(খ) ফেরাউনকে উদ্ধার করা বা টিকিয়ে রাখার কথাটির দ্বারা বুঝতে হবে তার লাশের সংরক্ষণ। কেননা, কোরআনে (১১ নং সূরার ৯৮ নং আয়াতে) স্পষ্টভাষায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, ফেরাউন ও তার সঙ্গীদের চরম পরিণতি হবে জাহান্নাম।
“কেয়ামতের দিন (ফেরাউন) তাহার লোকজনের পুরোভাগে থাকিয়া অগ্রসর হইবে; এবং দোজখে যাওয়ারকালে তাদের নেতৃত্ব দিবে।” সূরা ১১, আয়াত ৯৮।
এতক্ষণ যেসব ঘটনা ও কাহিনীর উল্লেখ করা হল, এবারে আধুনিক যুগের আবিস্কৃত ঐতিহাসিক, ভৌগোলিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্যজ্ঞানের আলোকে সেসবের সত্যাসত্য নির্ণয় করা যেতে পারে। সে বিচারে প্রথমেই ধরা পড়ে ইহুদীদের মিসরত্যাগের ঘটনা সম্পর্কে কোরআন ও বাইবেলের বর্ণনার পার্থক্য। ওই পার্থক্য নিম্নরূপ:
হযরত মুসার অনুসারী ইহুদীদের দ্বারা যে দুটি নগরী নির্মিত হয়েছিল, কোরআনে সে দুটি নগরী নির্মাণের কিংবা নগরী দুটির নামের কোনো উল্লেখ নেই। যেমনই, উল্লেখ নেই ইহুদীরা কোন পথে মিসর ত্যাগ করেছিল।
–হযরত মুসা যখন মাদিয়ানে অবস্থান করছিলেন, তখন যে একজন ফেরাউন (তল্কালীন মিসরের শাসকবর্গের উপাধি ছিল : ফেরাউন) মারা যান, কোরআনে তারও কোনো উল্লেখ নেই।
–হযরত মুসা কত বছর বয়সে ফেরাউনের কাছে গিয়ে তাকে সৎপথে ফিরবার এবং ইহুদীদের মিসরত্যাগের অনুমতিপ্রদানের আবেদন জানিয়েছিলেন,–তাও কোরআনে অনুল্লিখিত।
–কোরআনে হযরত মুসার অনুসারীদের কোনো উল্লেখ করা হয়নি। ওদিকে বাইবেলে এই সংখ্যাকে অবিশ্বাস্যভাবে বেশি করে দেখানো হয়েছে (বলা হয়েছে, পুরুষ ছিল ৬,০০,০০০ জন এবং তাদের পরিবারবর্গ মিলে মোট ইহুদীদের সংখ্যা ছিল ২০ লক্ষাধিক)।
–সমুদ্রে ডুবে মারা যাওয়ার পর ফেরাউনের লাশ যে উদ্ধার করা হয়েছিল, বাইবেলে সে সম্পর্কে কিছুই বলা হয়নি।
আলোচ্য ঘটনার বিশ্লেষণের বেলায় উল্লিখিত পার্থক্যগুলো অবশ্যই আমাদের মনে রাখতে হবে। কেননা, পার্থক্যের পাশাপাশি এই বিষয়ে উভয় ধর্মগ্রন্থের বর্ণনায় কিছু কিছু মিলও রয়েছে। যেমন :
–ফেরাউন যে হযরত মুসার অনুসারী ইহুদীদের উপর উৎপীড়ন চালাত, কোরআন তা সমর্থন করছে।
–উভয় ধর্মগ্রন্থে তৎকালীন কোনো মিসরীয় শাসকের অর্থাৎ ফেরাউনের আসল নামের কোনো উল্লেখ নেই।
–ইহুদীদের মিসরত্যাগের সময় যে ফেরাউন ডুবে মারা গিয়েছিল, কোরআনের বর্ণনায় তার সমর্থন রয়েছে।
০৭. ধর্মগ্রন্থের বর্ণনা : আধুনিক তথ্যজ্ঞান
বাইবেল এবং কোরআনে ইহুদীরা মিসরে যেভাবে দিন গুজরান করত এবং যে পথে তারা মিসর ত্যাগ করেছিল সে বিষয়ে যে তথ্যাবলী পাওয়া যাচ্ছে, তার সাথে আধুনিক যুগে প্রাপ্ত তথ্যজ্ঞানের তুলনামূলক বিচার-বিশ্লেষণ হতে পারে। তবে, একদিকের এই বিচার-বিশ্লেষণ বড় বেশি সমস্যার কারণ হিসেবে দেখা দেয়; আবার কোনো কোনো তথ্য এত গুরুত্বহীন যে, সে সম্পর্কে কোনো আলোচনা নিপ্রয়োজন।
বিষয়ের বিশ্লেষণ
মিসরে ইহুদীরা ও প্রকৃতপক্ষে, ভুলের তেমন কোনো ঝুঁকি না নিয়েই বলা যেতে পারে যে, ইহুদীরা মিসরে বসবাস করেছিল মোটামুটিভাবে ৪০০ অথবা ৪৩০ বছর। এটাই বাইবেলের বর্ণনা (আদিপুস্তক ১৫, ১৩ এবং যাত্রাপুস্তক ১২. ৪০)। এ বিষয়ে আদিপুস্তক ও যাত্রাপুস্তকে সময়ের যে পার্থক্য তা তেমন ধর্তব্যের মধ্যে পড়ে না। ইহুদীদের মিসরে বসবাসের সূচনা ঘটে হযরত ইবরাহীমের অনেক পরে, যখন হযরত ইয়াকুবের পুত্র হযরত ইউসুফ ভাইদের সাথে নিয়ে মিসর গিয়েছিলেন সেই সময় থেকে। কোরআনে ইহুদীদের মিসরে যাওয়ার কথাই শুধু উল্লেখ রয়েছে। তবে সেখানে তারা কত বছর বসবাস করেছিল, সে বিষয়ে কিছু উল্লেখ নেই। বাইবেলে প্রদত্ত সময়ের উদ্ধৃত করা হয়েছে। তদুপরি, তেমন কোনো আর তথ্য-পরিসংখ্যান নেই যার মাধ্যমে এ বিষয়ে আরো কিছু আলোকপাত করা যেতে পারে।
গবেষকগণ মনে করেন, হযরত ইউসুফ ও তার ভাইদের মিসর যাওয়া এবং হাইকসস্ রাজবংশের মিসর অধিকারের ঘটনা খুব সম্ভব একই সময়ের। কেননা, খ্রিস্টপূর্ব সপ্তদশ শতকে একজন হাইকসস্ নরপতি সম্ভবত হযরত ইউসুফ ও তাঁর ভাইদের নীল-বদ্বীপের আভারিস নামক স্থানে স্বাগত জানিয়েছিলেন।
সন্দেহ নেই যে, উপযুক্ত ভাষ্যকারদের এই ধারণা বাইবেলের বর্ণনার বিপরীত। কেননা, বাইবেলে বলা হয়েছে (রাজাবলি : ১, ৬, ১) ইহুদীদের মিসরত্যাগের ঘটনা ঘটেছিল হায়কলে সোলায়মান (খ্রিস্টপূর্ব ৯৭১ সালের দিকে) নির্মাণের ৪৮০ বছর আগে। এ হিসেব থেকে পাওয়া যায়, ইহুদীদের মিসরত্যাগের ঘটনা ঘটেছিল মোটামুটিভাবে খ্রিস্টপূর্ব ১৪৫০ অব্দে। হিসেব অনুসারে ইহুদীদের মিসরে বসবাস শুরুর সময়টা দাঁড়ায় খ্রিস্টপূর্ব ১৮৮০ থেকে ১৮৫০ অব্দের দিকে। পক্ষান্তরে, ধারণা করে আসা হচ্ছে যে, তখন হযরত ইবরাহীম জীবিত ছিলেন।
বাইবেলের অন্য বর্ণনা থেকে অবশ্য জানা যাচ্ছে যে, হযরত ইউসুফ থেকে হযরত ইবরাহীমের সময়ের ব্যবধান ছিল ২৫০ বছর। এই পরবর্তী হিসেব যদি সত্য হয়, তাহলে সময়ানুক্রমের বিচারে বাইবেলেরই রাজাবলি-১ অধ্যায়ে বর্ণিত হিসেব অগ্রহণযোগ্য হয়ে পড়ে।
দেখা যায়, রাজাবলি–১-এর তথ্য কিভাবে বাইবেলের অন্যস্থানে বর্ণিত তথ্যকে নাকচ করে দিচ্ছে। সুতরাং, দেখা যাচ্ছে, এই আলোচনার উদ্দেশ্য বাস্তবে বাধাগ্রস্ত করছে। অন্যকিছু নয়, বরং বাইবেলে বর্ণিত এমনিধারার এলোমেলো ও অসঠিক সময়-গণনার হিসেব।
