এ যুগের অনেকেই আধুনিক তথ্য-প্রমাণের আলোকে ধর্মীয় গ্রন্থের বিভিন্ন বর্ণনার সত্যাসত্য যাচাই করে নিতে চান। তাঁদের কাছে অনুরোধ, তারা যেন মেহেরবানী করে কায়রো যান এবং তথাকার মিসরীয় যাদুঘরে রয়্যাল মামিজ উল্লেখ্য, (রামেসিসের মমিটির উপরও ফেরাউন মারনেপতাহহর মমির মতই পরীক্ষা ও তদন্তকার্য পরিচালিত হয়েছে)। এই মমিটির জন্যও অনুরূপ সংরক্ষণ ব্যবস্থা প্রয়োজন।
১৯৭৫ সালে কায়রোতে ফেরাউনের মমির উপরে যে মেডিক্যাল তদন্ত পরিচালিত হয়, তার লিখিত ফলাফল ১৯৭৬ সালের প্রথমদিকে ডঃ মরিস বুকাইলি (ফরাসী উচ্চারণ, মরিস বুকাই) নিজেই তা একাধিক সুধি-সমাবেশে পেশ করেন। উল্লিখিত সুধি-সমাবেশের মধ্যে যেমন একাধিক বিদগ্ধ সমিতির নানা অধিবেশনের কথা বলতে হয়, তেমনি বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয় ফ্রান্স ন্যাশনাল একাডেমীর অধিবেশনের কথাও। যাহোক, তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতে মিসরীয় কর্তৃপক্ষ দ্বিতীয় রামেসিস-এর মমিটি চিকিৎসার জন্য ফ্রান্সে পাঠানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। সে মোতাবেক, ১৯৭৬ সালের ২৬শে সেপ্টেম্বর মমিটি প্যারিসে পৌঁছে। যাদের পক্ষে সম্ভব তাঁরা সংরক্ষিত ফেরাউনের এই মমিটি দর্শন করে আসবেন। আর তা হলেই তারা বুঝতে পারবেন, কোরআনের আয়াতে ফেরাউনের মরদেহ সংরক্ষণ সম্পর্কে যে বর্ণনা রয়েছে, তার বাস্তব উদাহরণ কত জাজ্বল্যমান।
১৩. কোরআন, হাদীস ও আধুনিক বিজ্ঞান
হাদীস ও বিজ্ঞান-সংক্রান্ত আলোচনার বিষয়ে আমরা ‘বাইবেল কোরআন ও বিজ্ঞান’ পুস্তকের মূল লেখক ডঃ মরিস বুকাইলির সাথে সবক্ষেত্রে একমত নই। সহীহ্ হাদীসগ্রন্থগুলোতেও সঠিক ও বিশ্বস্ত হাদীসের পাশাপাশি কিভাবে হযরতের (দঃ) নামে বেশকিছু প্রক্ষিপ্ত–মওজু—দুর্বল–জাল ও মিথ্যা হাদীস স্থানলাভ করেছে, মুসলিম হাদীসবেত্তা–ধর্মতত্ত্ববিদ ও চিন্তাশীল লেখকবৃন্দ সে সম্পর্কে বিস্তর আলোচনা-পর্যালোচনা করে গেছেন। বলা আবশ্যক যে, বাইবেল কোরআন ও বিজ্ঞান গ্রন্থে লেখক মরিস বুকাইলি বিজ্ঞান-সংক্রান্ত যেসব হাদীস আলোচনার জন্য গ্রহণ করেছেন, তার অধিকাংশ, কিংবা সবগুলোই ওইরকম জাল, দুর্বল কিংবা মিথ্যা হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
তবুও মরিস বুকইলির মত পাশ্চাত্য জগতের একজন চিন্তাশীল গবেষক বিজ্ঞানী তার সাড়া জাগানো এই গ্রন্থটিতে ‘হাদীস ও বিজ্ঞান সম্পর্কে যে আলোচনার অবতারণা করেছেন, চিন্তাশীল গবেষক-বিজ্ঞানীদের এ বিষয়ের প্রতি আশু দৃষ্টি আকর্ষণের স্বার্থে আমরা এই অধ্যায়ের অবতারণা করছি। স্মর্তব্য যে, মরিস বুকাইলি নিজেও তাঁর আলোচনার জন্য গৃহীত এসব হাদীস আদৌ হযরতের (দঃ) বক্তব্য কিনা, অর্থাৎ, ‘সন্দেহজনক’ বলে উল্লেখ করেছেন। এ ধরনের সন্দেহজনক’ তথা দুর্বল, জাল ও মিথ্যা হাদীস কিভাবে হাদীসগ্রন্থসমূহে স্থান লাভ করেছে সে বিষয়ে যারা বিস্তারিতভাবে জানতে চান, তারা যেন মেহেরবানী করে মরহুম মাওলানা মোহাম্মদ আকরাম খাঁ রচিত সুবিখ্যাত ‘মোস্তফা চরিত’ গ্রন্থটির ৪র্থ থেকে ১০ম অধ্যায়ে মনোযোগের সাথে পাঠ করেন।
কোরআন ইসলামের ধর্মীয় নীতি ও বিধি-বিধানের একমাত্র উৎস নয় : মোহাম্মদের (দঃ) জীবদ্দশায় যেমন তেমন তাঁর মৃত্যুর পরেও ইসলামী আইন তথা শরা-শরীয়তের পরিপূরক বিধি-বিধান তাঁর বক্তব্য ও কাজের মধ্যথেকে খুঁজে নেয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।
যদিও প্রথম থেকেই হাদীস লিপিবদ্ধ আকারে ধরে রাখার ব্যবস্থা ছিল, তথাপি বেশিরভাগ হাদীস এসেছে মৌখিক বর্ণনা থেকে। যারা এসব হাদীস সংকলন আকারে প্রকাশ করে গেছেন, তারা বিশেষ কষ্ট স্বীকার করে ভালভাবে খোঁজখবর নিয়েই অতীতের সেসব ঘটনা বা বক্তব্য লিপিবদ্ধ করেছিলেন। এ ধরনের হাদীস-সংগ্রহে যারা লিপ্ত ছিলেন, তাঁরা জানতেন, নিখুঁতভাবে সঠিক হাদীস সংগ্রহের গুরুত্ব কতখানি। এ কারণে দেখা যায়, সংগৃহীত প্রতিটি হাদীস, এমনকি সে হাদীস যতই নাজুক হোক-না-কেন, কার নিকট থেকে কার মাধ্যমে তা সংগৃহীত হয়েছে, এবং একদম প্রথম পর্যায়ে কে বা কারা সে হাদীস মোহাম্মদের (দঃ) পরিবারের কোন্ সদস্য কিংবা তার কোন্ সাহাবার নিকট থেকে শুনেছিলেন, সংশ্লিষ্ট সেই হাদীসে সেসব তথ্যের বিশেষ উল্লেখ রয়েছে।
এভাবেই মোহাম্মদের (দঃ) বহুসংখ্যক বক্তব্য ও কর্মের বিবরণী লিপিবদ্ধ হয়ে পরিচিতি লাভ করেছে ‘হাদীস’ নামে। ‘হাদীস’ শব্দের অর্থ হল বক্তব্য বা উচ্চারণ। তবে প্রচলিত অর্থে মোহাম্মদের (দঃ) কর্মবিবরণীকেও ‘হাদীস’ নামে আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে।
সংকলন-গ্রন্থের আকারে কিছু কিছু হাদীস প্রকাশ পায়, মোহাম্মদের (দঃ) মৃত্যুর কয়েক দশক পরে। এভাবে তার মৃত্যুর প্রায় দু’শ বছরের মধ্যে হাদীসের কয়েকখানি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংকলন প্রকাশিত হয়। এরমধ্যে সর্বাধিক বিশুদ্ধ বা সহীহ হাদীসগ্রন্থ হিসেবে আল-বুখারী ও মুসলিম সমধিক প্রসিদ্ধ। মোহাম্মদের (দঃ) মৃত্যুর দু’শ বছর পরে প্রকাশিত এই দুটি সংকলনে যেসব হাদীস স্থান লাভ করেছে, তা সর্বত্র বিশ্বস্ত বা সঠিক হাদীস হিসেবে সমাদৃত।
সম্প্রতি মদীনার ইসলামিক ইউনিভার্সিটি থেকে ডক্টর মোহাম্মদ মুহসিন খান কর্তৃক সহীহ বুখারীর একখানি আরবি/ইংরেজি দ্বিভাষিক সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে (১ম সংস্করণ, ১৯৭১)। সঠিকত্ব ও বিশ্বস্ততার দিকথেকে হাদীস আল-বুখারীর স্থান কোরআনের পরেই। ইসলামিক ট্র্যাডিশন্স’ নামে ফরাসী ভাষায় আল-বুখারীর অনুবাদ প্রকাশ করেছেন হুডাস ও মারকাইস (১৯০৩-১৯১৪)। সুতরাং, যারা আরবি ভাষা না জানেন, তাঁরাও এখন এসব অনুবাদের মাধ্যমে হাদীস পড়ে দেখতে পারেন। তবে, হাদীসের বিভিন্ন অনুবাদের ব্যাপারে পাঠকদের অবশ্যই সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। কেননা, ফরাসী ভাষাসহ বিভিন্ন ইউরোপীয় ভাষায় হাদীসের অনুবাদগুলোতে বড় বেশি ভুল ও অসত্য বক্তব্য ভরে দেয়া হয়েছে। অনেকক্ষেত্রে দেখা গেছে, এগুলো প্রকৃতপক্ষে অনুবাদ নয়; বরং ব্যাখ্যা। শুধু তাই নয়, কোনো কোনো অনুবাদে দেখা গেছে, হাদীসের মূল বক্তব্যের রদবদল তো করা হয়েছেই, সেইসাথে হাদীসে যা নাই তাই জুড়ে দেয়া হয়েছে হাদীসের নামে।
