ইহুদীদের দ্বারা সংকলিত হলেও এই বাইবেল খ্রিস্টানদের দ্বারা গৃহীত হয় এবং ধর্মীয় দিকদিয়েও এ বিষয়ে তেমন কোনো অসুবিধা দেখা দেয়নি। কিভাবে এই ইহুদী-বাইবেল খ্রিস্টধর্মে পরিগৃহীত হয়েছিল, সে ব্যাপারে কার্ডিন্যাল ডানিয়েল প্রমুখ আধুনিক লেখক সবিশেষ গবেষণা চালিয়ে গেছেন। আদিতে খ্রিস্টধর্ম ছিল ইহুদী ধর্মেরই সম্প্রসারিত রূপ। তখন খ্রিস্টধর্ম পরিচিত ছিল ‘জুডিও-ক্রিশ্চিয়ানিটি’ নামে। খ্রিস্টধর্মের উপর পৌলের প্রভাব বিস্তারের পূর্ব পর্যন্ত সেই জুডিও-ক্রিশ্চিয়ান সমাজ বাইবেলের এই পুরাতন নিয়মকে নিজেদের ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার হিসেবে সম্পূর্ণভাবে গ্রহণ করে নিয়েছিল। বাইবেলের নতুন নিয়মের (ইঞ্জিল) লেখকগণও এই পুরাতন নিয়মের প্রতি ছিলেন সবিশেষ অনুগত। যদিও খ্রিস্টান সমাজ পরবর্তীকালে এ্যাপোক্রাইফা’ নামের বাহানায় নিজেদের সুসমাচারগুলোকে ঢেলে সাজাতে কার্পণ্য করেনি; তবুও বাইবেলের এই পুরানো নিয়মের পুস্তকসমূহের বেলায় তেমন কোন বর্জন বা সংশোধনের গরজ তাদের মধ্যে দেখা যায়নি; এর সবকিছু, মানে প্রায় সবকিছুই তারা গ্রহণ করেছিল বিনাদ্বিধায়।
মূলত, মধ্যযুগ শেষ হওয়ার আগে অন্য কোনো জায়গায় তো বটেই, এমনকি পাশ্চাত্য জগতেও কার এমন বুকের পাটা ছিল যে, বাইবেলের এই অসম ও অসংলগ্ন সংকলন-কর্মের বিরুদ্ধে টু শব্দটি করতে পারে?
এ প্রশ্নের জবাব একটিই। আর তা হলো–তেমন কেউ ছিলেন না : তেমন কাউকে প্রায় পাওয়াই যায় না। মধ্যযুগ শেষ হয়ে আধুনিক যুগ যখন শুরু হলো, দেখা গেলো, একজন-দুজন করে সমালোচক এগিয়ে আসছেন। কিন্তু গির্জার কর্মকর্তারা নিজস্ব পন্থায় তাঁদের স্তব্ধ করে দিতে সক্ষম হয়েছেন। সন্দেহ নেই যে, অধুনা কিছুসংখ্যক খাঁটি সমালোচক বাইবেলের বাণী সম্পর্কে তাঁদের সমালোচনা অব্যাহত রেখেছেন। পক্ষান্তরে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, এক শ্রেণীর ধর্মীয় বিশেষজ্ঞ সমালোচনার নামে বাইবেলের খুঁটিনাটি বিচার বিশ্লেষণে নিজেদের নিয়োজিত রেখেছেন ঠিকই; কিন্তু যেসব বিষয়কে তারা বিনয়ের সঙ্গে জনগণের জন্য দুর্বোধ্য বলে রায় দিচ্ছেন, সেইসব অসম ও অসংলগ্ন বিষয়ের গভীরে যেতে তারা মোটেও রাজি হচ্ছেন না। বিজ্ঞানের আলোকে ওইসব জটিলতার গ্রন্থি উন্মোচনে তাঁদের কাউকে এগিয়ে আসতেও দেখা যাচ্ছে না। যেসব ক্ষেত্রে আদর্শগত বিচারে বাইবেলের বর্ণনা ইতিহাসের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেসব জায়গায় তারা বাইবেলের বক্তব্যকে ইতিহাসের সমান্তরালে এনে সুপ্রতিষ্ঠিত করছেন ঠিকই, কিন্তু এ যাবত তারা কেউই কোন বিশদ ও খোলাখুলি আলোচনার মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক সত্যের সাথে বাইবেলের বর্ণনার তুলনামূলক বিচার-বিশ্লেষণে এগিয়ে আসেননি। তাদের এই এগিয়ে না আসার কারণ আর কিছুই নয়, একটা বিষয় তারা স্পষ্টভাবে বুঝতে পেরেছেন যে, এতোকাল যাবত যদিও বাইবেলের বর্ণনা তর্কাতীতভাবে গৃহীত হয়ে এসেছে, তথাপি, এখন যদি এ ধরনের বৈজ্ঞানিক বিচার-বিশ্লেষণ পরিচালিত হয়, তবে ইহুদী ও খ্রিস্টান সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত এই ধর্মগ্রন্থটির সত্যতা সম্পর্কে জনসাধারণের মনে প্রশ্ন না জেগে পারবে না।
২০. বৈজ্ঞানিক বিচারের ফলাফল
বিজ্ঞানসংক্রান্ত বক্তব্য বাইবেলের পুরানো নিয়মে খুবই কম। সেজন্য, যেসব বিষয়ে বাইবেলের পুরানো ও নতুন নিয়মের বর্ণনার সাথে আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠিত সত্যের বিরোধ দেখা যায়, সে ধরনের বিষয়ের সংখ্যাও খুব বেশি নয়। কিন্তু, যত কমসংখ্যকই হোক, বিজ্ঞানের সাথে বাইবেলের এই বিরোধ ও অসংগতির গুরুতু সত্যিই অপরিসীম।
বাইবেলের বর্ণনায় ইতিহাসগত ত্রুটি-বিচ্যুতি প্রচুর বলা অনাবশ্যক যে, পূর্বোক্ত ইহুদী ও খ্রিস্টান পণ্ডিতগণ স্বভাবগত প্রবণতায় বাইবেলের এইসব ত্রুটি-বিচ্যুতির গুরুত্ব কম করে দেখানোর প্রয়াস পেয়েছেন।
কেননা, তাঁদের মতে, বাইবেলের পুণ্যবান রচয়িতাবৃন্দ ধৰ্মীয়-তত্ত্বের সাথে সামঞ্জস্য বিধান করে ইতিহাসকে উপস্থাপিত করতে গিয়ে এবং ধর্মীয় কোনো প্রয়োজন পূরণের স্বার্থে ইতিহাসকে তুলে ধরতে গিয়ে যদি কোনো ভুল-ত্রুটি করেই থাকেন, তবে সেই ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলো নাকি অস্বাভাবিক না হওয়ারই কথা!
যুক্তির বিচারে বাইবেলের পুরাতন নিয়মের বিভিন্ন অংশ থেকে বিপুলসংখ্যক অসংগতি ও অবাস্তব বিষয় চিহ্নিত করা সম্ভব। আদিতে সম্ভবত মূল বাইবেলের কোনো ঘটনার মাত্র দু’-একটি ভিন্ন পাঠ পরিলক্ষিত হয়। কিন্তু পরবর্তী পর্যায়ে সেই একই বিষয়ে বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত বহু লেখকের রচনা বাইবেলে সন্নিবেশিত হয়েছে। শুধু তাই নয়, বাইবেলের রচনাসমূহ বহুবারই নানাভাবে সংশোধন করা হয়েছে এবং পরবর্তী পর্যায়ে সেইসব সংশোধিত পাঠও বাইবেলের অন্তর্ভুক্ত করে নেয়া হয়েছে। অনেকে অনেক ক্ষেত্রে বাইবেলের বিভিন্ন বর্ণনার টীকা অথবা ভাষ্য রচনা করেছেন। পরবর্তী সময়ে যখন নতুন কোনো সংস্করণ প্রকাশিত হয়, তখন, সেই টীকাভাষ্যগুলোও মূল রচনার অংশ হিসেবে জুড়ে দেয়া হয়েছে। এইসব সংশোধনী ও সংযোজনা অধুনা বাইবেল বিশেষজ্ঞবৃন্দ সহজেই সনাক্ত করে নিতে পারছেন। শুধু তাই নয়, বাইবেলের কোনো অংশ কখন কার দ্বারা রচিত হয়েছিল, তাও তাঁদের পক্ষে চিহ্নিত করা সম্ভব হচ্ছে।
