খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দীতে আবির্ভূত হন সফনিয়, জিরমিয়, নহুম ও হবককুম নবী। এঁরা প্রত্যেকে ধর্মবাণী প্রচারের ক্ষেত্রে বিশিষ্টতা অর্জন করেছিলেন। জিরমিয় নবী শহীদ হন। তাঁর প্রত্যাদেশপ্রাপ্ত বাণীসমূহ বারুচ বা বারুখ কর্তৃক সংকলিত হয়। এই বারুখই ছিলেন সম্ভবত বাইবেলের বিলাপ পুস্তকের রচয়িতা।
খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীর শুরুতেই ইহুদীরা ব্যাবিলনে নির্বাসিত হয়। তখন তাদের নবী ছিলেন এজেকেল (বাংলা বাইবেলে যিহিস্কেল)। নবী এজেকেল সেই দুর্দিনে ইহুদীদের সান্ত্বনা দান করতেন। তাদের মনোবল চাঙ্গা রাখতেন। যেভাবে তিনি নবুয়ত লাভ করেছিলেন, সেই দৃশ্যের বর্ণনা বাইবেলে বিখ্যাত হয়ে রয়েছে। অন্যদিকে, বাইবেলের ওবদিয় পুস্তকে অধিকত জেরুজালেমের বাসিন্দাদের দুর্দশার কাহিনী বর্ণিত হয়েছে।
খ্রিস্টপূর্ব ৫৩৮ অব্দে ইহুদীদের নির্বাসনকাল শেষ হয়। তখনই শুরু হয় হগয় ও সখরিয়া নবীর (হযরত জাকারিয়া) নবুয়ত। তারা উভয়েই জেরুজালেমের উপাসনালয় পুনঃনির্মাণের জন্য ইহুদীদের প্রতি আবেদন জানান। এই উপাসনালয়ের নির্মাণকাজ সমাপ্ত হওয়ার পরে ঘটনা মালাখি পুস্তকে রয়েছে। মালাখি রচিত এই পুস্তকে আরো লিপিবদ্ধ রয়েছে আধ্যাত্মিক ভাবধারার প্রত্যাদেশ বাণীসমূহ।
যোনা (হযরত ইউনুস) পুস্তক যে কিভাবে বাইবেলের পুরাতন নিয়মে স্থান পেল, তা অনেকের নিকট বিস্ময়ের ব্যাপার। কেননা, এই পুস্তকে অন্যান্য নবীর প্রত্যাদেশপ্রাপ্ত পুস্তকের মতো বাণী বা বক্তব্য-সম্বলিত কোনো রচনা নেই। যোনা পুস্তক প্রকৃতপক্ষে একটি কাহিনী মাত্র : স্রষ্টার ইচ্ছার প্রতি আত্মসমর্পণের অপরিহার্য প্রয়োজনীয়তার কথাই এই কাহিনীর মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
বাইবেলের পুরাতন নিয়মের অন্তর্ভুক্ত দানিয়েল পুস্তকখানি হিব্রু, আরামীয় এবং গ্রীক এই তিনটি ভাষায় রচিত হয়। খ্রিস্টান ভাষ্যকারদের মতে, ইতিহাসের দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে এ পুস্তকখানিকে ‘অসময়ের অসংলগ্ন প্রকাশ’ ছাড়া কিছুই বলা যায় না। সম্ভবত, খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীতে ম্যাকাবিয়ান আমলে এটি রচিত হয়ে থাকবে। ইহুদীরা যখন ‘ন্যক্কারজনক’ অবস্থায় পড়ে হতাশার অতলে তলিয়ে যাচ্ছিল, তখন লেখক এই পুস্তকের মাধ্যমে তাদের মধ্যে বিশ্বাস সুদৃঢ় রাখার প্রয়াস পেয়েছিলেন। তিনি ইহুদীদের এই আশ্বাসবাণী শুনিয়েছিলেন যে, মুক্তির মুহূর্ত সমাগত–(ই. জ্যাকোব)
১৯. গীত-সংহিতা ও হিতোপদেশ পুস্তক
এই দুই পুস্তক মূলত অতুলনীয় সাহিত্যকীর্তি। গীত-সংহিতার সর্বোত্তম অধ্যায় হচ্ছে ‘সাম’ বা স্রষ্টার প্রশংসাগীতি। এটি হিব্রু কবিতার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ মিনার বিশেষ। এই গীত-সংহিতার বেশিরভাগ কবিতা বা সঙ্গীত হযরত দাউদের রচনা; বাকিগুলো রচিত যাজক ও পুরোহিতদের দ্বারা। এসব গীতি কবিতার বিষয়বস্তু হচ্ছে স্রষ্টার প্রশংসা, প্রার্থনা এবং বিভিন্ন অনুষ্ঠানের বিবরণ। উপাসনা ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে এসব সঙ্গীত গাওয়া হত।
‘ইয়োব পুস্তক’, ‘হিতোপদেশ’ ও ‘উপদেশক’–এই পুস্তক তিনটি মোটামুটিভাবে চমৎকার : সম্ভবত খ্রিস্টপূর্ব ৪০০ থেকে ৫০০ অব্দে এগুলো রচিত হয়েছিল।
খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে জেরুজালেমের পতনের উপরে ভিত্তি করে রচিত ‘বিলাপ পুস্তক খুব সম্ভব জিরমিয় নবীর আমলের রচনা।
এই প্রসঙ্গে পরমগীত পুস্তকেরও উল্লেখ করতে হয়। অলংকারবহুল ভাষায় রচিত এই ‘পরমগীত’-এর বিষয়বস্তু প্রধানত স্রষ্টার প্রেম। ‘উপদেশক’ পুস্তক হচ্ছে, হযরত সোলায়মান এবং তাঁর দরবারের কতিপয় বিজ্ঞ ব্যক্তি ও কিছুসংখ্যক পুরোহিতের উপদেশবাণীর সংকলন। একলেসিয়াটস বা কোহলেথ পুস্তকে বিজ্ঞজনোচিত দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে পার্থিব সুখ-শান্তির অসারতা তুলে ধরা হয়েছে।
সুতরাং, বাইবেলের পুরানো নিয়মের গোটা অংশটাতেই দেখা যায় কমপক্ষে সাতশত বৎসর ধরে নানাজনের লিখিত এমনসব অসম ও অসংলগ্ন রচনার সমাহার, যার তুলনা অন্য কোথাও খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। এখানে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক যে, কিভাবে এ ধরনের বহু পুস্তকের একটি সংকলন বহু শত বৎসর যাবত একটি অচ্ছেদ্য অখণ্ড পুস্তক হিসেবে টিকে থাকতে পারল? এবং সম্প্রদায়গতভাবে প্রকাশিত বিভিন্ন সংস্করণে কিছু কিছু পরিবর্তন দেখা গেলেও এই সংকলনটিই বা কিভাবে ইহুদী ও খ্রিস্টান উভয় সম্প্রদায়ের ধর্মপুস্তক হিসেবে চালু হলো? উল্লেখ্য যে, দুর্বোধ্যতা ও অস্পষ্টতা এই পুস্তকের মূল সুর বলেই বাইবেলকে গ্রীক ভাষায় বলা হয়, ‘কানুন’ বা প্রামাণ্য বিধান : সে বিধান সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন চলে না।
বাইবেলের পুরানো নিয়মের মধ্যে বিভিন্ন অসংলগ্ন পুস্তকের এই যে সমাহার, এই সমাহার তথা সংকলন কিন্তু খ্রিস্টান আমলের নয়, বরং ইহুদীদের আমল থেকেই এই বাইবেল চালু রয়েছে। খুব সম্ভব খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দীতে প্রাথমিকভাবে এই বাইবেল সংকলিত হয়ে সাধারণের ধর্মপুস্তক হিসেবে পরিগৃহীত হয়েছিল। পরবর্তী পুস্তকসমূহ সংযুক্ত হয়েছিল আরো পরে। উল্লেখ নিপ্রয়োজন যে, বাইবেলের পুরাতন নিয়মের প্রথম পঞ্চপুস্তক–যা তাওরাত বা পেন্টাটেক নামে পরিচিত, সেই পাঁচটি পুস্তকের মর্যাদা সবসময়ই ছিল সর্বোচ্চ। পরবর্তী পর্যায়ে কোনো নবীর ভবিষ্যদ্বাণী (যথা : অপরাধপূর্ণ কাজের জন্য শাস্তি প্রাপ্তির ভবিষ্যদ্বাণী) যখন পূর্ণ হয়েছিল, তখন তার বিবরণীও পূর্বোক্ত গৃহীত পুস্তকগুলোর সাথে অনায়াসে সংযুক্ত হতে পেরেছিল। তাছাড়া, যেসব নবী আশার বাণী শুনিয়ে সফল হন, তাঁদের বিবরণীও সম্ভবত একইভাবে সংযুক্ত হয়ে থাকবে। এভাবে খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীর মধ্যেই নবীদের কানুন-সম্বলিত এই বাইকেল সংকলনের কাজটি সমাধা হয়।…
