এতদসত্ত্বেও আধুনিক বৈজ্ঞানিক তথ্য ও পরিসংখ্যানের নিরিখে পুরোহিতদের রচিত এই সংস্করণটিতে বর্ণনাগত ভ্রান্তি অনেক বেশি। পৃথিবীতে মানুষের প্রথম আবির্ভাবের কাল এবং সৃষ্টির সূচনাকালীন পরিস্থিতিতে মানুষের মর্যাদা-সংক্রান্ত বর্ণনায় এসব ভ্রান্তি সুস্পষ্ট। তাওরাতের মূল গ্রন্থের অদল-বদল ঘটাতে গিয়েই যে এই ভ্রান্তি ঘটেছে, তা বলাই বাহুল্য।
ফাদার ডি ভক্স লিখে গেছেন, “পুরোহিতদের রচিত এই সংস্করণে ইহুদীদের নিজস্ব আইনগত বিধি-বিধানের সমর্থনে বিভিন্ন কাহিনী সংযোজিত হয়েছে। যেমন : বিশ্বসৃষ্টির কর্মকাণ্ড শেষে বিধাতা কর্তৃক শনিবারে বিশ্রামগ্রহণ; হযরত নূহ ও হযরত ইবরাহীমের প্রতি আনুগত্য; ত্বকছেদন এবং ম্যাকপেলা গুহা ক্রয়ের মাধ্যমে ইহুদী যাজকদের কেনানে ভূসম্পত্তি লাভ” ইত্যাদি।
এই আলোচনা প্রসঙ্গে অবশ্যই স্মরণযোগ্য যে, বাইবেলের এই সেকেরডোটাল সংস্করণটির সংকলনকাল ইহুদীদের ব্যাবিলনে নির্বাসন থেকে প্যালেস্টাইনে ফিরে আসা পর্যন্ত। অর্থাৎ খ্রিস্টপূর্ব ৫৩৮ সাল থেকে এর সূচনা। এ কারণে বাইবেলের এই সংস্করণে নির্ভেজাল রাজনৈতিক সমস্যাও ধর্মীয় বিষয়ের সাথে জড়িয়ে গেছে।
বাইবেলের পুরাতন নিয়মের আদি পুস্তকটি যে তিনজন ভিন্ন লেখকের তিনটি আলাদা রচনার সমাহার, সেই অভিমত এখন সুপ্রতিষ্ঠিত। ফাদার ডি ভক্স তাঁর অনূদিত ফরাসী বাইবেলের মুখবন্ধে এই আদিপুস্তকের কোন কোন পরিচ্ছেদ কার কার রচনা এবং কোন কোন আমলের রচনা, তার একটা তালিকাও তুলে ধরেছেন। আর সেই প্রামাণ্য-দলিলের আলোকে বাইবেলের কোন কোন অধ্যায়ের রচনায় কোন যুগের কোন কোন লেখকের কতোটা অবদান–তাও নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব। উদাহরণস্বরূপ, সৃষ্টিতত্ত্ব-সংক্রান্ত আলোচনা, মহাপ্লাবন এবং তৎপরবর্তী হযরত ইবরাহীমের আমল পর্যন্ত ঘটনাবলীর কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। আদিপুস্তকের এগারোটি অধ্যায় জুড়ে এসব কাহিনী বর্ণিত রয়েছে। কিন্তু সম্পূর্ণ বর্ণনার কোন অংশ জেহোভিস্ট আমলের রচনা আর কোন অংশ সেকেডোটাল আমলে রচিত তা রচনাভঙ্গির দ্বারাই সুস্পষ্টভাবে চিহ্নিত। যেমনঃ
বাইবেলের আদিপুস্তকে জেহোভিস্ট ও সেকেডোটাল পাঠের সংমিশ্রণ-এর ছক
দ্রষ্টব্য : প্রথম ও তৃতীয় সংখ্যাটি অধ্যায়সূচক। বন্ধনীর মধ্যকার দ্বিতীয় ও চতুর্থ সংখ্যাটি বাক্য বা বাক্যাংশসূচক। ‘পাঠ’-এর ঘরে ‘জে’ বলতে জেহোভিস্ট পাঠ এবং ‘সে’ বলতে সেকেরডোটাল পাঠ বুঝতে হবে। যেমন : ছকের প্রথম লাইন : আদি পুস্তকের ১নং অধ্যায়ের ১নং বাক্যাংশ থেকে ২ নং অধ্যায়ের ৪-ক বাক্যাংশ পর্যন্ত সেরেডোটাল পাঠ।
দেখা গেছে, বাইবেলের প্রথম এগারোটি অধ্যায়ে ইলোহিস্ট আমলের কোনো রচনা স্থান পায়নি। এক্ষেত্রে, আদিসৃষ্টি থেকে হযরত নূহের আমলের কাহিনীর বর্ণনায় (অর্থাৎ প্রথম পাঁচটি অধ্যায় রচনায়) একটি সাধারণ নিয়ম অনুসরণ করা হয়েছে। প্রথমে জেহোভিস্ট বর্ণনা এবং পরের বর্ণনা সেকেরডোটাল আমলের; এবং এভাবে শুরু থেকে শেষপর্যন্ত গোটা বর্ণনাকেই সাজিয়ে নেয়া হয়েছে। তদুপরি, মহাপ্লাবনের অধ্যায়ে বিশেষত সপ্তম ও অষ্টম অধ্যায়ে এসে একের-পর–এক প্রতিটি আমলের বর্ণনা সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে। এমন সংক্ষিপ্ত যে, কোনো বর্ণনা একবাক্যেই শেষ হয়ে গেছে। ইংরেজি বাইবেল পরীক্ষা করে দেখা গেছে যে, এই পর্যায়ে কম-বেশি একশত লাইনের মধ্যে একেকটি আমলের রচনা ঘুরেফিরে এসেছে পরপর সতেরো বার। আর তাই, এখন বর্তমান আমলের বাইবেল পড়তে গিয়ে দেখা যায়, গোটা বর্ণনা কিভাবে যতসব অসম্ভব ও পরস্পরবিরোধী কাহিনীতে পূর্ণ।
ঐতিহাসিক পুস্তকাবলী
বাইবেলের পুরাতন নিয়মের ঐতিহাসিক পুস্তকগুলো (বাংলা বাইবেলের দ্বিতীয় বিবরণ-এর পরবর্তী পুস্তকসমূহ দ্রষ্টব্য) মাধমে ইহুদীদের ইতিহাস সম্পর্কে অবহিত হওয়া যায়। এই ইতিহাসের বিস্তার প্রতিশ্রুত ভূখণ্ডে তাদের আগমন (খুব সম্ভব খ্রিস্টপূর্ব ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষদিকের ঘটনা) থেকে খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে ব্যাবিলনে তাদের নির্বাসন পর্যন্ত।
এই পুস্তকগুলোতে যেসব ঘটনার উপরে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে, যে কোনো বিচারে তা ইহুদীদের নিজস্ব জাতীয় ঘটনাবলী” ছাড়া কিছু নয়। কিন্তু এখানে এসব ঘটনা উপস্থাপিত করা হয়েছে আল্লাহর প্রতিশ্রুতি পূর্ণ হওয়ার উদাহরণ হিসেবে।
যাহোক, এসব পুস্তকের বর্ণনায় ঐতিহাসিক সত্যতার কোনো ধার ধারা হয়নি। যেমন, এই অধ্যায়ে সন্নিবেশিত ইশাইয়া পুস্তকটি প্রথমত ও প্রধানত সংকলিত হয় ধর্মীয় বিধি-বিধান প্রচারের উদ্দেশ্যে। এই পর্যায়ে এই স্ববিরোধিতাকে সামনে রেখেই ই. জ্যাকোব তাঁর পুস্তকে আরো একটি বৈপরিত্যের উদাহরণ তুলে ধরেছেন। তাহল, জেরিকো এবং আই-এর কল্পিত ধ্বংসের ঘটনা–যারমধ্যে প্রকৃত ঘটনার সাথে বর্ণনার কোনো মিল খুঁজে পাওয়া দুস্কর।
বাইবেলের পুরাতন নিয়মের বিচারকগণ পুস্তকের প্রধান বিষয়বস্তু হল শত্রু পরিবেষ্টিত মনোনীত ব্যক্তিদের (অর্থাৎ ইহুদীদের) পক্ষ সমর্থন করা; এবং এই মর্মে বক্তব্য রাখা যে, আল্লাহই তাদের সমর্থন দিচ্ছেন। ফাদার এ লেফেভার তার ক্রাম্পন বাইবেলের’ মুখবন্ধে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থেকেই এই মন্তব্য করেছেন যে, বাইবেলের এই ‘বিচারকগণ পুস্তকটি বেশ কয়েকবার সংশোধন করা হয়েছে। বাইবেলের বিভিন্ন ভূমিকা ও পরিশিষ্ট এর বড় প্রমাণ। রুথের কাহিনীটি যে এই পুস্তকের বর্ণনার সাথে জোড়াতালি দেয়ার মত করে জুড়ে দেয়া হয়েছে, তা বলাই বাহুল্য।
