এভাবে, আদি থেকে খ্রিস্টধর্মের আবির্ভাব পর্যন্ত বাইবেল (পুরাতন নিয়ম) ইহুদী জাতির ধর্মগ্রন্থ হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। খ্রিস্টপূর্ব দশম শতাব্দী থেকে খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতাব্দী পর্যন্ত বাইবেলের (পুরাতন নিয়মের) পুস্তকসমূহ বহুবার লিখন ও সংশোধনের পর চূড়ান্ত রূপ লাভ করেছে। বলা আবশ্যক যে, তওরাত তথা বাইবেল (পুরাতন নিয়ম) রচনার এই ইতিহাস কোনোক্রমেই কারো ব্যক্তিগত অভিমতের বিবরণ নয়। বাইবেলের ইতিহাস-সংক্রান্ত এই জরিপ গবেষণায় প্রয়োজনীয় তথ্যাদি গ্রহণ করা হয়েছে সলকরের ডমিনিক্যান ফ্যাকালটির অধ্যাপক জে. পি. সানড্রোজ প্রণীত এনসাইক্লোপিডিয়ার ‘বাইবেল’ অধ্যায় থেকে (প্যারিস, ১৯৪৭ সংস্করণ, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৪৬-২৫৩ দ্রষ্টব্য)। বাইবেলের পুরাতন নিয়ম (ওল্ড টেস্টামেন্ট) প্রকৃতপক্ষে যে কি ধরনের গ্রন্থ, তা বুঝতে হলে প্রাজ্ঞ ও অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞবৃন্দের গবেষণার দ্বারা আধুনিক যুগে সঠিকভাবে প্রমাণিত ও প্রতিষ্ঠিত এই তথ্যাবলীর সহায়তা নিঃসন্দেহে প্রয়োজন।
অনস্বীকার্য যে, বাইবেলের (পুরাতন নিয়মের) এইসব গ্রন্থে বিভিন্ন পয়গম্বর কর্তৃক প্রাপ্ত ওহী বা প্রত্যাদেশের সংমিশ্রণ অবশ্যই রয়েছে। কিন্তু, তারচেয়েও বড় কথা, এইসব প্রত্যাদেশপ্রাপ্ত বাণীর ভিত্তিতে তখনকার লেখকেরা নিজের মনের মাধুরী মিশিয়ে যেসব রচনা উপহার দিয়েছেন, সেগুলো এখন বাইবেলের পুরাতন নিয়ম (ওল্ড টেস্টামেন্ট) বা তাওরাত নামে চলছে। তখনকার এই লেখকেরা বিভিন্ন নবীর প্রত্যাদেশপ্রাপ্ত বাণীর পরিবর্তন তো করেছেনই, অধিকন্তু, তাঁরা তাঁদের নিজ নিজ স্বার্থে নিজস্ব যুগের এবং পরিবেশের প্রয়োজনে বর্ণিত বিষয়বস্তুর ব্যাপক অদল-বদল এমনকি সংযোজন ঘটাতেও বিন্দুমাত্র কুষ্ঠাবোধ করেননি।
কিন্তু, এসব নিরপেক্ষ ও গবেষণালব্ধ তথ্যের সাথে যদি অধুনা জনসাধারণের জন্য সম্প্রচারিত এবং বাইবেলের ভূমিকায় পরিবেশিত বিভিন্ন বক্তব্যের তুলনামূলক বিচার করা হয়, তা হলে কি দেখতে পাই? দেখতে পাই সম্পূর্ণ ভিন্ন এক চিত্র ও বক্তব্য। দেখা যাচ্ছে, বাইবেল রচনার এই ইতিহাস সম্পর্কে আধুনিক বাইবেলের ভূমিকা-লেখক কোনো কথা বলছেন না। বরং তিনি এমনসব দ্ব্যর্থবোধক বক্তব্য পেশ করছেন যা সহজেই পাঠকদের বিভ্রান্ত করতে পারে। এছাড়াও, ভূমিকা-লেখক সঠিক তথ্য ও সত্যকে এমনভাবে ধামাচাপা দিয়ে অসম্পূর্ণভাবে এমনসব ভুল তথ্য তুলে ধরছেন যে, সেসব পাঠ করলে মনে হবে যেন, এরচেয়ে বড় সত্য আর কোনোটিই হতে পারে না।
শুধু একটি বা দুটি বাইবেলে নয়, বিভিন্নসূত্রে প্রকাশিত বহু বাইবেলেই এই ধরনের বিভ্রান্তির ভূমিকা ও পরিচিতি সন্নিবেশিত রয়েছে। বাইবেলের অন্তর্ভুক্ত প্রায় সব পুস্তকই বেশ কয়েকবার করে সংশোধন ও সম্পাদনা করে প্রকাশ করা হয়েছে (উদাহরণ, পেন্টাটেক বা তাওরাতের পঞ্চপুস্তক) এবং প্রতিবারই বর্জিত বিষয় সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, ওইসব বাড়তি বিষয় খুব সম্ভব পরবর্তী সময়ের সংযোজন’। বাইবেল-সংক্রান্ত বিভিন্ন পুস্তকে আরো দেখা যাবে, গুরুত্বহীন কোনো বিষয় কিংবা অধ্যায় নিয়ে নানাকথা বলা হচ্ছে, কিন্তু যেসব সমস্যাসঙ্কুল বিষয় বা অধ্যায়ের জন্য বিস্তৃত আলোচনা ও ব্যাখ্যা প্রয়োজন, সেগুলো সম্পর্কে পালন করা হচ্ছে সম্পূর্ণ নীরবতা। আরো পরিতাপের বিষয়, এই ধরনের ভুল তথ্য ও অসত্য ভূমিকা ও পরিচিতি-সম্বলিত বাইবেল এখনো জনসাধারণের জন্য প্রচুর বাজারে ছাড়া হচ্ছে।
১৭. তওরাত-এর পঞ্চপুস্তক
‘তওরাত’ শব্দটি সেমেটিক। গ্রীক ভাষায় ‘তাওরাত’ বলতে যা বোঝায় তা ই ইংরেজিতে এসে হয়েছে পেন্টাটেক। এই শব্দটি মূলত গ্রীক। এর দ্বারা তাওরাতের প্রথম পাঁচটি পুস্তককে বোঝায়, যথা–(বাংলা বাইবেল অনুসারে) আদিপুস্তক, যাত্রাপুস্তক, লেবিয় পুস্তক, গণনাপুস্তক এবং দ্বিতীয় বিবরণ। উনচল্লিশটি খণ্ডে সংকলিত বাইবেলের পুরাতন নিয়মের প্রথম পাঁচ খণ্ডে এই পুস্তক পাঁচটি স্থান পেয়েছে।
বিশ্বসৃষ্টির আদি থেকে শুরু করে মিসরে ইহুদীদের নির্বাসনশেষে প্রতিভূমি কেনানে প্রত্যাবর্তন পর্যন্ত আরো সোজাকথায়, হযরত মুসার (আঃ) মৃত্যুপর্যন্ত যাবতীয় ঘটনার বিবরণ স্থান পেয়েছে এসব পুস্তকে। এসব বিবরণে ইহুদীদের সামাজিক ও ধর্মীয় রীতিনীতি ও নিয়মকানুন তুলে ধরা হয়েছে। এজন্য, এই গ্রন্থের নামকরণ হয়েছে তাওরাত বা আইনগ্রন্থ।
ইহুদী ও খ্রিস্টানরা বহু শতাব্দী যাবত বিশ্বাস করে আসছেন যে, তাওরাতের লেখক হচ্ছেন স্বয়ং হযরত মুসা (আঃ)। এই বিশ্বাসের পেছনে সম্ভবত তাওরাতের সেইসব বাণী কাজ করছিল, যেসব বাণীতে হযরত মুসার (আঃ) নিজ হাতে লিখার প্রসঙ্গ বর্ণনা করা হয়েছে। যেমন (যাত্রাপুস্তক ১৭, ১৪) : “এই কথা (আমালেকের পরাজয়) স্মরণার্থে পুস্তক লিখ।” ইহুদীদের মিসর থেকে যাত্রা প্রসঙ্গে অন্য স্থানে বলা হয়েছে : “মোশি (হযরত মুসা) সেই উত্তরণস্থানগুলোর বিবরণ লিখলেন।” (গণনাপুস্তক : ৩৩, ২) এবং সর্বশেষ : “পরে মোশি এ ব্যবস্থা লিখলেন।” (দ্বিতীয় বিবরণ ৩১, ৯) হযরত মুসা যে তাওরাতের এই পাঁচটি খণ্ড রচনা করেছিলেন, খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীর পূর্বপর্যন্ত সেই ধারণা সঠিক বলে প্রমাণ করার প্রয়াস অব্যাহত ছিল। ফ্লাভিয়াস জোসেফাস এবং আলেকজান্দ্রিয়ার ফিলো ছিলেন এই ধারণার সমর্থক।
