‘শ্যামুয়েল পুস্তক’ এবং ‘রাজাবলী পুস্তক’ দুটি মোটের উপর শ্যামুয়েল ও সৌল এবং ডেভিড ও সলোমনের (হযরত দাউদ ও হযরত সোলায়মান) জীবন বৃত্তান্তের সংকলন ছাড়া আর কিছু না। কিন্তু পুস্তকগুলোতে ইতিহাসের সত্যতা কতটা সংরক্ষিত হয়েছে তা বিতর্কের ব্যাপার। ই. জ্যাকোব এসব পুস্তকের বহু ভ্রান্তি নির্দেশ করেছেন। তিনি আরো দেখিয়েছেন যে, কোনো ঘটনার দুটি এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে তিনটি পর্যন্ত সম্পূর্ণ ভিন্ন বর্ণনা পাওয়া গেছে। ইলিয়াস, এলিশা ও ইশাইয়া প্রমুখ নবীর কাহিনীও এই পর্যায়ে বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু সে বর্ণনায় ইতিহাস আর উপকথা একসঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হয়েছে। অথচ, এ বিষয়ে অপরাপর ভাষ্যকারদের মতই ফাদার এ. লেফেভারের মন্তব্য, “এইসব পুস্তকের ঐতিহাসিক যে গুরুত্ব তা নাকি একেবারে মৌলিক!”
‘বংশাবলী পুস্তক’–১ ও ২ ‘ইষরা পুস্তক’ এবং ‘নহিমিয় পুস্তক’ কয়টির লেখক কিন্তু একই ব্যক্তি। বংশাবলী-বিশারদ হিসেবে পরিচিত এই লেখক খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীতে এসব পুস্তক রচনা করেন। তিনি সৃষ্টিতত্ত্বের ইতিহাস থেকে শুরু করে তার সময়কাল পর্যন্ত ইতিহাস রচনা করেছিলেন। অবশ্য, তাঁর রচনায় ইহুদী রাজবংশের তালিকা হযরত দাউদ পর্যন্ত গিয়েই শেষ হয়েছে। মূলত, তিনি তাঁর রচনায় অন্য অনেককিছুর সাথে শ্যামুয়েল পুস্তক ও রাজাবলী পুস্তকে বর্ণিত ঘটনাবলী ব্যবহার করেছেন নির্বিচারে : “তিনি সেসব শুধু নকল করেই গেছেন; সেসবের মধ্যে যে অসঙ্গতি ছিল, তা কিন্তু লক্ষ্য করেননি।” (ই. জ্যাকোব) এতুদসত্ত্বেও একটি কথা স্বীকার করতে হবে যে, এই লেখক তার পুস্তকের বর্ণনা পুরাকীর্তি ও ধ্বংসাবশেষের সাথে মিলিয়ে নিয়ে সেসবের একটি সঠিক রূপ দেয়ার প্রয়াস চালিয়ে গেছেন। অবশ্য, এসব রচনায় ধর্মীয় বিধি বিধান ও আইনকানুনের স্বার্থে ইতিহাসকে সযত্নে সংশোধন করা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে ই. জ্যাকোবের মন্তব্য : “এই লেখক বহুক্ষেত্রে ইতিহাস রচনা করেছেন ধর্মীয় বিধি-বিধানের প্রয়োজন পূরণের জন্য। প্রসঙ্গত, এই লেখক রাজা মনঃশি-র যে কাহিনী বর্ণনা করেছেন, তার সূত্র টেনে ই. জ্যাকোব বলেছেন : “লেখকের বর্ণনামতে, এই রাজা ছিলেন পরম ধার্মিক এবং ন্যায়বিচারক। তাঁর রাজত্বকাল ছিল সুদীর্ঘ ও সমৃদ্ধপূর্ণ। রাজা মনঃশি আসিরিয়ায় অবস্থানকালে স্রষ্টার সাথে কথোপকথন করেছিলেন বলেও লেখক। উল্লেখ করেছেন। (বংশাবলী, ২-৩৩/১১) কিন্তু লেখক যা-ই বলুন না কেন, বাইবেলের অন্যত্র কিংবা বাইবেলের বাইরে অন্যকোনো সূত্রে এই রাজা সম্পর্কে কোথাও কিছু উল্লেখ পাওয়া যায় না।” ইষরা পুস্তক’ এবং নহিমিয় পুস্তক দুটিকেও একইভাবে তীব্র সমালোচনার সম্মুখীন হতে হয়েছে। কারণ, আর কিছুই নয়। দুটি পুস্তকেই গুরুত্বহীন বিষয় নিয়ে বাগাড়ম্বর করা হয়েছে এবং এই দুই পুস্তকে যে সময়ের কাহিনী বর্ণনা করা হয়েছে (খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দী) সে সময়কার কোনো ঘটনা সম্পর্কে তেমন কিছুই জানা যায় না। তাছাড়া, বাইবেলের বাইরে এসব ঘটনার প্রামাণ্য দলিলও তেমন কিছু নেই।
একইভাবে টোবিট, জুডিথ ও ইস্টের পুস্তক তিনটিকেও ঐতিহাসিক পুস্তকের পর্যায়ে ফেলা হয়েছে। কিন্তু এসব পুস্তকে ইতিহাসের কাহিনী বর্ণনা করতে গিয়ে লেখকেরা স্বেচ্ছাচারিতার চুড়ান্ত করে ছেড়েছেন। ঐতিহাসিক ব্যক্তিবর্গের নাম পর্যন্ত পরিবর্তন করা হয়েছে। নতুন নতুন ঘটনা ও চরিত্রের আমদানি করা হয়েছে। আর এসব কিছুই করা হয়েছে ধর্মের নামে। প্রকৃতপক্ষে, এসব কাহিনীতে ইতিহাসের নাম করে যতসব অসত্য ও অসম্ভব ঘটনা এমনভাবে ঢোকানো হয়েছে, যেন গল্প পড়ে পাঠক নীতিকথা হিতোপদেশ পেতে পারে।
বাইবেলের ম্যাক্কাবিস পুস্তকখানি অবশ্য সম্পূর্ণ আলাদা ধরনের। এ পুস্তক খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীতে সংঘটিত ঘটনাবলী স্থান লাভ করেছে। এসব বর্ণনায় এই সময়ের ইতিহাসের সত্যতা সম্পূর্ণ অক্ষুণ্ণ রাখার প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়। এ কারণে সত্য ঘটনার বৃত্তান্ত হিসেবে এই পুস্তকের গুরুত্ব অনেক।
সুতরাং, দেখা যাচ্ছে বাইবেলে বর্ণিত ঐতিহাসিক পুস্তকাবলী অনেকাংশে ভিত্তিহীন। এসব পুস্তকে ইতিহাস যেমন বৈজ্ঞানিক প্রমাণের প্রতিদ্বন্দ্বী; তেমনি কোনো কোনো কাহিনী ভাবাবেগের বহিঃপ্রকাশ ছাড়া কিছুই নয়।
১৮. বিভিন্ন নবীর কিতাবসমূহ
বাইবেলের পুরাতন নিয়মে বিভিন্ন নবীর শিক্ষার সম্পর্কিত বেশ কয়েকটি পুস্তক স্থান লাভ করেছে এবং এসব পুস্তককে হযরত মুসা, শ্যামুয়েল, ইলিয়াস, এলিশা প্রমুখ প্রাথমিক যুগের বড় বড় নবীর বিবরণী থেকে আলাদাভাবে স্থান দেয়া হয়েছে। এসব পুস্তকে খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম শতাব্দী থেকে দ্বিতীয় শতাব্দী পর্যন্ত বিস্তৃত সময়ের বিবরণী তুলে ধরা হয়েছে।
খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম শতাব্দীর বিবরণী পাওয়া যায় আমোষ, হোশেয়, যিমাইয় এবং মিখাই পুস্তকে। আমোষ নবী সামাজিক অবিচারের বিরুদ্ধাচরণের জন্য বিখ্যাত ছিলেন। পক্ষান্তরে, হোশেয় নবীর সময় ধর্মের নামে দুর্নীতি চরমে পৌঁছেছিল। হোশেয় নবী নিজেও দুর্নীতিবাজদের কবলে নিপতিত হয়ে ব্যক্তিগত জীবনে চরম অশাস্তি ভোগ করেন (প্যাগানদের এক ধর্মীয়-বেশ্যাকে বিয়ে করতে তিনি বাধ্য হয়েছিলেন)। শত অত্যাচার সত্ত্বেও আল্লাহ্ যেমন তার বান্দাদের ক্ষমা করেন, তেমনি অনুসারীরা অধঃপতনের নিমস্তরে নিপতিত হয়ে তাকে অশেষ দুঃখ দিলেও হোশেয় নবী তাদের ভালবাসা দিতে দ্বিধা করেননি। যিশাইয়া (ইশাইয়া) ছিলেন রাজনীতিবিদ এবং এক ঐতিহাসিক চরিত্র। রাজ রাজড়ারা তার থেকে পরামর্শ গ্রহণ করতেন; এবং দেশের রাজনৈতিক ঘটনাবলীর উপরও তার নিয়ন্ত্রণ ছিল। নবী হয়েও তিনি সবসময় জাঁকজমকের সাথে জীবনযাপন করতেন। তাঁর অনুসারিগণ খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দী পর্যন্ত তাঁর ব্যক্তিগত কার্যাবলীর বিবরণী এবং তাঁর প্রত্যাদেশপ্রাপ্ত বাণীসমূহ সংকলনও প্রকাশ করে গেছেন। এসব বিবরণী ও বাণীর মধ্যে অসাম্যের বিরোধিতা, আল্লাহর বিচারকে ভয় করে চলা, নির্বাসন অবস্থায় প্রদত্ত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ও পরবর্তী পর্যায়ে ইহুদীদের প্যালেস্টাইনে প্রত্যাবর্তন উল্লেখযোগ্য। এই ঘোষণাপত্র ও প্রত্যাবর্তন-সংক্রান্ত বিবরণী থেকে একটি বিষয় দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, যিশাইয়া নবীর নবুয়তি-কার্যক্রম ছিল তখনকার ইহুদীদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সমান্তরাল। যিশাইয়া নবীর সমসাময়িক আরেকজন নবী ছিলেন মিখা; তারও কাজকর্ম ছিল একইধরনের।
