এর কিছুকাল পরে, সম্ভবত খ্রিস্টপূর্ব দশম শতাব্দীতে, ‘জেহোভিস্ট সংস্করণ’ নামে পরিচিত বাইবেলের পুরাতন নিয়মে পেন্টাটেক অধ্যায়ের মূল রচনা তৈরি হয়। এই নামকরণের জন্য যে, এইসব রচনায় স্রষ্টাকে বলা হত ‘জোহাভা’। এই মূল রচনাই ছিল হযরত মুসার কিতাব বলে পরিচিত তোরাহ্ বা তাওরাতের বুনিয়াদ। পরবর্তীকালে এর সাথে ‘এলোহিস্ট’ পাঠ এবং ‘সেকেরডোটাল’ বিবরণী সংযোজিত হয়। এসব পাঠের স্রষ্টাকে বলা হতো ‘এলোহিম’। প্রাথমিক পর্যায়ে জেহোভিস্ট বাইবেলের মূল রচনায় বিশ্বের উৎপত্তি থেকে হযরত ইয়াকুবের (জ্যাকব) মৃত্যু পর্যন্ত সময়ের বিবরণী স্থান লাভ করেছিল এই মূল রচনাসমূহ সংগৃহীত হয়েছিল দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য জুদাহ্ থেকে।
খ্রীস্টপূর্ব নবম শতাব্দীর শেষভাগ ও অষ্টম শতাব্দীর মধ্যভাগ ছিল হযরত ইলিয়াস ও এলিশার নবুয়তের আমল। এই উভয় নবীর কিতাবও এখন আমরা পাচ্ছি। তখনই উপযুক্ত পোটেক বা পঞ্চপুস্তকের বিবরণীর এলোহিস্ট পাঠ রচিত হয়। এই রচনা অবশ্য জেহোভিস্ট রচনার চেয়ে সংক্ষিপ্ত। কেননা, এলোহিস্ট রচনায় শুধু হযরত ইবরাহীম, ইয়াকুব ও হযরত ইউসুফের বিবরণী স্থান লাভ করেছিল। বাইবেলের পুরাতন নিয়মের যশুয়া ও জাজেস (বিচারকগণ) পুস্তকখানিও এই সময়ের রচনা।
খ্রীস্টপূর্ব অষ্টম শতাব্দীতে এমনসব নবীর আবির্ভাব ঘটে, যারা নিজেরাই ছিলেন লেখক। এ ধরনের লেখক-নবীদের মধ্যে আমোষ ও হোশেয় এবং জুদাহ-র নবী মিখাহর নাম উল্লেখযোগ্য। খ্রীস্টপূর্ব ৭২১ সালে সামারিয়ার পতনের মধ্যদিয়ে ইহুদীদের রাজত্বের পরিসমাপ্তি ঘটে। এরফলে ধর্মীয় উত্তরাধিকার ন্যস্ত হয় জুদাহ্ রাজ্যের উপর। তখনই পুরাতন নিয়মের প্রবাদসমূহ একক-পুস্তক হিসেবে সংকলিত হয়ে জেহোভিস্ট ও এলোহিস্ট উভয় সংস্করণের পেন্টাটেক বা পঞ্চপুস্তকের সাথে যুক্ত হয়। এভাবে তাওরাত হয় সংকলিত। তখনই ডেটেরোনমি বা গণনা-পুস্তক রচিত হয়। খ্রীষ্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে জোশিয়ার রাজত্বকালে আবির্ভাব ঘটে জিরমিয় নবীর। কিন্তু তার বাণীসমূহ পুস্তকাকারে সম্পূর্ণভাবে সংকলিত হতে সময় যায় প্রায় শত বছর।
খ্রিস্টপূর্ব ৫৯৮ সালে ইহুদীদের প্রথম নির্বাসনের আগেই পুরাতন নিয়মের তিনটি পুস্তক যথা সনিয়, নহুম ও হকুক সংকলিত হয়। এজেকেল নবীর সময়কালে সংঘটিত হয় ইহুদীদের প্রথম নির্বাসন। খ্রিস্টপূর্ব ৫৮৭ সালে জেরুজালেমের পতনে ইহুদীদের দ্বিতীয় নির্বাসনের কাল শুরু হয় এবং এই নির্বাসন অব্যাহত থাকে খ্রিস্টপূর্ব ৫৩৮ সাল পর্যন্ত।
এজেকেল শুধু ইহুদীদের নির্বাসনকালের নবী ছিলেন না; তিনি ছিলেন নির্বাসনকালের শেষ উল্লেখযোগ্য পয়গম্বরও। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পূর্বে তাঁর কিতাব বর্তমান আকারে সংকলিত হতে পারেনি। যেসব লিপিকার-পুরোহিত তাঁর ‘আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকার লাভ করেছিলেন, তাঁদের হাতেই তার বাণীর সংকলন সমাপ্ত হয়েছিল। এই লিপিকার-পুরোহিতরাই বাইবেলের আদি-পুস্তকের তৃতীয় সংস্করণ রচনার কাজে হাত দেন। এই সংস্করণ ‘সেকেরডোটাল’ নামে পরিচিত। এতে সৃষ্টির সূচনা থেকে হযরত ইয়াকুবের মৃত্যু পর্যন্ত বিবরণী স্থান পেয়েছে। এভাবে তাওরাতের জেহোভিস্ট ও এলোহিস্ট সংস্করণের মাঝখানে কেন্দ্রীয় যোগসূত্র হিসেবে স্থান লাভ করে এই তৃতীয় সংস্করণ। পরবর্তীকালে দেখা যায়, মোটামুটিভাবে দু’ থেকে চার শতাব্দী আগেকার পাঠের সাথে এই তৃতীয় সংস্করণের পাঠ যুক্ত হওয়ায় কি ধরনের জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। যাহোক, পুরাতন নিয়মের বিলাপ পুস্তক তখনই প্রকাশিত হয়।
খ্রীস্টপূর্ব ৫৩৮ সালে সাইরাসের ঘোষণায় ইহুদীদের ব্যাবিলন নির্বাসনের পরিসমাপ্তি ঘটে। এরপর তারা জেরুজালেমে ফিরে আসেন এবং সেখানকার উপাসনালয় পুনঃনির্মাণ করেন। এরপর বিভিন্ন পয়গম্বরের প্রচারকার্য চলতে থাকে। এসব নবীর বাণী সংকলন ক্রমান্বয়ে হগয়, সখরিয়, ইশাইয়ার তৃতীয় পুস্তক, মালাখি, দানিয়েল এবং বারোখ-পুস্তক হিসেবে পরিচিতি লাভ করে (সর্বশেষ পুস্তকটি গ্রীক ভাষায় রচিত)।
ইহুদীদের নির্বাসনের পরবর্তী পর্যায়ে রচিত হয় ‘বুকস অব উইজডম’। প্রবাদ-সংক্রান্ত পুস্তকখানি নিঃসন্দেহে খ্রীস্টপূর্ব ৪০০ সালের দিককার রচনা। ইয়োব পুস্তকের রচনাকাল খ্রিস্টপূর্ব পাঁচ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়। ইকলেসিয়াস্টিস বা কোহেলেথ রচিত হয় খ্রীস্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীতে। পরমগীত ও বংশাবলী প্রথম ও দ্বিতীয় ইষরা ও নহিমিয় পুস্তকগুলোও তখনকারই রচনা। ইলেসিয়াস্টিকাস বা সিরাহ প্রকাশিত হয় খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীতে। হিতোপদেশ পুস্তক ও মাকাবিস প্রথম ও দ্বিতীয় পুস্তক খ্রিস্টের জন্মের এক শতাব্দীকাল আগেকার রচনা। রুথ, ইস্টার ও জোনা (ইউনুস নবী) পুস্তকের সময়কাল নির্ণয় করা কঠিন। টবিট ও জুডিথ পুস্তকদ্বয় সম্পর্কেও একইকথা বলা চলে। অবশ্য, ইতোপূর্বে যেসব পুস্তকের রচনা ও সংকলনের সময়কাল দেয়া হয়েছে, ধরেই নিতে হবে যে, তখনকার পরেও এইসব পুস্তকে নানা বিষয় ও রচনা সংযোজিত হয়েছে। কেননা, খ্রিস্টজন্মের মাত্র এক শতাব্দীকাল আগে বাইবেল (পুরাতন নিয়ম) রচনার রীতিনীতি ও নিয়মকানুন ঘোষণা করা হয়। কিন্তু, এর অনেক নিয়ম-রীতি চূড়ান্ত হতে হতে খ্রিস্টজন্মের পরেও শতাব্দীকাল চলে যায়।
