সর্পদংশনে গর্ভপাত ঘটে যেতে পারে (এমনকি অন্ধও হতে পারে) এ ধরনের বক্তব্য রয়েছে বুখারীর সৃষ্টির সূচনা অধ্যায়ে চতুর্থ খণ্ডে (অধ্যায় ১৩ ও ১৪, পৃষ্ঠা ৩৩০ ও ৩৩৪)।
মহিলাদের ঋতুস্রাবকালীন ভিন্নধরনের রক্তপাত : ‘আল-বুখারীর হায়েজ অধ্যায়ে চতুর্থ খণ্ড, ষষ্ঠ অংশ, ৪৯০ ও ৪৯৫ পৃষ্ঠায় দুই ঋতুস্রাবের মধ্যবর্তী সময়ে (অধ্যায় ২১ ও ২৮) রক্তপাত সম্পর্কে দুটি হাদীস রয়েছে। এতে দুজন মহিলার বিবরণ রয়েছে। একজনের ক্ষেত্রে এই রোগের লক্ষণ (বর্ণনা বিশদ নয়) দেখা দিয়েছিল। তার সম্পর্কে বলা হয়েছে, তার ওই রক্ত এসেছে রক্তবহা নাড়ী থেকে। অন্য মহিলার রোগ-লক্ষণ ছিল, সাতবছর যাবত তার দুই ঋতুস্রাবের মধ্যবর্তী সময়ে রক্তপাত হত। সেখানেও কারণ হিসেবে একই রক্তবহা নারীর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বলা যেতে পারে, এই রক্তপাতের কারণ সম্পর্কে সেকালে এই ধারণাই পোষণ করা হত। যাহোক, রোগ-লক্ষণ নির্ণয়ে এই ধরনের বক্তব্যের পেছনে যুক্তি কি সে সম্পর্কে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক। সবচেয়ে বড় কথা, এই ধরনের বক্তব্য আদৌ সঠিক নয়।
রোগব্যাধি, সংক্রামক নয় : আল-বুখারীতে এ বিষয়ে বেশ কয়েকটি স্থানে আলোচনা করা হয়েছে (অধ্যায় ১৯, ২৫, ৩০, ৩১, ৫৩ ও ৫৪; ৭ম খণ্ড, ৭৬ নং অংশ–কিতাবুত্তিব)। বলা হয়েছে কুষ্ঠ (পৃঃ ৪০৮), প্লেগ (৪১৮ ও ৪২২), উটের পাঁচড়া (পৃঃ ৪৪৭) সংক্রামক ব্যাধি নয়। এছাড়াও, এইসব হাদীসে সংক্রামক ব্যাধি সম্পর্কে সাধারণ আলোচনাও স্থান পেয়েছে। উল্লেখ্য যে, এরই পাশাপাশি এমন হাদীসও রয়েছে, যেখানে সম্পূর্ণ বিপরীত বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে : যে স্থানে প্লেগ দেখা দিয়েছে, সেখানে যেন কেউ না যায়; এবং কেউ যেন কুষ্ঠরোগীর সংস্পর্শে না আসে।
এসব আলোচনা থেকে সম্ভাব্য এই সিদ্ধান্তই গ্রহণ করা চলে যে, হাদীসগ্রন্থসমূহে এমন হাদীসও বিদ্যমান, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিতে যেসব গ্রহণযোগ্য নয়। এদিকে এসব হাদীস আদৌ সহীহ বা বিশুদ্ধ কিনা, তা নিয়েও সন্দেহ রয়ে গেছে। তবুও আমরা এসব হাদীস নিয়ে আলোচনা করছি, শুধু একটি উদ্দেশ্যে। আর তা হল, কোরআনের আয়াতের সাথে এসব হাদীসের তুলনামূলক বিচার। আমরা দেখেছি, কোরআনে বিজ্ঞান-সংক্রান্ত এমন একটি আয়াতও নেই–যা বৈজ্ঞানিক বিচারে ভুল। বলা আবশ্যক যে, আমাদের আলোচনার জন্য এই বিষয়টিই সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ।
আলোচনার সুবিধার জন্য মনে রাখা দরকার, মোহাম্মদের (দঃ) মৃত্যুর পর তার নিকট থেকে প্রাপ্ত শিক্ষার ধারা দু’টি পর্যায়ে বিভক্ত হয়ে পড়ে :
প্রথমত, বিপুলসংখ্যক ইমানদার ছিলেন কোরআনের হাফেজ। মোহাম্মদের (দঃ) মতই তাঁরা বহু বহুবার এই কোরআন সম্পূর্ণভাবে হেজ-খতম দিয়েছিলেন। তাছাড়া, কোরআন লিখিতাকারেও ছিল সংরক্ষিত। এমনকি হিজরতের আগে যতটুকু কোরআন নাজিল হয়েছিল, তাও সম্পূর্ণভাবে লিখিতাকারে সংরক্ষণ করা হয়েছিল।
হিজরতের ঘটনা সংঘটিত হয় মোহাম্মদের (দঃ) মৃত্যুর দশ বছর আগে ৬২২ সালে।
দ্বিতীয়ত, মোহাম্মদের (দঃ) একান্ত ঘনিষ্ঠজন, সাহাবী-সঙ্গীরা তো বটেই, বহু ঈমানদারও তাঁর বাণীর ও কার্যাবলীর প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী ছিলেন। তাঁরা কোরআন ছাড়াও মোহাম্মদের (দঃ) ওইসব বাণী ও কার্যাবলীর মধ্যে শরা শরীয়তের বিধি-বিধান ও জায়েজ-না-জায়েজের প্রশ্নের জবাব খুঁজে নিতেন।
এই পরিস্থিতিতে মোহাম্মদের (দঃ) মৃত্যুর কয়েক বছরের মধ্যে তাঁর রেখে যাওয়া এই দুই ধরনের শিক্ষাধারা-সম্বলিত বিষয়গুলো সংকলিত হওয়ার ব্যবস্থা গৃহীত হয়। হাদীস-সংক্রান্ত প্রথম সংকলন প্রকাশ পায় মোটামুটিভাবে হিজরতের চল্লিশ বছর পর। পক্ষান্তরে, কোরআন সংকলিত হয় আরো অনেক আগে, প্রথম খলিফা আবুবকরের (রাঃ) আমলে, বিশেষ করে তৃতীয় খলিফা ওসমানের (রাঃ)-এর সময়। এই ওসমানের (রাঃ) আমলেই অর্থাৎ মোহাম্মদের (দঃ) মৃত্যুর বারো থেকে চব্বিশ বছরের মধ্যেই কোরআনের চূড়ান্ত সংকলন কিতাব আকারে প্রকাশ পায়।
এই যে দুই ধরনের ধর্মীয় গ্রন্থ : একটি কোরআন এবং অপরটি হাদীস, এদের মধ্যে যে পার্থক্য, সেই পার্থক্যটার উপরেই সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করা প্রয়োজন। কোরআন ও হাদীসের মধ্যকার এই গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যটা শুধু ভাষা বা সাহিত্যমানের দিক থেকে নয়; এ পার্থক্য বিষয়বস্তুর দিক থেকেও উল্লেখযোগ্য। প্রকৃতপক্ষে, কোরআনের ভাষা ও বাভঙ্গির সাথে হাদীসের ভাষা ও বাকভঙ্গির কোনো তুলনা তো দূরের কথা, তুলনা করার চিন্তাও করা যায় না। সবচেয়ে বড় কথা, এই দুই ধরনের ধর্মীয়গ্রন্থের বাণীসমূহ যখন আধুনিক বিজ্ঞানের তথ্য জ্ঞানের আলোকে বিচার-বিশ্লেষণ করা হয়, তখন তাদের মধ্যে যে পার্থক্য বিরাট হয়ে ধরা পড়ে। তা লক্ষ্য করলে যে-কারোপক্ষেই বিস্ময়ে হতবাক না হয়ে উপায় থাকে না। আশা করি, সেই পার্থক্য ইতিমধ্যেই যথাযথভাবে সকলের কাছে ধরা পড়েছে। সেই পার্থক্যগুলো সংক্ষেপে নিম্নরূপ :
কোরআনে এমনসব বাণী ও বক্তব্য রয়েছে, যেগুলো দেখতে-শুনতে অতি সাধারণ মনে হলেও সে-সবের মধ্যে এমনসব তথ্য রয়েছে যেসব তথ্যের অর্থ ও মর্ম শুধু পরবর্তী পর্যায়ে এসে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের আলোকে সত্য হিসেবে উদ্ভাসিত হয়েছে ও হচ্ছে।
