বাইবেলে বাড়তি যেসব গজবের কথা বলা হয়েছে (যেমন—ডাঁশ, পতঙ্গ, মাছি, ফোঁড়া, শিলাবৃষ্টি, অন্ধকার, প্রথম সন্তানের মৃত্যু ও গবাদিপশুর মৃত্যু) সেসবের উৎস কিন্তু উপরোল্লিখিত রক্ত-বন্যার মতই বিস্ময়কর। মূলত, যে বিভিন্ন উৎস থেকে রচনা নিয়ে বাইবেল সংকলিত হয়েছিল এ ধরনের বিবরণ এসেছে সেইসব বিভিন্নমুখী রচনা থেকেই।
যে পথে মিসরত্যাগ
ইহুদীরা কোন পথে মিসর ত্যাগ করেছিল, কোরআনে তার কোনো উল্লেখ নেই। পক্ষান্তরে, বাইবেলে এ সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ লিপিবদ্ধ রয়েছে। হালে, ফাদার ডি ভক্স এবং পি. মতেঁ নতুন করে এই বিষয়টার উপরে গবেষণা চালিয়েছেন। ইহুদীরা খুব সম্ভব মিসরের তানিস-কানতির এলাকা থেকে যাত্রা শুরু করেছিল। কিন্তু বাইবেলে যা বলা হয়েছে–তার সমর্থনে কোনোরূপ চিহ্ন বা নিদর্শন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তাছাড়া, সমুদ্রের পানি ঠিক কোন স্থানটিতে দু’ভাগ হয়ে হযরত মুসা ও তাঁর সঙ্গীদের পথ করে দিয়েছিল, তাও নির্দিষ্ট করে বলা অসম্ভব।
সমুদ্রের পানির অলৌকিক বিভক্তি:
কোনো কোনো আধুনিক ভাষ্যকার ইহুদীদের মিসরত্যাগের প্রাক্কালে সমুদ্রের পানি অলৌকিকভাবে দু’ভাগ হওয়ার ঘটনাকে ভিন্নভাবে বিশ্লেষণ করে থাকেন। কারো ধারণা, ঘটনাটা জোয়ার-ভাটার সাথে জড়িত : ইহুদীরা ভাটার সময় সমুদ্র পার হয়েছিল। কেউ মনে করেন, সমুদ্রের পানি নক্ষত্রালোকের কোনো আকর্ষণ বিকর্ষণে দু’ভাগ হয়ে পড়েছিল। আবার কেউ কেউ মনে করেন, দূরবর্তী কোনো এলাকায় কোনো এক আগ্নেয়গিরির প্রচণ্ড বিস্ফোরণেও সমুদ্রের পানি দুই ভাগ হতে পারে; কারণ যাই হোক, সমুদ্রের পানি যখন হ্রাস পেয়েছিল, ইহুদীরা সেই সুযোগে সমুদ্র পার হয়; আর তাদের যারা পশ্চাদ্ধাবন করেছিল, সেই মিসরীয়রা উত্তেজনার মুহূর্তে অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা না করেই সেই পথে অগ্রসর হয়েছিল আর ভেসে গিয়েছিল সমুদ্রের ফিরতি স্রোতের তোড়ে। বলা নিষ্প্রয়োজন যে, উল্লিখিত সব ক’টা কারণই অনুমানভিত্তিক।
০৮. ফেরাউনদের ইতিহাসের নিরিখ
বস্তুতপক্ষে, ফেরাউনদের ইতিহাস থেকে ইহুদীদের মিসরত্যাগের সঠিক বিবরণ লাভের সম্ভাবনা সমধিক। একটি ধারণা দীর্ঘকাল যাবত প্রচলিত রয়েছে যে, ইহুদীরা যখন মিসর ত্যাগ করেছিল, তখন যে ফেরাউন মিসরে রাজত্ব করতেন, তার আসল নাম ছিল মারনেপতাহ। তিনি ছিলেন দ্বিতীয় রামেসিসের উত্তরাধিকারী। খ্যাতনামা মিসরতত্ত্ববিদ মিঃ মাসপেরো চলতি শতকের গোড়ার দিকে তার ‘ভিজিটর্স গাইড টু দি কায়রো মিউজিয়াম’ পুস্তকে (প্রকাশ ১৯০০ খ্রিঃ) বলেন, “আলেকজান্দ্রিয়ায় প্রচলিত কাহিনী অনুসারে ইহুদীদের মিসরত্যাগকালে যে ফেরাউন মিসরে রাজত্ব করতেন, তিনি হচ্ছেন খুব সম্ভব মারনেপতাহহ। বলা হয়ে থাকে, তিনি ওই ঘটনায় লোহিত সাগরে ডুবে মারা গিয়েছিলেন।” মিঃ মাসপেরো কোন দলিল-প্রমাণের ভিত্তিতে যে এই অভিমত সাব্যস্ত করে গেছেন, অনেক চেষ্টা-চরিত্র করেও ড. মরিস বুকাইলি তা উদ্ধার করতে পারেননি। কিন্তু, তার মত সুপ্রসিদ্ধ ভাষ্যকারের এই অভিমত, এই গবেষণার বিষয়ে সর্বাধিক গুরুত্বের দাবিদার হয়ে রয়েছে।
পি. মতেঁ ছাড়া খুব কমসংখ্যক মিসরীয়বিদ ও বাইবেল বিশেষজ্ঞ রয়েছেন, যারা মিঃ মাসপেয়োর উল্লিখিত বক্তব্যের পক্ষে কিংবা বিপক্ষে গবেষণা চালিয়েছেন। এদিকে গত কয়েক দশক ধরে বিভিন্ন গবেষকের মধ্যে ধর্মগ্রন্থের যে-কোনো বক্তব্যকে সত্য বলে সাব্যস্ত করতে গিয়ে বিভিন্ন ধারণা গড়ে তোলার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তবে এও লক্ষণীয় যে, ওইসব গবেষক-উদ্ভাবক একইসঙ্গে ধর্মগ্রন্থের অন্যদিক বা ভিন্ন বক্তব্যের ব্যাপারে মোটেও গা-গরজ করেননি। এরফলে, এই দাঁড়াচ্ছে যে, এ ধরনের উদ্ভাবিত একটি ধারণা, উপস্থিতক্ষেত্রে ধর্মগ্রন্থের কোনো একটি বক্তব্যকে হয়তো বা সাব্যস্ত করছে কিংবা সমর্থনও দিতে পারছে। কিন্তু কথা হল, ধর্মীয়-গ্রন্থে (এবং শুধু বাইবেলই একমাত্র ধর্মগ্রন্থ নয়) আরো তো অনেক তথ্য-পরিসংখ্যান রয়েছে। তাছাড়াও, রয়েছে ইতিহাসের তথ্য, স্থাপত্য, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ইত্যাদি।
যাহোক, এ সম্পর্কে এইরকম অদ্ভুত একটা ধারণা গড়ে তুলেছেন জে. দ্য মিসেলি (১৯৬০)। তাঁর এই নবউদ্ভাবিত তত্ত্ব–তাঁর নিজস্ব ধারণা মোতাবেক, সুদৃঢ় ভিত্তির উপরেই নাকি প্রতিষ্ঠিত। অবশ্য মিঃ মিসেলির উদ্ভাবিত এই তত্ত্ব সম্পর্কে এ পর্যন্ত তেমন কোনো আলোচনা হয়নি। মিসেলি দাবি করেছেন, তিনি ইহুদীদের মিসরত্যাগের সঠিক দিন-তারিখ পেয়ে গেছেন; তারিখটা হচ্ছে খ্রিস্টপূর্ব ১৪৯৫ অব্দের ৯ই এপ্রিল। ক্যালেন্ডার ও দিনপঞ্জির উপর ভিত্তি করেই নাকি মিসেলি এই দিন-তারিখ নির্ণয় করেছেন। তিনি এও দাবি করেছেন যে, মিসরে তখন রাজত্ব করছিলেন দ্বিতীয় টুথমোসিস। সুতরাং, এই দ্বিতীয় টুথমোসিসই হচ্ছেন ইহুদীদের মিসরত্যাগের সাথে সংশ্লিষ্ট সেই ফেরাউন। উল্লেখ্য, মিঃ মিসেলির এই তত্ত্ব গড়ে উঠেছে মিসর অধিপতি দ্বিতীয় টুথমোসিস, এর মমি পরীক্ষার ফলাফলের উপর। এই মমি-পরীক্ষায় দেখা গেছে যে, দ্বিতীয় টুথমোসিস-এর চামড়ায় ছিল ক্ষতচিহ্ন। উক্ত ভাষ্যকার (কেন, তার কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই) আমাদের জানিয়ে দিচ্ছেন যে, চামড়ার এই ক্ষতচিহ্নের কারণ হল কুষ্ঠরোগ। ভাষ্যকারের অভিমত, বাইবেলে মিসরবাসীদের উপর ফোঁড়ার যে গজব নাজিল হয়েছিল, তা সেই কুষ্ঠরোগ ছাড়া আর কিছু নয়।
