ধর্মগ্রন্থে বর্ণিত বিবরণ ছাড়া ইহুদীদের মিসরে অবস্থানের আর তেমন কোনো স্পষ্ট প্রমাণ নেই। অবশ্য, সাংকেতিক চিত্রলিখন পদ্ধতিতে (হাইয়ারোগ্লিফিক) রচিত এমনকিছু দলিলপত্র পাওয়া যাচ্ছে যাতে দেখা যায়, এককালে মিসরে এমন একধরনের শ্রমিক ছিল যাদের বলা হত আপিরু, হাপিরু অথবা হাবিরু। এই শ্রমিক শ্রেণীকেই (ভুল অথবা শুদ্ধ যেভাবেই হোক) হিব্রু বা ইহুদী হিসেবে সনাক্ত করা হয়। সাধারণত, এই শ্রেণীর শ্রমিক রাজমিস্ত্রি, কৃষক-মজুর অথবা ফসল কাটার কামলা হিসেবে কাজ করত। কিন্তু, এরা এলো কোত্থেকে? এর জবাব পাওয়া খুবই মুশকিল। এ বিষয়ে ফাদার ডি ভক্স-এর বক্তব্য হচ্ছে : এরা স্থানীয় লোক ছিল না; এরা স্থানীয় সমাজের সাথে একীভূতও হয়নি। তাছাড়া, এরা সকলেই এক পেশার বা সমমর্যাদার লোকও ছিল না।
তৃতীয় টুথমোসিসের আমলের প্যাপিরাসে লিপিবদ্ধ এক রচনা অনুসারে, এরা ছিল ‘আস্তাবলের শ্রমিক’। এও জানা যাচ্ছে যে, খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চদশ শতকে, মিসরের অধিপতি দ্বিতীয় এ্যামেনোফিস–কেনান থেকে এদের প্রায় ৩৬০০ জনকে বন্দী করে এনেছিলেন। ফাদার ডি বক্স-এর মতে, এদের বেশিরভাগই ছিল সিরিয়া ও ফিলিস্তিনের অধিবাসী। খ্রিস্টপূর্ব ১৩০০ অব্দের দিকে অধিপতি প্রথম সেথোসের আমলে এই ‘আপিরু’ লোকেরা দারুণ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছিল। কেনানের বেথ-শিন এলাকায়। দ্বিতীয় রামেসিসের আমলে এদের অনেককে ফেরাউনের কাজে যেমন, গ্রেট পাইলন অব রামেসিস মিয়ামনের পাথর খোদাই কিংবা পাথর টানা শ্রমে নিয়োগ করা হয়। বাইবেল থেকে আরো জানা যায়, দ্বিতীয় রামেসিসের আমলে উত্তরাঞ্চলীয় রাজধানী রামেসিস নগরী নির্মাণের কাজে কিভাবে ইহুদীদের লাগানো হয়েছিল। খ্রিস্টপূর্ব দ্বাদশ শতাব্দীর মিসরীয় রচনাবলীতে পুনরায় ‘আপিরুদের’ উল্লেখ দেখা যায় এবং এদের সর্বশেষ উল্লেখ রয়েছে, তৃতীয় রামেসিসের কাহিনীতে।
যাহোক, ‘আপিরু’ শব্দটা যে কেবল মিসরেই ব্যবহৃত হত, তা নয়। সুতরাং, এই শব্দটার দ্বারা শুধু যে হিব্রু তথা ইহুদীদেরই বোঝাবে, সেটাই বা নিশ্চিত করে বলা চলে কিভাবে? বলে রাখা ভালো যে, এই আপিরু শব্দটা প্রথম দিকে “জবরদস্তিমূলকভাবে কাজে ব্যবহৃত সবধরনের শ্রমিক মজুরের বেলায় ব্যবহৃত হয়ে থাকতে পারে, সে শ্রমিকেরা যেখান থেকেই আসুক-না কেন। এভাবে, পরবর্তীকালে এ শব্দটা এই ধরনের যে-কোনো শ্রমিকের বিশেষণ হিসেবেও প্রচলিত হয়ে থাকতে পারে। এখানে উদাহরণ হিসেবে সুইশে (সুইস) শব্দটার সাদৃশ্য টানতে পারি। ফরাসী ভাষায়, এই শব্দটার বেশ কয়েকটা অর্থ রয়েছে। এর দ্বারা যেমন সুইজারল্যান্ডের অধিবাসী বোঝায়, তেমনি এর দ্বারা বোঝানো হয় অতীতের ফরাসী রাজাদের সেইসব ভাড়াটে সৈনিককেও, যারা সুইস বংশোদ্ভুত। ভ্যাটিক্যানের পাহারাদার কিংবা খ্রিস্টীয় গির্জার কোনো কোনো চাকুরেকেও সুইসে’ বলা হয়ে থাকে।
যাহোক, হতে পারে যে, দ্বিতীয় রামেসিসের আমলে এই যে হিব্রু (ইহুদী, বাইবেলের বর্ণনা অনুসারে) অথবা এই যে আপিরু (সাংকেতিক ভাষার রচনামতে), এদের ফেরাউনের নির্দেশ মোতাবেক বড় বড় কাজে লাগানো হয়ে থাকবে। তবে, সেই সাথে এটা বুঝতেও বেগ পেতে হয় না যে, এসব শ্রমিক বলতে গেলে সবাই ছিল ‘জবরদস্তির শিকার’। দ্বিতীয় রামেসিস ইহুদী-নিপীড়ক ছিলেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। বাইবেলের যাত্রাপুস্তকে উল্লিখিত ‘রামেষিষ’ ও ‘পিথমনগরী’ নীল-বদ্বীপের পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত ছিল। অধুনা, তানিস ও কানতির বলে পরস্পর মাইল পনেরো ব্যবধানে যে দুটি নগরী মিসরে বিদ্যমান, উল্লিখিত দুটি প্রাচীন নগরী এই দুই স্থানেই অবস্থিত ছিল। আর এই স্থানেই দ্বিতীয় রামেসিস কর্তৃক স্থাপিত হয়েছিল উত্তরাঞ্চলীয় রাজধানী। সুতরাং, দ্বিতীয় রামেসিসই ছিলেন ইহুদী-নিপীড়ক সেই ফেরাউন।
আর এই পরিবেশেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন হযরত মুসা। কিভাবে শিশুকালে তিনি নদীগর্ভ থেকে উদ্ধার পান, সে বর্ণনা অনেকেরই জানা রয়েছে। হযরত মুসার মিসরীয় একটা নামও ছিল। পি. মতেঁ তাঁর ‘ইজিপ্ট অ্যান্ড দি বাইবেল” পুস্তকে পরিষ্কারভাবে দেখিয়েছেন, একাধিক ‘মেসও’ অথবা ‘মেসি’ নাম মিঃ র্যাক কর্তৃক সঙ্কলিত সাংকেতিক ভাষার নাম-অভিধানের তালিকায় রয়েছে। কোরআনে ব্যবহৃত মুসা’ নামটি এই প্রাচীন মিসরীয় নামেরই অক্ষরান্তর মাত্র।
মিসরে প্লেগ :
এই শিরোনামে বাইবেলে মিসরবাসীদের উপরে আল্লাহর দশটি গজব নাজিল হওয়ার কথা বিশদভাবে বর্ণিত রয়েছে। এ গজবের অনেকগুলো অলৌকিক ধরনের বা চরিত্রের। কোরআনে গজবের সংখ্যা উল্লিখিত হয়েছে মাত্র পাঁচটি এবং সেই পাঁচটি গজবের প্রত্যেকটিতে প্রাকৃতিক ঘটনাই যে বাড়তি বিপর্যয় হিসেবে দেখা দিয়েছিল কোরআনের বর্ণনায় সেটা স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। এই পাঁচটি গজব হচ্ছে : বানভাসি, পঙ্গপাল, উকুন, ব্যাঙ ও রক্ত।
পঙ্গপাল ও ব্যাঙ-এর দ্রুত সংখ্যাবৃদ্ধির কথা বাইবেলেও বর্ণিত রয়েছে। এতে আরো বলা হয়েছে যে, মিসরের সব নদীর পানি রক্তে পরিণত হয়েছিল এবং সেই রক্ত প্লাবন আকারে সারা দেশ ভাসিয়ে দিয়েছিল (!) কোরআনে শুধু রক্তের কথা উল্লেখ করা হয়েছে; কিন্তু সে সম্পর্কে আর কোনো বর্ণনা অনুপস্থিত। সুতরাং, রক্ত বলতে এখানে কি বোঝানো হয়েছে, সে সম্পর্কে যে কেউ যে-কোনো ধারণা করে নিতে পারেন।
