ঊনবিংশ শতাব্দীতে এসে বাইবেলের পুরাতন নিয়মের মূল উৎস সম্পর্কে আরো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিচার-বিশ্লেষণ চলে; এবং সুষ্ঠু বিচার-পরিচালনার মাধ্যমে তাওরাত রচনার চারটি প্রধান ধারা স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। যথাঃ জেহোভিস্ট ধারা, ইলোহিস্ট ধারা, গণনাপুস্তকের ধারা এবং সেকেরডোটাল বা পুরোহিতদের রচনার ধারা। এমনকি এই গবেষণায় তাওরাতের এই বিভিন্ন ধারার রচনাকাল পর্যন্ত নির্ণয় করা সম্ভব হয়। যথা :
১. জেহোভিস্ট ধারার রচনাকাল খ্রিস্টপূর্ব নবম শতাব্দীতে (জুদাহ্-তে এই ধারার পুস্তকগুলো রচিত)
২. ইলোহিস্ট ধারার পুস্তকগুলো রচিত হয় সম্ভবত এর কিছু পরে (এসব রচিত হয় ইহুদীদের রাজ্যে)।
৩. ডেটারোনমি বা গণনাপুস্তকের রচনাকাল কারো কারো মতে খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম শতাব্দী (ই. জ্যাকোব); আবার কারো কারো মতে যিশাইও নবীর সময় (ফাদার ডি ভক্স)।
৪. বাইবেলের যে অংশ পুরোহিতদের রচনা, সেই সেকেরডোটাল পাঠ বা ভার্সন রচনার সময়কাল ইহুদীদের নির্বাসনকালে কিংবা তৎপরবর্তী খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে।
সুতরাং দেখা যাচ্ছে, বাইবেলের পুরাতন নিয়ম বিশেষত তাওরাতের প্রথম পঞ্চপুস্তকের সংকলনকাল কমপক্ষে তিন শতাব্দী ধরে
কিন্তু এখানেই সমস্যার অন্ত নয়। সমস্যা বরং ক্রমান্বয়ে জটিল থেকে জটিলতর হয়ে পড়ছে। ১৯৪১ সালে এ. লডস নামক এক গবেষক বিচার বিশ্লেষণ করে দেখান যে, তাওরাতের জেহোভিস্ট ধারার পুস্তকগুলো কমবেশি তিনজন লেখকের রচনা। অনুরূপভাবে, ইলোহিস্ট ধারার পুস্তক রচয়িতার সংখ্যা চারজন, গণনাপুস্তকের লেখকের সংখ্যা ছয়জন এবং সেকেরডোটাল সংস্করণের পুস্তকসমূহ কমবেশি নয়জন লেখকের রচনার সমষ্টি। ফাদার ডি ভক্স-এর মতে, পূর্বোক্তসংখ্যক লেখক ছাড়াও বাইবেলের এই পঞ্চপুস্তকের রচয়িতা হিসেবে আরো আটজন লেখকের সন্ধান পাওয়া গেছে। তদুপরি, সম্প্রতি গবেষণা করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া গেছে যে, তাওরাতের পঞ্চপুস্তকে যেসব বিধি বিধান ও আইনকানুনের উল্লেখ রয়েছে, এই বাইবেল ছাড়াও সেসব আইন বিধানের অস্তিত্ব অন্যত্রও বিদ্যমান। শুধু তাই নয়, তাওরাতের পুরাতন নিয়মে এইসব আইনকানুন প্রণয়নের যে তারিখ উল্লিখিত রয়েছে, যেসব আইনকানুন প্রণীত হয়েছে আরো বহু আগে। অনুরূপভাবে,
“তাওরাতের পঞ্চপুস্তকের কাহিনীসমূহের পটভূমি শুধু ভিন্ন নয়; যে সূত্র থেকে এসব বাহিনী গ্রহণ করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, ওইসব সূত্রও বাইবেলের রচনাকালের বহু আগেকার।”
এইসব গবেষণা থেকে এভাবে “বাইবেল রচনার ক্ষেত্রে ঐতিহ্যের ধারা গঠনের প্রশ্নে বাইবেল লেখকদের আরো বেশি আগ্রহ জাগ্রত করার উপাদান” খুঁজে পাওয়া যেতে পারে। এভাবে যতোই অনুসন্ধান চালানো হয়, দেখা যায়, সমস্যা ক্রমশ জটিলতর হয়ে দাঁড়ায় এবং গবেষকদের পক্ষে তখন “ছেড়ে দে কেঁদে বাঁচি” বলে আর্তনাদ করা ছাড়া উপায় থাকে না।
বাইবেলের এই পুরাতন নিয়মের রচয়িতার সংখ্যা অনেক বেশি বলেই সম্ভবত তাদের বক্তব্যে মিলের চেয়ে গরমিল বেশি। একইবিষয়ে পুনরাবৃত্তিও কম দেখা যায় না। ফাদার ডি ভক্স একের-পর-এক উদাহরণ তুলে ধরে দেখিয়েছেন, কিভাবে ইতিহাসের কাহিনী এলোমলো হয়ে পড়েছে। বিশেষত, মহাপ্লাবনের প্রশ্নে, যোসেফ বা হযরত ইউসুফের চুরির ঘটনায়, মিসরে তার দুঃসাহসিক কার্যাবলীতে এমনকি একই চরিত্রের নামের প্রশ্নেও লেখকদের মতবিরোধ কত তীব্র। শুধু তাই নয়, গুরুত্বপূর্ণ কোনো ঘটনা সম্পর্কে লেখকবর্গের ভিন্ন ভিন্ন বিবরণী প্রদানের আলোকেও বাইবেলের রচনাবলীর মধ্যকার গরমিল প্রকট হয়ে ধরা পড়ে।
মোদ্দাকথা, তাওরাতের বিভিন্ন পুস্তক সন্দেহাতীতভাবে বিভিন্ন ঐতিহ্যভিত্তিক কাহিনীর সমাহার। অবশ্য, এ কথা মানতে হবে যে, লেখকেরা অত্যন্ত দক্ষতার সাথে এসব ঘটনার সমাবেশ ঘটিয়ে গেছেন এবং এসব কাহিনীকে তারা পাশাপাশি সাজিয়ে কখনো-কখনো তাদের মধ্যে সমন্বয় ঘটানোর জন্যে নানা গল্প-কথা টেনে এনেছেন। এ কারণে তারা এসব পুস্তকে অসম্ভব ও অগ্রহণযোগ্য বহুবিষয়ের অবতারণাও করেছেন। আর এতসব কারণেই আধুনিক গবেষকগণ এসবের সূত্র ও উৎস অনুসন্ধানকল্পে নিরপেক্ষ গবেষণা পরিচালনার জন্য এগিয়ে না এসে পারেননি।
তাওরাতের পঞ্চপুস্তকের পাঠ-সংক্রান্ত সমালোচনার ক্ষেত্রে বলা চলে যে, সম্ভবত এই পুস্তকগুলো মানুষের হাতে ধর্মগ্রন্থ সংশোধিত হওয়ার জলজ্যান্ত উদাহরণ। ইহুদীদের ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে লোকমুখে শ্রুত কাহিনী অবলম্বনে এগুলো রচিত হয়েছিল এবং সেই অবস্থায় সেসব রচনার পরবর্তী বংশধরদের নিকট হয়েছিল হস্তান্তরিত। এভাবে খ্রিস্টপূর্ব নবম শতাব্দীর শুরুতে ইহুদীদের ঐতিহ্যগত কাহিনী অবলম্বনে রচিত হয় তাওরাতের জেহোভিস্ট সংস্করণ। সৃষ্টির আদি থেকে বর্ণিত কাহিনী এতে স্থান লাভ করেছেন। মানুষের জন্য বিধাতার যে মহাপরিকল্পনা বিদ্যমান, সেই পরিকল্পনা কার্যকর করার ব্যাপারে ইহুদীদের ভূমিকার গুরুত্ব বর্ণনাই ছিল এসব কাহিনীর মুখ্য উপজীব্য। (ফাদার ডি. ভক্স)
যাহোক, খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে সেকেরডোটাল ভার্সন তথা পুরোহিতদের দ্বারা রচিত কাহিনীর মাধ্যমে তাওরাতের এই পঞ্চপুস্তকের রচনার কাজ সমাপ্ত হয় এবং এই শেষোক্ত রচনায় স্থানে স্থানে সন, তারিখ ও বংশ-তালিকা জুড়ে দিয়ে এই পুস্তককে যতোটা সম্ভব নির্ভুল হিসেবে তুলে ধরার প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়।
