মূল বা উৎসের দিক থেকে বিচার করলে দেখা যায়, মুসলমানদের হাদীস আর খ্রিস্টানদের বাইবেলের সুসমাচারসমূহ (ইঞ্জিলের ১ম চারখণ্ড) অনেকটা একই ধরনের ধর্মীয়-গ্রন্থ। বাইবেলের (ইঞ্জিলের) যেমন, হাদীসেরও তেমনি, কোনো লেখক বা সংকলনকারী বর্ণিত কোনো ঘটনা বা বক্তব্য লিপিবদ্ধ হয়ে যাওয়ার অনেক পরে সেগুলো সংকলনে স্থান লাভ করেছে। বাইবেলের সুসমাচারগুলোর ব্যাপারে যেমন, হাদীসের ব্যাপারেও তেমনি সেসবের মধ্যে বর্ণিত সবকিছুই বিশ্বস্ত প্রামাণ্য বা একদম সহীহ্ বলে সর্বসাধারণ কর্তৃক গৃহীত হয়নি। হাদীস বা সুন্নাহর ব্যাপারে যারা বিশেষজ্ঞ, তেমন ধারার অভিজ্ঞ আলেম-মুহাদ্দিসের নিকট স্বল্পসংখ্যক হাদীসই সর্বজনস্বীকৃত বিশ্বস্ত হাদীস হিসেবে অনুমোদন লাভ করতে পেরেছে। এ কারণেই আল-মুয়াত্তা, সহীহ মুসলিম ও সহীহ্ আল-বুখারী বাদে অন্যান্য হাদীসগ্রন্থে দেখা যায়, সহীহ্ বা সঠিক বলে পরিচিত হাদীসের পাশাপাশি এমনসব হাদীসও স্থান লাভ করেছে–যেসব হাদীস হল জাল, নতুবা বাতিল বলে পরিগণিত।
বাইবেলের যে কানুনিক গসপেল বা প্রামাণ্য চার সুসমাচার (ইঞ্জিলের ১-৪ খণ্ড) রয়েছে, বর্তমান সময়ে এসে সেসবের সঠিকত্ব নিয়েও কোনো কোনো বিজ্ঞ-বিশেষজ্ঞ প্রশ্ন তুলেছেন। কিন্তু খ্রিস্টধর্মের সর্বোচ্চ পর্যায়ের পুরোহিত ধর্মগুরুরা সেসব প্রশ্নের জবাব দিতে এগিয়ে আসছেন না। বরং, তাঁরা এসব বিষয়ে একদম নীরব। পক্ষান্তরে, যেসব হাদীস একদম সঠিক ও সহীহ্ বলে পরিচিত, সেগুলোর উপরেও মুসলিম সমাজে গোড়া থেকেই নানা পর্যালোচনা ও বিচার-বিশ্লেষণ চালানো হয়েছে (এবং এখনো হচ্ছে)। ইসলামের ইতিহাসের সূচনাতেও দেখা যায়, ধর্মীয় বিষয়ে যারা বিশেষজ্ঞ, তাঁরাও এসব হাদীসের সঠিকত্ব নির্ণয়ে কম বিচার-বিশ্লেষণ চালাননি। তবে মূল ধর্মীয় গ্রন্থ (কোরআন) আগাগোড়াই ‘পবিত্র কিতাব হিসেবে ধর্মীয় শিক্ষা ও বিধি-বিধানের প্রধান উৎসরূপে বিরাজ করছে : কোরআনের সঠিকত্ব সম্পর্কে কোনোরকম প্রশ্ন কিংবা বাদানুবাদ এখনো দেখা দেয়নি।
হাদীস নিয়েও কৌতূহলের অন্ত নেই। হাদীসের বাণীকে তাই ড. মরিস বুকাইলি এই গবেষণার বিষয়বস্তু করে নিয়েছেন। একটিমাত্র কারণে : বিভিন্ন বিষয়ে হযরত মোহাম্মদ (দঃ) কিভাবে নিজের চিন্তাভাবনা ও বক্তব্য প্রকাশ করতেন, সে বিষয়টা সম্পর্কে ড. মরিস বুকাইলি সুস্পষ্ট ধারণা গড়ে তুলতে প্রয়াস পেয়েছেন। সেইসাথে তিনি আরো একটি বিষয় পরীক্ষা করে নিতে চেয়েছেন, ওহী বা প্রত্যাদেশের মাধ্যমে প্রাপ্ত ধর্মগ্রন্থ কোরআন ছাড়া মোহাম্মদের (দঃ)-এর নামে প্রচারিত তাঁর নিজস্ব অপরাপর বাণী ও বক্তব্য আধুনিক যুগের বৈজ্ঞানিক তথ্যজ্ঞানের বিচার-বিশ্লেষণে কতটা টেকসই।
যদিও সহীহ মুসলিম ও সঠিক ও প্রামাণ্য হাদীসগ্রন্থ হিসেবে সর্বজনস্বীকৃত, তবুও তিনি তাঁর এই গবেষণা-পর্যালোচনায় সর্বাধিক প্রামাণ্য ও সঠিক বলে বিবেচিত আল-বুখারীকেই বেছে নিয়েছেন। এই পর্যালোচনায় তিনি একটি কথা সর্বক্ষণ মনে রেখেছেন যে, বিভিন্ন লোকের নিকট থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে এইসব হাদীসগ্রন্থ সংকলিত হয়েছে মানুষের হাতেই। এসবের কোনো কোনোটা লিখিতাকারে থাকলেও বেশিরভাগই চালু ছিল মুখে মুখে। এসব হাদীসের কোনো কোনো বর্ণনা কমবেশি সঠিক। তাছাড়া, যেসব হাদীস সঠিক নয়, সেসবের ভ্রান্তির জন্য দায়ী তারাই যাদের মাধ্যমে এসব হাদীস চালু ছিল। পক্ষান্তরে, এমন ধরনের হাদীসও রয়েছে, যেসব হাদীসের রাবি বা বর্ণনাকারীর সংখ্যা অনেক, এবং সেসব হাদীসের সত্যতা ও প্রামাণিকতাও প্রশ্নাতীত (মুসলিম মুহাদ্দিসবৃন্দ ভ্রান্তিপূর্ণ কিংবা দুর্বল হাদীসকে ‘জান্নি’; এবং সম্পূর্ণ সঠিক ও প্রামাণ্য হাদীসকে ‘কাতী” নামে অভিহিত করে গেছেন)।
এতুদপ্রসঙ্গে আমরা এবার ড. মরিস বুকাইলির বর্ণনা পাঠান্তে বিষয়টি পাঠকদের উদ্দেশে তুলে ধরছি : …. আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের আলোকে বিভিন্ন হাদীসের উপরেও পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছি। ইতিপূর্বে কোরআনের বিভিন্ন আয়াত পরীক্ষা-নিরীক্ষার ক্ষেত্রে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের তথ্য-উপাত্ত যেভাবে ব্যবহার করেছি, এক্ষেত্রেও তার কোনো ব্যতিক্রম হয়নি। এই পরীক্ষা-নিরীক্ষার যে ফলাফল তা মুখে না বলে উদাহরণসমেত তুলে ধরে দেখা যাচ্ছে : আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের আলোকে কোরআনে পরিবেশিত বৈজ্ঞানিক তথ্যাবলী যেখানে সত্য ও প্রামাণ্য বলে প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে, সেখানে হাদীসে বর্ণিত একই বিষয়ের তথ্যাবলী একই ধরনের জ্ঞান-বিজ্ঞানের আলোকে সত্য কিংবা প্রামাণ্য হিসেবে প্রায় দাঁড়াতেই পারছে না। বলা আবশ্যক যে, এই মন্তব্য করতে গিয়ে আমি হাদীসের শুধু বিজ্ঞান-সংক্রান্ত বিষয়গুলোকেই বেছে নিয়েছি।
এমনও দেখা গেছে, কোরআনের কোনো কোনো বাণীর ব্যাখ্যা হিসেবে হাদীসের কোনো কোনো বাণীকে গ্রহণ করা হয়েছে এবং হাদীসের সেই ব্যাখ্যা টেনে তফসীরকারগণ কোরআনের বিভিন্ন বাণীর যেসব ভাষ্য রচনা করে গেছেন, আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের আলোকে সেসবও গ্রহণযোগ্য হতে পারছে না। ইতিপূর্বে আমরা কোরআনের একটি আয়াত (সূরা ৩৬, আয়াত ৩৮) নজরে এনে দেখেছি, সূর্য-সংক্রান্ত এই আয়াতটি আধুনিক বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যবহ। আয়াতটি এই : “সূর্য ছুটিয়া চলিয়াছে, তাহার একটি নির্ধারিত স্থানের অভিমুখে। নিচে এই আয়াতের ব্যাখ্যা-সম্বলিত একটি হাদীস তুলে ধরা হল :
