একালে এ ধারণা সম্পূর্ণভাবে পরিত্যক্ত হয়েছে এবং তাওরাত যে হযরত মুসার রচনা নয়, এ বিষয়ে এখন আর কারো কোনো দ্বিমত নেই। এদিকে বাইবেলের নতুন নিয়মে (অর্থাৎ ইঞ্জিলে) পুরাতন নিয়মের, বিশেষত তাওরাতের লেখক হিসেবে হযরত মুসার নাম উল্লেখ করা হয়েছে। রোমিওদের কাছে। লিখিত একপত্রে (১০, ৫) লেবিয় পুস্তকের বরাত দিয়ে পৌল বলেছেন, “মোশি লিখেন, যে ব্যক্তি ব্যবস্থামূলক ধার্মিকতার অনুষ্ঠান করে প্রভৃতি। যোহন তার লিখিত সুসমাচারে (বাইবেল, নতুন নিয়ম, ৫, ৪৬-৪৭) স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেছেন যে, হযরত ঈসা (আঃ) বলেছেন, “কারণ যদি তোমরা মোশিকে বিশ্বাস করিতে, তবে আমাকেও বিশ্বাস করিতে, কেননা, আমারই বিষয়ে তিনি লিখেছেন। কিন্তু তাঁর লেখায় যদি বিশ্বাস না কর, তবে আমার কথায় কিরূপে বিশ্বাস করিবে?” এখানেই বাইবেলের বক্তব্য সংশোধন তথা সম্পাদনার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে, কেননা, লিখার স্থলে এখানে যে গ্রীক শব্দটি (এপিসটিউট) ব্যবহৃত হয়, তা ছিল মূলগ্রন্থে ব্যবহৃত শব্দের অনুরূপ। কিন্তু তার অর্থ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। সুতরাং, সুসমাচার রচয়িতা এখানে যীশুর মুখ দিয়ে হযরত মুসার লেখার সমর্থনে যে বক্তব্য পেশ করেছেন, তা সম্পূর্ণ অশুদ্ধ। পরবর্তী আলোচনা থেকেও এর প্রমাণ পাওয়া যাবে।
এই প্রমাণপঞ্জির জন্য ড. মরিস বুকাইলি জেরুজালেমের বাইবেল স্কুলের প্রধান ফাদার ডি ভক্স-এর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। ১৯৬২ সালে তিনি জেনেসিস বা বাইবেলের পুরাতন নিয়মের আদিপুস্তকের ফরাসী অনুবাদ প্রকাশ করেছেন। এই অনুবাদগ্রন্থের ভূমিকায় তিনি পেন্টাটেক বা পঞ্চপুস্তকের এক সাধারণ পরিচিতি পেশ করেন। তাঁর এই ভূমিকা-পরিচিতির বক্তব্য বিশেষভাবে যুক্তিসমৃদ্ধ। ফাদার ডি. ভক্স পাঠকদের স্মরণ করিয়ে দেন যে, “যীশু এবং তাঁর প্রেরিতগণ (সহচর বা সাহাবা) যে ইহুদী-ঐতিহ্য অনুসরণ করেছিলেন বলে বলা হত, সে বক্তব্য মধ্যযুগের শেষপর্যায় পর্যন্ত নির্বিবাদে মেনে চলা হয়েছে। দ্বাদশ শতাব্দীতে শুধু একজন ব্যক্তি এই বক্তব্যের প্রতিবাদ জানান। তিনি হলেন, এ্যাবেনেজরা। ষোড়শ শতাব্দীতে এসে কালস্ট্যাডট প্রথম প্রশ্ন উত্থাপন করেন যে, “দ্বিতীয় বিবরণীতে হযরত মুসার মৃত্যুর যে বিবরণ লিপিবদ্ধ রয়েছে (৩৪, ৫-১২), তা হযরত মুসার নিজের পক্ষে রচনা করা আদৌ সম্ভব নয়। এরপর লেখক অন্যান্য সমালোচকের উদ্ধৃতি তুলে ধরে বলেছেন, ওইসব সমালোচক স্বীকার না করে পারেননি যে, তাওরাতের পঞ্চপুস্তকের অন্তত একাংশ হযরত মুসার রচনা নয়। এ প্রসঙ্গে আর একজন প্রাচীন লেখকের বক্তব্য উল্লেখ না করে পারা যায় না। তিনি ছিলেন একজন ধর্মযাজক, নাম রিচার্ড সাইমন। ১৬৭৮ সালে তিনি ‘ক্রিটিক্যাল হিস্ট্রি অব দা ওল্ড টেস্টামেন্ট নামে এক পুস্তক প্রকাশ করে দেখিয়েছেন যে, তাওরাত বা পুরাতন নিয়মের এই পঞ্চপুস্তকের কোথায় কোথায় ঐতিহাসিক তথ্যের বিভ্রান্তিজনিত সমস্যা বিদ্যমান; কোনো কোনো পরিচ্ছেদ পুনরাবৃত্তির দোষে দূষণীয়; কোনো কোনো কাহিনীতে রয়েছে গরমিল; এবং কোনো কোনো রচনায় রয়েছে ভাষাগত স্টাইলের ভিন্নতা। তদানীন্তন সময়ের খ্যাতিমান বাগ্মী রিচার্ড সাইমনের এই পুস্তকখানি প্রকাশের সাথে সাথে চারিদিকে তুমুল হৈচৈ পড়ে যায়। তবে হৈচৈ যতো তুমুল হোক, অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত রিচার্ড সাইমনের এই পুস্তকে প্রদত্ত যুক্তিসমূহ কিন্তু খুব কমই বাইবেলের ইতিহাস পুস্তকগুলোতে স্থান লাভ করে নিতে সমর্থ হয়েছিল। উল্লেখ্য যে, সেকালে তাওরাতের প্রাচীনত্বের সূত্র টেনে প্রায়শই “হযরত মুসা লিখে গেছেন” বলে ধুয়া ওঠানো হত।
মূলত, যে কথার সত্যতা স্বয়ং যীশুখ্রিস্ট সাব্যস্ত করে গেছেন বলে বাইবেলের নতুন নিয়মে (ইঞ্জিল) উল্লিখিত রয়েছে, সে সম্পর্কে প্রশ্ন উত্থাপন যে কতোটা কঠিন তা সহজেই অনুমেয়। তবুও এই প্রশ্ন উত্থাপনের ব্যাপারে অন্তত একজনকে পাওয়া যাচ্ছে। তিনি হচ্ছেন পঞ্চদশ লুইয়ের চিকিৎসক জিন অস্ট্রক তিনিই প্রথম এ বিষয়ে তার সিদ্ধান্তমূলক যুক্তি পেশ করে গেছেন।
১৭৫৩ সালে ‘কনজেকচার অন দা অরিজিন্যাল রাইটিংস হুইচ ইট এপিয়ার্স মোজেস ইউজড টু কমপোজ দি বুক অব জেনেসিস’ নামক এক আলোচনায় তিনি তাওরাতের পুস্তকসমূহের একাধিক উৎসের ওপর গুরুত্বসহকারে প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন। সম্ভবত, এ বিষয়টি আরো অনেকের নজরে পড়ে থাকবে। কিন্তু, জিন অস্ট্রকই প্রথম তাঁর এই পর্যবেক্ষণ সাধারণ্যে প্রকাশের সাহস দেখিয়েছিলেন। এরমধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণটি ছিল এরূপ : বাইবেলের পুরাতন নিয়মের আদিপুস্তকে দুটি আলাদা পাঠ বা রচনা পাশাপাশি স্থান লাভ করেছে। একটিতে আল্লাহকে উল্লেখ করা হয়েছে ‘জোহোভা’ বলে; অপরটিতে ‘ইলোহিম’ বলে। অর্থাৎ এর দ্বারাই প্রমাণ হয় যে, জেনেসিস বা আদিপুস্তক অন্তত দুটি ভিন্ন রচনার সমাহার। এ্যাইহর্ন নামক অপর এক লেখকও তাঁর এক রচনায় (১৭৮০-১৭৮৩) তাওরাতের অপর চারটি পুস্তকের রচনাতেও এ ধরনের ভিন্নতা দেখেছেন বলে উল্লেখ করেন। এরপর ইলজেন (১৭৯৮) নামক অপর এক লেখক তার এক পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেন যে, অস্ট্রক বাইবেলের যে পাঠটিকে আলাদা বলে উল্লেখ করে গেছেন, সেখানে। গড-কে বলা হয়েছে ‘ইলোহিম’–সেই পাঠটিও দুটি আলাদা পাঠের সমাহার। মূলত, তাওরাতের পঞ্চপুস্তক শাব্দিক অর্থেই বিচ্ছিন্ন রচনার সমাহার ছাড়া অন্য কিছু নয়।
