরীসৃপ ও বন্য পশু উৎপন্ন করুক, তাহাতে সেইরূপ হইল। ফলত ঈশ্বর স্ব স্ব জাতি অনুযায়ী যাবতীয় ভূচর সরীসৃপ নির্মাণ করিলেন; আর ঈশ্বর দেখিলেন যে, সে সকল উত্তম।”
“পরে ঈশ্বর কহিলেন, আমরা আমাদের প্রতিমূর্তিতে, আমাদের সাদৃশ্যে মনুষ্য নির্মাণ করি; আর তাহারা সমুদ্রে মৎস্যদের উপরে, আকাশের পক্ষীদের উপরে, পশুদের উপরে কর্তৃত্ব করুক। পরে ঈশ্বর আপনার প্রতিমূর্তিতেই মনুষ্যকে সৃষ্টি করিলেন। ঈশ্বরের প্রতিমূর্তিতেই তাহাকে সৃষ্টি করিলেন, পুরুষ ও স্ত্রী করিয়া তাহাদিগকে সৃষ্টি করিলেন।”
“পরে ঈশ্বর তাহাদিগকে আশীর্বাদ করিলেন; ঈশ্বর কহিলেন, তোমরা প্রজাবন্ত ও বহুবংশ হও এবং পৃথিবী পরিপূর্ণ ও বশীভূত কর, আর সমুদ্রের মৎস্যগণের উপরে, আকাশের পক্ষিগণের উপরে এবং ভূমিতে গমনশীল যাবতীয় জীবজন্তুর উপরে কর্তৃত্ব কর। ঈশ্বর আরো কহিলেন, দেখ, আমি সমস্ত ভূতলে স্থিত যাবতীয় বীজোৎপাদক ওষধি ও যাবতীয় সজীব ফলদায়ী বৃক্ষ তোমাদিগকে দিলাম, তাহা তোমাদের খাদ্য হইবে। আর ভূচর যাবতীয় পশু ও আকাশের যাবতীয় পক্ষী ও ভূমিতে গমনশীল যাবতীয় কীট, এই সকল প্রাণীর আহারার্থ হরিৎ ওষধি সকল দিলাম। তাহাতে সেইরূপ হইল।”
“পরে ঈশ্বর আপনার নির্মিত বস্তুসকলের প্রতি দৃষ্টি করিলেন, আর দেখ, সে সকলই অতি উত্তম। আর সন্ধ্যা ও প্রাতঃকাল হইলে ষষ্ঠ দিবস হইল।
–বাণী ২৪ থেকে ৩১ :
এইসব বর্ণনা মূলতঃ সৃষ্টিকর্মের চূড়ান্ত পর্যায়ের। এখানে বাইবেল-লেখক ইতিপূর্বে সৃষ্ট যেসব প্রাণীর বর্ণনা দেননি, সেসবের একটি তালিকা তুলে ধরেছেন এবং সেইসাথে মানুষ ও পশুর খাদ্যাখাদ্যের বর্ণনা পেশ করেছেন।
ইতিপূর্বের বর্ণনায় যে ভুলটি রয়েছে, তাহলো, পৃথিবীতে পক্ষিকুলের আগে পশুকুলের আবির্ভাব। অবশ্য, সমস্ত প্রাণিজগতের সর্বশেষ পর্যায়ে যে পৃথিবীতে মানুষের আবির্ভাব ঘটেছে, সে-বিষয়ে লেখকের বর্ণনা সঠিক।
সৃষ্টি-সংক্রান্ত বর্ণনা অবশ্য এখানেই শেষ হয়নি। দ্বিতীয় অধ্যায়ের প্রথম তিনটি বাণীতেও এ বিষয়ের বর্ণনা স্থান লাভ করেছে। যেমন–
“এইরূপে আকাশমণ্ডল ও পৃথিবী এবং এতদুভয়স্থ সমস্ত বস্তুব্যুহ সমাপ্ত হইল। পরে ঈশ্বর সপ্তম দিনে আপনার কৃতকার্য হইতে নিবৃত্ত হইলেন, সেই সপ্তমদিনে আপনার কৃত সমস্ত কার্য হইতে বিশ্রাম করিলেন। আর ঈশ্বর সেই সপ্তমদিনকে আশীর্বাদ করিয়া পবিত্র করিলেন, কেননা সেইদিনে ঈশ্বর সৃষ্ট ও কত সমস্ত কার্য হইতে বিশ্রাম করিলেন।”
বাইবেলের সাতদিনের এই বর্ণনা সম্পর্কে কিছু আলোচনা প্রয়োজন। প্রথমেই ধরা যাক, কয়েকটি শব্দের কথা : এখানে যে পাঠ উদ্ধত, তা গৃহীত হয়েছে উপরে উল্লিখিত ‘রিভাইজড স্ট্যান্ডার্ড ভার্সন অব দি বাইবেল থেকে। এখানে host শব্দটি তাৎপর্যপূর্ণ। এর দ্বারা অবশ্যই বিপুলসংখ্যক সৃষ্টির কথা বোঝানো হয়েছে। আর যেখানে বিশ্রাম করিলেন’ বলা হয়েছে, সেটি আসলে হিব্রু Shabbath শব্দের অনুবাদ। এ থেকেই এসেছে ইহুদীদের ‘বিশ্রাম দিবস’। ইংরেজিতে এই শব্দটিকে লেখা হয় ‘Sabbath’।
ছয়দিন কাজের শেষে ‘স্রষ্টা বিশ্রাম গ্রহণ করিলেন’ বলে যে কথা বলা হয়েছে, তা যে একটা লেজেন্ড বা উপকথা মাত্র তা দিবালোকের মতোই পরিষ্কার। এর একটি ব্যাখ্যা অবশ্যই রয়েছে। মনে রাখতে হবে যে, সৃষ্টিতত্ত্বের যে অধ্যায়টি এখানে পর্যালোচনার জন্য গ্রহণ করা হয়েছে, তা হচ্ছে তথাকথিত সেকেরভোটাল পাঠ বা পুরোহিতদের রচনা। এই পাঠ রচিত হয়েছিল ব্যাবিলনে ইহুদীদের নির্বাসনকালীন নবী এজেকেলের (বাংলা বাইবেলের জিহিস্কেল) আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকারী বলে পরিচিত পুরোহিত ও লিপিকারদের দ্বারা। খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে। ইতিপূর্বে দেখা গেছে, পুরোহিতেরা বাইবেলের জেহোভিস্ট এলোহিস্ট বাণীগুলোকে নিজেদের ইচ্ছেমত ও প্রয়োজনানুসারে কিভাবে ঢোল সাজিয়ে নিয়েছিলেন।
সৃষ্টিতত্ত্ব-সংক্রান্ত বাইবেলের আদিপুস্তকের জেহোভিস্ট পাঠ বা বাণীসমূহ পুরোহিতদের রচিত বাণীর কয়েক শতাব্দী আগে রচিত হয়। সেখানে কিন্তু ছয়দিন ধরে সৃষ্টির কাজ করে স্রষ্টার ক্লান্ত হয়ে পড়ার ও বিশ্রাম গ্রহণের কোনো উল্লেখ নেই। পরবর্তীকালে পুরোহিতেরা বাইবেলে সেটি জুড়ে দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, তাঁরা সপ্তাহের সাত দিনের মধ্যে কোন দিন স্রষ্টা কি কি সৃষ্টি করেছেন, তার বর্ণনা দিয়েছেন। নিজেদের বিশ্রাম গ্রহণের জন্য নির্দিষ্ট একটি দিন নির্ধারণ ও সাব্যস্ত করার জন্যই তারা এই রচনাটি জুড়ে দিয়েছেন এবং এর যৌক্তিকতা দাঁড় করাতে চেয়েছেন এই বলে যে, স্বয়ং স্রষ্টাই সবার আগে এই বিশ্রাম-দিনকে মর্যাদা দিয়ে গেছেন। এভাবে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে যুক্তি দাঁড় করিয়ে নিয়ে উল্লিখিত পুরোহিতগণ নিজেদের জাগতিক প্রয়োজনীয়তা মিটিয়েছেন। কিন্তু, বৈজ্ঞানিক তথ্যের নিরিখে তাদের সেই ধর্মীয় যুক্তিকে নিছক খামখেয়ালী ছাড়া আর কিছু ভাবা যায় না।
সৃষ্টির বিভিন্ন পর্যায় উল্লেখ করতে গিয়ে এই পুরোহিত-লেখকবৃন্দ বাইবেলের বর্ণনাকে একটি ধর্মীয় রূপ দিতেচেয়েছেন ঠিকই; কিন্তু এক সপ্তাহের যে কাজ তারা দেখিয়েছেন, বৈজ্ঞানিক বিচারে তার কোনো ভিত্তি খুঁজে পাওয়া কঠিন। পর্যায়ক্রমেই পথিবী ও বিশ্বজগৎ সৃষ্টি হয়েছে বটে; কিন্তু এ বিষয়ে মানুষ এখন সম্পূর্ণভাবে অবহিত যে, প্রতিটি পর্যায়ে সষ্টির জন্য প্রয়োজন হয়েছে। সুদীর্ঘ সময়ের। স্রষ্টার বিশ্রাম গ্রহণের জন্য বিশ্রাম-দিনের কথা বাদ দিলেও দেখা যাচ্ছে, ষষ্ঠ দিনের সন্ধ্যায় বিশ্বসৃষ্টির কাজ সমাপ্ত হয়ে গেছে। এই যদি হয়, তবে আমাদের অবশ্যই ভেবে দেখতে হবে যে, সপ্তাহের এই হিসেবটা আসলেই কি দিনক্ষণের হিসেবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নাকি এর অর্থ কোরআনের বর্ণনা মোতাবেক কোনো অনির্দিষ্ট কাল? সপ্তাহের বা দিনের হিসেব যদি সেই অনির্দিষ্ট কাল ধরা হয়, তাহলে সেক্ষেত্রেও পুরোহিতদের রচিত বাইবেলের এতদসংক্রান্ত বর্ণনা আরো বেশি করে অগ্রহণযোগ্য হয়ে পড়ে। বিশেষত সৃষ্টিতত্ত্বের বর্ণনায় বাইবেলের দিনের হিসেবে সন্ধ্যা ও সকালের যে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা হয়েছে, তা বিজ্ঞানের মৌলিক জ্ঞানের সম্পূর্ণ বিরোধী।
