প্রকৃতপক্ষে, বাইবেলের পুরাতন নিয়মের গোটাটাই এমনিভাবে প্রচলিত লোক-ঐতিহ্যের ভিত্তিতে রচিত হয়েছিল। সুতরাং, যে পদ্ধতিতে এটি প্রণীত হয়েছে তাতে সময় যদি অন্যরকম হত, আর এসব ঘটনাস্থল যদি হত ভিন্ন, তাহলে আদিযুগের আর পাঁচটি সাহিত্যের মতোই এই বাইবেলও তুলনামূলকভাবে সম্পূর্ণ আলাদা এক সৃজনশীল সাহিত্যকর্মে পরিণত হতে পারতো এবং তা যদি হত, তাহলে বিস্মিত হওয়ার কিছু থাকতো না।
উদাহরণ হিসেবে রাজ-রাজড়াদের আমলে গড়ে ওঠা ফরাসী সাহিত্যের কথা বলা যেতে পারে। অতীতের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলী তখন চালু ছিল ঐতিহ্যভিত্তিক লোককাহিনীকে সম্বল করে। অতীতের যুদ্ধ-কাহিনী (এরমধ্যে কোনো কোনো যুদ্ধ আবার খ্রিস্টধর্মের নিরাপত্তার স্বার্থে সংঘটিত); নানাধরনের উত্তেজনাপূর্ণ ঘটনা, ফরাসী বীরদের বীরত্ব। সবকিছু শতাব্দীকাল পরেও রাজকবি, কাহিনীকার ও বিভিন্ন ধারার লেখকদের উদ্বুদ্ধ করেছিল সৃষ্টিধর্মী কিছু রচনা করতে। এভাবে একাদশ শতাব্দীর পর থেকে সত্যিকার ঘটনার সঙ্গে নানা উপকথা সংমিশ্রিত হয়ে লোক-গাথাসমূহ ফরাসী-সাহিত্যের অঙ্গনে নতুনভাবে উপস্থাপিত হতে শুরু হয়েছিল আর এভাবেই গড়ে উঠেছিল ফরাসী সাহিত্যের মহাকাব্যের ধারা। এরমধ্যে সুবিখ্যাত মহাকাব্যটি হচ্ছে ‘সং অব রোল্যান্ড। রোল্যান্ড ছিলেন সম্রাট শার্লিম্যানের সেনাপতি। স্পেন অভিযানশেষে দেশে ফেরার পথে তিনি যেসব ঘটনার সম্মুখীন হয়েছিলেন এবং তাতে যে দুঃসাহসিক অস্ত্রচালনার কৌশল ও বীরত্ব প্রদর্শন করে আত্মত্যাগের যে দৃষ্টান্ত তিনি স্থাপন করেছিলেন, তার উপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছিল এই মহাকাব্যটি।
তবে, শুধু রোল্যান্ডের আত্মত্যাগ এই মহাকাব্যের একমাত্র উপজীব্য ছিল না। তারসঙ্গে সংমিশ্রিত হয়েছিল নানা গল্পকথা, বহু উপ-কাহিনী। রোল্যান্ডের আত্মত্যাগের ঘটনা ঘটেছিল ৭৭৮ সালের ১৫ আগস্ট। বাস্তবে পার্বত্য এলাকার বাস্ক সম্প্রদায়ের লোকেরা রোল্যান্ডের ফেরার পথে তার উপরে হামলা চালিয়েছিল। সুতরাং, এই মহাকাব্যটি শুধু উপকথার বর্ণনা নয়, এর ঐতিহাসিক ভিত্তিও ছিল। কিন্তু তবুও কোনো ঐতিহাসিক এই মহাকাব্যের ঘটনাবলীকে সম্পূর্ণভাবে ইতিহাস হিসেবে গ্রহণ করতে রাজি হবেন না।
এ ধরনের একটি ধর্মনিরপেক্ষ সাহিত্য যেভাবে তৈরি হয়েছে, তারসঙ্গে বাইবেল রচনার হুবহু তুলনা চলে। এ কথা বলার অর্থ এই নয় যে, অনেকে যেভাবে পদ্ধতিগত-বিচারে স্রষ্টার অস্তিত্ব অস্বীকার করতে চান, আমরাও সেভাবে নানা উপ-কাহিনীর সংকলন হিসেবে ধরে নিয়ে বাইবেলের সব বক্তব্যকে হেয় প্রতিপন্ন করতে চাইছি। না, তা নয়। বিশ্বসৃষ্টির বাস্তবতা, স্রষ্টা কর্তৃক হযরত মুসার উপরে টেন-কম্যান্ডমেন্টস বা দশধারার বিধান অবতীর্ণ করার ঘটনা আমরা বিশ্বাস করি এবং আমরা এও বিশ্বাস করি যে, হযরত সোলায়মানের আমলে যেমনটি হয়েছিল মানবিক বিষয়ে স্রষ্টার মধ্যস্থতা করার মত ঘটনা তাও অসম্ভব নয়। কিন্তু এই বিশ্বাস সত্ত্বেও আমরা এ কথা না বলে পারছি না যে, বাইবেলের পুরাতন নিয়ম আমাদের যা উপহার দিচ্ছে, তা ঘটনার সারার্থ মাত্র; পুরো সত্য ঘটনা নয়। কেনান একইসঙ্গে নানা কল্পকাহিনীর যে বিশদ বর্ণনা বাইবেলে স্থান পেয়েছে, সেসবের কঠোর সমালোচনা না করে উপায় নেই। বস্তুত, লোকমুখে প্রচলিত ঐতিহ্যগাথার ভিত্তিতে বাইবেল যাঁরা রচনা করেছিলেন, তারা মূলবাণীর সঙ্গে নিজেদের কল্পনা ও মানবীয় উপাদান এতো অধিকমাত্রায় সংযোজন করে গেছেন যে, সেক্ষেত্রে সমালোচনা অপ্রতিরোধ্য হতে বাধ্য।
১৬. পুরাতন নিয়মের পুস্তকাবলী
বাইবেলের পুরাতন নিয়ম বিভিন্ন পুস্তকের সংকলন। এসব পুস্তক নানা আয়তনের এবং এসবের লেখকের সংখ্যাও কম নয়। লোকের মুখে মুখে প্রচলিত কাহিনী অবলম্বনে ওইসব লেখক নয়শত বছরেরও বেশি সময় ধরে নানা ভাষায় ওই পুস্তকগুলো রচনা করে গেছেন। কখনো কোনো ঘটনার সঙ্গে সঙ্গতি বিধানের জন্য অথবা জরুরি কোনো প্রয়োজনে বহুবার এসব রচনা সংশোধিত ও রূপান্তরিত হয়েছে এমনও দেখা গেছে যে, প্রথমবারের সংশোধন ও রূপায়ণের সময়কালের সাথে দ্বিতীয়বারের সংশোধন ও রূপান্তরের সময়কালের ব্যবধান ছিল বিরাট।
খুব সম্ভব খ্রিস্টপূর্ব একাদশ শতাব্দীতে ইহুদীদের রাজত্বের সূচনায় বাইবেলের পুরাতন নিয়মের ওইসব রচনা বিপুল পরিমাণে রচিত হতে শুরু করে। তখন রাজকীয় পরিবারের সদস্যদের মধ্যে একদল লিপিকারের আবির্ভাব ঘটেছিল। এঁরা সবাই ছিলেন উচ্চশিক্ষিত এবং শুধুমাত্র লেখা নকলের মধ্যেই এঁদের ভূমিকা সীমাবদ্ধ ছিল না। ইতিহাসে বাইবেলের যে অসম্পূর্ণ রচনার কথা উল্লেখ রয়েছি, সম্ভবত তা এই সময়কার। তখন বিশেষ কারণে এসব রচনা লিপিবদ্ধ করার প্রয়োজন দেখা দেয়। কিছুসংখ্যক সঙ্গীতের কথা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। এদিকে হযরত ইয়াকুব ও হযরত মুসার প্রাপ্ত প্রত্যাদেশসমূহ এবং টেন-কম্যান্ডমেন্টস ছাড়াও সাধারণের জন্য আইনবিষয়ক বাণীসমূহ লিপিবদ্ধ করার প্রয়োজন ছিল। কেননা, রাজকীয় আইন প্রণয়নের আগে এসব বাণী ধর্মীয় ঐতিহ্য গড়ে তুলতে সহায়তা করেছিল যথেষ্ট। এভাবে নানাস্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা নানাধরনের বিষয় ও বাণী-সম্বলিত রচনা নিয়েই গড়ে উঠেছিল বাইবেলের পুরাতন নিয়মের মূল গ্রন্থাংশ।
