পক্ষান্তরে, হাদীসে এমনসব বক্তব্য বিদ্যমান, যেগুলো তৎকালীন ধারণা ও প্রচলিত বিশ্বাসের সাথে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ। কিন্তু আধুনিক যুগে এসে ওইসব হাদীসের বক্তব্য বিজ্ঞানের বিচারে গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হতে পারছে না। এমনকি ইসলামী শরা-শরীয়ত বিষয়ে যেসব হাদীসগ্রন্থের সঠিকত্ব প্রশ্নাতীতভাবেই সর্বজনস্বীকৃত তাদের বিজ্ঞান-সংক্রান্ত বিভিন্ন হাদীসের বেলাতেও মোটের উপর একই অবস্থা ঘটছে।
সবশেষে, একটা বিষয় পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন : তাহল, কোরআনের বাণী সম্পর্কে স্বয়ং মোহাম্মদের (দঃ) দৃষ্টিভঙ্গি ছিল তাঁর নিজের বক্তব্য-সংক্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গির চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। কোরআনকে তিনি নিজেই ঘোষণা করেছিলেন, আল্লাহর নিকট থেকে প্রাপ্ত ওহী বা অবতীর্ণ আসমানী কিতাব হিসেবে। বিশ বছরের অধিককাল ধরে এসব বাণী তাঁর উপর অবতীর্ণ হয়েছিল। মোহাম্মদ (দঃ) নিজেই সবিশেষ সতর্কতার সাথে সেসব বাণী শ্রেণীবদ্ধ করে গেছেন। এ বিষয়টা নিয়ে ইতিপূর্বে বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়েছে। দেখা গেছে, কোরআনের ওইসব বাণী কিভাবে মোহাম্মদের (দঃ) জীবদ্দশাতেই লিখিতাকারে সংরক্ষণ করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল এবং যেসব বাণী হেফজ করে রাখা হয়েছিল বহুসংখ্যক ঈমানদার হাফেজের দ্বারা। শুধু তাই নয়, প্রতিটি নামাজে কোরআনের মুখস্থ করা কোনো-না-কোনো অংশ তেলাওয়াতের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। পক্ষান্তরে, হাদীস হচ্ছে প্রধানত মোহাম্মদের (দঃ) নিজস্ব বাণী, বক্তব্য ও ব্যক্তিগত কার্যকলাপের বিবরণী। তার সেইসব বাণী ও কার্যবিবরণী থেকে উদাহরণ নিয়ে নিজেদের আচার-আচরণ গড়ে নেয়ার দায়িত্ব তিনি মানুষের ইচ্ছার উপর ন্যস্ত করে গেছেন। তিনি এও বলে গেছেন, যদি তারা ভাল মনে করে তাহলে তারা তাঁর হাদীস সাধারণ্যে প্রচারও করতে পারে। তবে কোন ধরনের হাদীস মানুষ প্রচার করবে, সে বিষয়ে তিনি কোনো নির্দেশ দিয়ে যাননি।
সত্যি কথা বলতে কি, শুধু সীমিতসংখ্যক হাদীসেই মোহাম্মদের (দঃ) চিন্তা–ভাবনা ও ধ্যান-ধারণা সঠিকভাবে প্রতিফলিত হয়েছে বলে ধরে নেয়া যেতে পারে। বাদবাকি হাদীসে যা প্রতিফলিত হয় তা অবশ্যই সে যুগের প্রচলিত সাধারণ মানুষের চিন্তা-ভাবনার প্রতিফলন। অর্থাৎ, তা সে যুগের প্রচলিত সাধারণ মানুষের চিন্তা-ভাবনা ছাড়া অন্য কিছু নয়।
আমরা এখানে যেসব হাদীস উদ্ধৃত করছি, সেসবের ক্ষেত্রে এই কথাটা বেশি খাটে। এ ধরনের কোনো দুর্বল কিংবা জাল হাদীসের বক্তব্যের সাথে কোরআনের কোনো আয়াতের তুলনা করে দেখলেই আমরা বুঝে নিতে পারব যে, এ দুয়ের মধ্যকার পার্থক্য কত বিরাট। আর এই ধরনের যে-কোনো তুলনায় যে সত্যটা ফুটে ওঠে (সেই সত্য ফুটে ওঠার ব্যাপারে আর কোনো প্রমাণের প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না) তা থেকে আমরা অনায়াসেই সে যুগের প্রচলিত রচনার ধারা এবং লেখার ভঙ্গির একটি পরিচয় পেতে পারি।
বলা অনাবশ্যক যে, সে যুগে প্রচলিত বিজ্ঞান-সংক্রান্ত যে-কোনো রচনা আধুনিক বৈজ্ঞানিক বিচারে শুধু অসত্যই নয় বাতিল বলেও পরিগণিত হতে বাধ্য। পক্ষান্তরে, সেকালেই ওহীর মাধ্যমে প্রাপ্ত বাণীর সংকলিত রূপ হিসেবে যে কোরআন আমরা পাচ্ছি; সেই কোরআন এই ধরনের যে-কোনো ভ্রান্তি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত’।
বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ ধর্মীয় বিষয়ের বিচারে, বিশেষত ধর্মীয় বিধি-বিধান হিসেবে হাদীসের সত্যতা প্রশ্নাতীত। কিন্তু কোনো হাদীসে যখন নিছক পার্থিব কোন বিষয় আলেচিত হয়েছে, দেখা গেছে, সেসব বক্তব্য সে যুগের সাধারণ মানুষের প্রচলিত ধারণা থেকে বেশি আলাদা নয়।
“ধর্মীয় বিষয়ে যখন আমি কোনো নির্দেশ দেব, তখন তোমরা তা অবশ্যই মান্য করবে ও পালন করবে। পক্ষান্তরে, জাগতিক কোনো ব্যাপারে আমি যখন নিজের অভিমত অনুসারে কোনো নির্দেশ দেব, তখন (মনে রাখবে যে, আমি একজন মানুষ।”
–আল সারাকসী তাঁর প্রিন্সিপ (আল-ওসুল) গ্রন্থে এই হাদীসটি তুলে ধরেছেন এভাবে : মোহাম্মদ (দঃ) বলেছেনঃ
“আমি যখন কোনো ধর্মীয় বিষয়ে তোমাদের জন্য কোনো বক্তব্য রাখি, তোমরা তদনুসারে ধর্মের কাজ করবে, কিন্তু আমি যখন দুনিয়াদারীর ব্যাপারে তোমাদের কোনো কথা বলি, তখন মনে রাখবে যে, তোমাদের দুনিয়াদারীর ব্যাপারে তোমাদের নিকটই উত্তম জ্ঞান রয়েছে।”
১৪. সাধারণ আলোচনা ও বাইবেল পুরাতন নিয়ম
কে বাইবেলের পুরাতন নিয়মের লেখক? কোনো সন্দেহ নেই এর উত্তরে বলা হবে যে, বাইবেলের এই পুরাতন নিয়ম মানুষের রচনা, তাহলেও এ রচনার প্রেরণা এসেছে ‘হোলি-ঘোস্ট’ বা ‘পবিত্র-আত্মা’ থেকে, সুতরাং এ পুস্তকের রচয়িতা বিধাতাই।
বাইবেলের পরিচিতি লেখার সময় পাঠকবর্গের খেদমতে এই সংক্ষিপ্ত বক্তব্য পেশ করেই লেখকেরা ক্ষান্ত থাকেন বলে পরবর্তীকালে আর কোনো প্রশ্ন উত্থাপনের অবকাশ থাকে না। কখনো কখনো পরিচিতি-পর্বে এই মর্মেও পাঠকদের সতর্ক করা হয়, কোনো ব্যক্তি সম্ভবত পরবর্তী পর্যায়ে আদি-পুস্তকের সঙ্গে বিশদ কোনো বিবরণী সংযুক্ত করেছেন; কিন্তু সেই সংযুক্তিতে সংশ্লিষ্ট বক্তব্যে সন্নিবেশিত সত্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি। এই পর্যায়ে উল্লিখিত এই ‘সত্যে’র উপরেই বেশি গুরুত্ব আরোপ করা হয়। বলা আবশ্যক, বাইবেলের এই পরিচিতি রচনার ব্যাপারে চার্চ-অথরিটি নিজেদের একমাত্র হকদার বলে মনে করেন। কেননা, সাধারণ্যে এ ধারণা দিয়ে আসা হয়েছে যে, চার্চ-অথরিটিই একমাত্র সংস্থা–যাঁরা পবিত্র আত্মার সহযোগিতায় এসব বিষয়ে বিশ্বাসীদের প্রয়োজনীয় আলোকদানের ক্ষমতা রাখেন। স্মর্তব্য যে, চার্চ-কাউন্সিল বা গির্জা পরিষদের প্রথম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়েছিল চতুর্থ শতাব্দীতে। সেই থেকে এই গির্জা সংস্থাই একের-পর-এক ‘পবিত্র বাইবেল’ প্রকাশ করে এসেছে। পরবর্তীকালে কাউন্সিল অব ফ্লোরেন্স (১৪৪১), ট্রেন্ট ১৫৪৬ এবং ফাস্ট ভ্যাটিক্যান কাউন্সিলও (১৮৭০) এইসব প্রকাশিত বাইবেল অনুমোদন দিয়ে গেছেন। এভাবেই অধুনা কানুন’ বা ‘প্রামাণ্য হিসেবে পরিচিত বাইবেল পাওয়া যাচ্ছে। অনুমোদিত এই বাইবেল প্রচুরভাবে সম্প্রচারিত হওয়ার পর অতিসম্প্রতি দ্বিতীয় ভাটিক্যান কাউন্সিল সম্পূর্ণ নতুনভাবে একখানি বাইবেল সংকলনও প্রকাশ করেছেন। এটি প্রকৃতপক্ষেই একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। উল্লেখ্য যে, এই সংকলনটি প্রকাশ করতে দীর্ঘ তিনটি বছর ধরে সংশ্লিষ্ট সবাইকে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে। বাইবেলের এই আধুনিক সংস্করণের গোড়াতে স্পষ্ট ভাষায় বলে দেয়া হয়েছে যে, বিগত শতাব্দীগুলোতে বাইবেলের নির্ভুলতা সম্পর্কে যে গ্যারান্টি দেয়া হয়েছিল, তা ছিল সম্পূর্ণভাবে সন্তোষজনক। আধুনিক সংস্করণে সন্নিবেশিত এই বক্তব্যের পর বাইবেলের বাণীর নির্ভুলতা নিয়ে আর কোনো বিতর্ক উত্থাপনের অবকাশ যে থাকে না, তা বলাই বাহুল্য।
