“ডুবিয়া যাওয়ার কালে সূর্য … আরশের নিচে নিজেকে সিজদায় নত করিয়া দেয় এবং পুনরায় উদিত হওয়ার অনুমতি প্রার্থনা করে, এবং অনুমতি দেওয়া হয়। এবং তারপর (এমন এক সময় আসিবে) যখন ইহা প্রায় সিজদায় নত হবে … এবং নিজস্ব পথে যাত্রা করার অনুমতি প্রার্থনা করিবে; তখন নির্দেশ দেয়া হবে, সেই পথেই ফিরিয়া যাইতে, যে পথে সে আসিয়াছে। এবং এইরূপে উহা উদিত হইবে পশ্চিম দিক হইতে।” … (সহীহ আল-বুখারী)
এই হাদীসের মূল আরবিটি (সৃষ্টির সূচনাপর্ব, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৮৩, ৫৪তম অংশ, ৪র্থ অধ্যায়, ৪২১ নং হাদীস) খুবই দুর্বোধ্য এবং তার অনুবাদ আরো দুঃসাধ্য। এই হাদীসটি একটি রূপকভাবের প্রকাশ। তথাপি, এটি এমনভাবে বর্ণিত হয়েছে, যা থেকে বোঝা যায় সূর্যই ঘুরছে এবং পৃথিবী স্থির হয়ে রয়েছে; অথচ, আধুনিক বিজ্ঞানের অভিমত এর সম্পূর্ণ বিপরীত। সবচেয়ে বড় কথা, হাদীসটি আদৌ সহীহ, কিনা, সে বিষয়ে সন্দেহ রয়েছে (অর্থাৎ এটি জানি হাদীসের অন্তর্ভুক্ত)।
বুখারী থেকে গৃহীত আরেকটি হাদীসে (ঐ, অধ্যায় ৬, ৪৩০ নং হাদীস) গর্ভস্থ ভ্রূণের ক্রমবিকাশের ব্যাপারে এক অদ্ভুত হিসেব তুলে ধরা হয়েছে : “মানব-প্রজননের জন্য যেসব উপাদানের প্রয়োজন সেগুলো একত্রিত হয় ৪০ দিনে; দ্বিতীয় ৪০ দিন লাগে ভ্রূণটি যখন ‘আলাক’ বা ‘আটকানো অবস্থায় পৌঁছে; তৃতীয় ৪০ দিনে ভ্রূণটি উপনীত হয় ‘চিবানো গোশতের টুকরার মত অবস্থায়। তখন একজন ফিরিশতা আসেন, শিশুটির তকদিরে কি আছে তা। নির্দোষ করে দেয়ার জন্য এবং ভ্রূণটির মধ্যে আত্মাকে ফুকে দেওয়া হয়। বলা অনাবশ্যক যে, এখানে ভ্রণ সম্পর্কে যে তথ্য তুলে ধরা হয়েছে, তা আধুনিক বিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠিত তথ্যের সাথে কোনক্রমেই সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
কোরআনে যেখানে রোগব্যাধির উপশম-সংক্রান্ত বিষয়ে একটি মন্তব্য (সূরা ১৬, আয়াত ৬৯) বাদে আর কোনো বক্তব্য নেই, সেখানে হাদীসগ্রন্থের বিস্তৃত স্থান জুড়ে এ বিষয়ে নানা বক্তব্য পেশ করা হয়েছে। বলাবাহুল্য, কোরআনের উপযুক্ত আয়াতে মধু ব্যবহারের দ্বারা শুধু রোগব্যাধি নিরাময়ের সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। তাছাড়া সেখানে নির্দিষ্ট করে কোনো রোগের নামও উল্লেখ করা হয়নি। পক্ষান্তরে, আল-বুখারী’র একটি সম্পূর্ণ অধ্যায়ই (৭৬নং) ব্যবহৃত হয়েছে ঔষধ-সংক্রান্ত নানা হাদীস বর্ণনায়। হুডাস ও মারকাইস অনূদিত ফরাসী ভাষার আল-বুখারীর ৪র্থ খণ্ডের ৬২ থেকে ৯১ পৃষ্ঠা এবং ডঃ মোহাম্মদ মুহসিন খানের দ্বিভাষিক আরবী/ইংরেজি বুখারীর ৭৮ম খণ্ডের ৩৯৫ পৃষ্ঠা থেকে ৪৪২ পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য। সন্দেহ নাই যে, এইসব পৃষ্ঠায় যেসব হাদীস বর্ণিত হয়েছে তারমধ্যে অনেকগুলোই বানোয়াট (জানি); কিন্তু সার্বিক বিচারে এইসব হাদীস আবার গুরুত্বপূর্ণ ও কৌতূহলোদ্দীপক এই কারণে যে, খুব সম্ভব এই-সব হাদীসে সে সময়ের বিভিন্ন রোগব্যাধির প্রচলিত ঔষধপত্র ও নিরাময়-পদ্ধতি সম্পর্কেই অভিমত ও বর্ণনা তুলে ধরা হয়েছে থাকবে। আল-বুখারীর অপরাপর অধ্যায়ে ঔষধপত্র-সংক্রান্ত আরো যেসব হাদীস বিদ্যমান, এই প্রসঙ্গে সেগুলোর কথাও স্মরণ করা যেতে পারে।
এসব হাদীসের কোনো কোনোটিতে দেখা যায়, বদনজর, যাদুটোনা এবং মন্ত্রের দ্বারা ভূত ছাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। অবশ্য, এসব কাজে কোরআনের আয়াত ব্যবহার করা হলে, সে জন্যে পারিশ্রমিক গ্রহণের উপরে রয়েছে স্পষ্ট বিধি-নিষেধ। একটি হাদীসে দেখা যায়, বিশেষ একধরনের খেজুর যাদুমন্ত্রের ক্ষমতাকে বানচাল করে দিতে পারে। অন্যদিকে এও বলা হয়েছে যে, বিষাক্ত সর্পদংশন থেকে মানুষকে বাঁচাতে মন্ত্রশক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে।
এ ধরনের বক্তব্যে অবশ্য অবাক হওয়ার তেমন কিছু নেই। মনে রাখা দরকার, সেকালে ঔষধপত্রের বৈজ্ঞানিক ব্যবহার চালু হয়নি। বিভিন্ন রোগব্যাধি থেকে মুক্তির জন্য মানুষকে প্রধানত সাধারণ ব্যবস্থাপত্র প্রাকৃতিক পদ্ধতি প্রভৃতির উপরে নির্ভর করতে হত। এসব পদ্ধতির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল শিংগা লাগানো, লোহা পুড়ে দাগ দেয়া, উকুন তাড়ানোর জন্য মাথা মুড়ানো, উটের দুধ ব্যবহার প্রভৃতি। তাছাড়াও, কালিজিরার মত নানাধরনের বীজও রোগব্যাধি নিরাময়ে ব্যবহৃত হত এবং একই উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হত নানাধরনের লতা-গুল্ম যেমন ইন্ডিয়ান কাস্ট। ক্ষতের রক্তপাত বন্ধের জন্য খেজুর পাতার চাটাই পুড়ে তার ছাই লাগনোর জন্যেও নির্দেশ দেয়া হত। এককথায়, আপদকালীন জরুরি প্রয়োজনে যা-কিছু হাতের কাছে পাওয়া যেত, তার সদ্ব্যবহারে কোনোরকম ত্রুটি রাখা হত না। অবশ্য, ক্ষেত্রবিশেষে এমনকিছু ব্যবহারের নির্দেশও দেয়া হত, যা রুচিকর বলে গণ্য হতে পারে না। যেমন উষ্ট্রমূত্র।
এ ছাড়াও, যে যুগে বিভিন্ন রোগের উৎস ও কারণ হিসেবে এমনসব ব্যাখ্যা দেয়া হত যা আজকের যুগে মেনে নেয়া মুশকিল। যেমন : জ্বরের মূল কারণ : ‘দোজখের আগুন থেকে জ্বরের উৎপত্তি। এ সম্পর্কে এ ধরনের মোট ৪টি বক্তব্য রয়েছে বুখারীতে (দেখুন, আল-বুখারী, ঔষধশাস্ত্র, ৭ম খণ্ড, অধ্যায় ২৮, পৃষ্ঠা ৪১৬)। প্রতিটি পীড়ার ঔষধ রয়েছে : “আল্লাহ এমন কোনো রোগ সৃষ্টি করেননি সাথে সাথে যার ঔষধ তিনি সৃষ্টি করেননি।” (ঐ, অধ্যায় ১, পৃষ্ঠা ৩৯৫) এই বক্তব্যের ব্যাখ্যায় মাছি-সংক্রান্ত একটি হাদীসে বলা হয়েছে : “তোমাদের কোনো পাত্রে যদি মাছি পড়ে, তাহা হইলে উহাকে (ওই পাত্রের ভেতর) পুরাটা ডুবাইয়া লও, তারপর মাছিটাকে ফেলিয়া দাও। কেননা, মাছির একটি পাখায় যেমন রোগ থাকে, তেমনি অন্যপাখায় থাকে উহার ঔষধ (প্রতিষেধক) অর্থাৎ চিকিৎসা ব্যবস্থা।” (ঐ অধ্যায় ১৫-১৬, পৃষ্ঠা ৪৫২-৪৫৩, আরো দেখুন, সৃষ্টির সূচনা অধ্যায়, ৫৪তম অংশ, অধ্যায় ১৫ ও ১৬)।
