উদাহরণস্বরূপ, বাইবেলে পুরাতন নিয়মের পেন্টাটেক বা পঞ্চপুস্তক (তাওরাত) অধ্যায়ের কথা বলা যেতে পারে। ফাদার ডি ভক্স তাঁর অনূদিত বাইবেলের আদিপুস্তকের (জেনেসিস) ভূমিকায় (পৃষ্ঠা, ১৩-১৪) এ ধরনের বহুসংখ্যক ভিন্ন-পাঠের কথা উল্লেখ করেছেন। উপস্থিতক্ষেত্রে সেসব উদ্ধৃতি প্রদান থেকে আমরা বিরত রইলাম।
যাহোক, এসব উদাহরণ ও বিশ্লেষণ থেকে যেকোনো পাঠকের মনে স্বভাবতই যে ধারণার সৃষ্টি হয়, তাহলো, বাইবেলের কোনো রচনাকেই শাব্দিক অর্থে–অন্যকথায়, বর্ণে বর্ণে গ্রহণ করার উপায় নেই। এখানে, একটি নমুনা পেশ করা হল :
বাইবেলের পুরাতন নিয়মের আদিপুস্তক (৬, ৩) রয়েছে, মহাপ্লাবনের ঠিক আগেভাগে আল্লাহ্ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছেন যে, অতঃপর মানুষের আয়ুষ্কাল একশত কুড়ি বৎসরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে : “পরন্তু তাহাদের সময় একশত বিংশতি বৎসর হইবে।” কিন্তু পরবর্তী পর্যায়ে এই আদিপুস্তকেই দেখা যায়, (১১, ১০-৩২) হযরত নূহের দশজন বংশধরের অনেকেই ১৪৮ থেকে ৬০০ বৎসর পর্যন্ত জীবিত রয়েছেন। দুই বক্তব্যের মধ্যে এই যে অসঙ্গতি, এ ধরনের। অসঙ্গতি প্রচলিত বাইবেলে রয়েছে অনেক। কিন্তু কেন যে এই অসঙ্গতি, তার অন্তরালবর্তী ব্যাখ্যাটিই বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃতপক্ষে, আদি পুস্তকের পূর্বোক্ত প্রথম বক্তব্য-সম্বলিত অধ্যায়টি (৬, ৩) জেহোভিস্ট আমলের রচনা। এই রচনার সময়কাল, যতটুকু জানা গেছে খুব সম্ভব খ্রিস্টপূর্ব দশম শতাব্দী। পক্ষান্তরে, সঙ্গতিহীন দ্বিতীয় বক্তব্য-সম্বলিত অধ্যায়টি (বাইবেল, আদিপুস্তক ১১, ১০-৩২) তার অনেক পরের রচনা (খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীর) : আর এটি রচিত হয়েছিল সেকেরডোটাল আমলে। মূল রচনায় বংশ-তালিকা এবং মানুষের আয়ুষ্কালের সঠিক তথ্য ও পরিসংখ্যান সম্ভবত ছিল, কিন্তু পরবর্তী পর্যায়ে মানুষের হাতে পড়ে সেই তথ্য ও পরিসংখ্যানের অবস্থার হয়েছে এই দূর্দশা!
বাইবেলের এই আদিপুস্তকে আরো এমনসব বিবরণ পাওয়া যায় যা আধুনিক বিজ্ঞানের সুপ্রতিষ্ঠিত তথ্য-প্রমাণের সাথে সম্পূর্ণ অসঙ্গতিপূর্ণ। উদাহরণস্বরূপ, এখানে তিনটি বিষয়ের আলোচনা তুলে ধরা হলঃ
১. বিশ্বসৃষ্টি এবং তার বিভিন্ন পর্যায়;
২. বিশ্বসৃষ্টির তারিখ ও পৃথিবীতে মানুষের আবির্ভাবের সময়কাল; এবং
৩. মহাপ্লাবনের বর্ণনা।
বিশ্বসৃষ্টির কাহিনী
ফাদার ডি ভক্স তার আলোচনায় দেখিয়েছেন যে, বাইবেলের পুরাতন নিয়মের আদিপুস্তকের শুরুতেই বিশ্বসৃষ্টি সম্পর্কে দুটি ভিন্ন ধরনের বক্তব্য পাশাপাশি বর্ণিত হয়েছে। আধুনিক বিজ্ঞানভিত্তিক সত্য ও তথ্য-প্রমাণের সাথে বাইবেলের এই বর্ণনার অসঙ্গতি কোথায়, তা নির্ণয়ের সুবিধার্থে পূর্বোক্ত দুটি বর্ণনারই পৃথক পৃথক আলোচনা তুলে ধরা হল :
বর্ণনাসমূহ
বাইবেলের আদিপুস্তকের প্রথম অধ্যায় জুড়ে এবং দ্বিতীয় অধ্যায়ের প্রথম অনুচ্ছেদে বিশ্বসৃষ্টির কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এরচেয়ে অসত্য বর্ণনা আর হয় না। পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও বিচার-বিশ্লেষণের সুবিধার্থে এখানে একটি একটি করে অনুচ্ছেদ গ্রহণ করা হল। উদ্ধৃতিসমূহ বাইবেলের রিভাইজড স্ট্যান্ডার্ড ভার্সন (১৯৫২) (ডব্লিউ. এম. কলিন্স অ্যান্ড সন্স, ব্রিটিশ অ্যান্ড ফরেন বাইবেল সোসাইটি) থেকে গৃহীত।
“আদিতে ঈম্বর আকাশমণ্ডল ও পৃথিবী সৃষ্টি করিলেন। পৃথিবী ঘোর ও শূন্য ছিল, এবং অন্ধকার জলধির উপরে ছিল, আর ঈশ্বরের আত্মা জলের উপরে অবস্থিতি করিতেছিলেন।”–অধ্যায় ১, বাণী ১ ও ২ :
স্বীকার করে নিতে অসুবিধা নেই যে, পৃথিবী সৃষ্টির আগে এখন আমরা যাকে বিশ বলছি, তা অন্ধকারে আবৃত ছিল। কিন্তু তখন পানির অস্তিত্ব ছিল। বলে বাইবেলে যা উল্লেখ রয়েছে, তা নিছক কল্পনা ছাড়া আর কিছু নয়। প্রকৃতপক্ষে, বিশ্বসৃষ্টির সূচনায় গ্যাসজাতীয় বায়ুবীয় পদার্থের অস্তিত্বের যথার্থ প্রমাণ বিদ্যমান। এই অবস্থায় সেখানে পানির অস্তিত্ব থাকার কথা ভুল ছাড়া কিছু নয়।
“পরে ঈশ্বর কহিলেন, দীপ্তি হউক, তাহাতে দীপ্তি হইল। তখন ঈশ্বর দীপ্তি উত্তম দেখিলেন এবং ঈশ্বর অন্ধকার হইতে দীপ্তি পৃথক করিলেন। আর ঈশ্বর দীপ্তির নাম দিবস ও অন্ধকারের নাম রাত্রি রাখিলেন। আর সন্ধ্যা ও প্রাতঃকাল হইলে প্রথম দিবস হইল।” –বাণী ৩ থেকে ৫
যে আলোক আকাশ ও জমিন জুড়ে বিস্তৃত, তা নক্ষত্রমণ্ডলীর জটিল প্রক্রিয়ার পরিণতি। বাইবেলের বর্ণনামতে, বিশ্বসৃষ্টির এই পর্যায়ে তখনও নক্ষত্র সৃষ্টি করা হয়নিঃ আদিপুস্তকে ১৪নং বাণীর আগে আকাশমণ্ডলীর এই ‘দীপ্তি’ অর্থাৎ, সূর্যসৃষ্টির কথা বলা হয়নি। এই বাণী অনুযায়ী সূর্য সৃষ্টি হয়েছিল বিশ্বসৃষ্টির চতুর্থ দিবসে। দিবসকে রাত্রি থেকে পৃথক এবং পৃথিবীর উপরে আলো প্রদান ইত্যাকার বর্ণনা মোটামুটি সঠিক। কিন্তু যেখানে আলোর উৎস (সূর্য) সৃষ্টি করা হয়েছিল বিশ্বসৃষ্টির তিনদিন পর, সেখানে সূর্য সৃষ্টির আগে বিশ্বসৃষ্টির প্রথমদিনেই পৃথিবীতে আলো ছড়িয়ে পড়ার বর্ণনা একান্তভাবেই যুক্তিহীন। কেননা, এখানে কোনো কারণ ছাড়াই কার্য সংঘটিত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। তাছাড়া, সূর্যহীন প্রথম দিবসেই সকাল ও সন্ধ্যার অস্তিত্ব নিছক কল্পনার বস্তু। কেননা, পৃথিবীকে তার প্রধানতম নক্ষত্র সূর্যের মণ্ডলে নিয়ে এসে তার আহ্নিক গতি তথা সূর্যকেন্দ্রিক আবর্তন সম্ভব করা হলেই শুধু দিবস পাওয়া যাবে; আর শুধু তখনই সম্ভব হবে সকাল ও সন্ধ্যার উপস্থিতি। তাই নয়কি!
