“তিনি সুফ সাগরকে (হিব্রু ভাষায়–ইয়াম সুফ, ইংরেজিতে রাশ, বাংলায় নলখাগড়া) দ্বিভাগ করিলেন… এবং তাহার মধ্যেদিয়ে ইস্রায়েলকে পার করিলেন… কিন্তু ফেরাউন ও তাহার বাহিনীকে সুফ সাগরে ঠেলিয়া দিলেন।”
সুতরাং, বাইবেলের মতে, ইহুদীদের পশ্চাদ্ধাবনকারী ফেরাউন যে সমুদ্রগর্ভে নিমজ্জিত হল, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু, পরে ফেরাউনের লাশের কি হল, বাইবেলে সে সম্পর্কে কিছু নেই।
কোরআনের বর্ণনা : ইহুদীদের মিসরত্যাগ-সংক্রান্ত কোরআনের বর্ণনা বৃহত্তর পরিসরে বাইবেলের অনুরূপ। তবে, কোরআনের বর্ণনাগুলো সাজিয়ে গুছিয়ে নিতে হয়, কেননা, সেসব বর্ণনা গোটা কিতাবে রয়েছে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে।
বাইবেলের মত কোরআনেও মিসররাজ ফেরাউনের এমন কোনো নাম উল্লেখ নেই যা দিয়ে ইহুদীদের মিসরতাগের প্রাক্কালে কোন ফেরাউন মিসরে রাজত্ব করতেন, তা নির্দিষ্ট করা আমাদের পক্ষে সম্ভব। কোরআনের বর্ণনা থেকে শুধু এতটুকু জানা যাচ্ছে, তৎকালীন ফেরাউনের হামান’ নামে একজন উপদেষ্টা ছিলেন। কোরআনে এই হামানের নাম ছয়বার উল্লেখ করা হয়েছে। (১৮ নং সূরার ৬, ৮ ও ৩৮ নং আয়াত, ২৯ নং সূরার ৩৯ নং আয়াত এবং ৪০ নং সূরার ২৪ ও ৩৬ নং আয়াতে)।
কোরআনের মতে, ফেরাউন ছিলেন ইহুদী-উৎপীড়ক :
“যখন মুসা তাঁহার লোকজনদের বললেন : স্মরণ কর, আল্লাহর সেই অনুগ্রহ–তোমাদের প্রতি। এই অনুগ্রহ তিনি দিয়েছিলেন ফেরাউনের লোকজনের হাত থেকে তোমাদের মুক্ত করতে। তারা তোমাদের উপর নিদারুণ নিপীড়ন চালাতো; তোমাদের পুত্রসন্তানদের হত্যা করতে এবং জীবিত রাখতো তোমাদের মহিলাদের।”-সূরা ১৪, আয়াত ৬।
একই ভাষায় এই ফেরাউনী নিপীড়নের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়েছে ৭ নং সূরার ১৪১ নং আয়াতে। কোরআনে অবশ্য বাইবেলের মত বন্দী ইহুদীদের দ্বারা দুটি শহর নির্মাণের কথা নেই।
শিশু মুসা নবীকে যখন নদীর তীরে রেখে আসা হয়েছিল, সে কাহিনী কোরআনের ২০ নং সূরার ৩৯-৪০ নং আয়াতে এবং ২৮ নং সূরার ৭ থেকে ১৩ নং আয়াতে বর্ণিত আছে। কোরআনের বর্ণনামতে, শিশুনবী মুসাকে গ্রহণ করেছিলেন ফেরাউনের পরিবার। এ বিষয়ে ২৯ নং সূরার ৮ ও ৯ নং আয়াতে বলা হয়েছে :
“ফেরাউনের পরিবার তাহাকে তুলিয়া লইল। (ইহাই ছিল অভিপ্রায়) যে (মুসা) তাহাদের বিরুদ্ধবাদী হইবে এবং তাহাদিগকে আজাবে ফেলিবে। ফেরাউন, হামান এবং তাহাদের লোকজনেরা ছিল পাপাচারী। ফেরাউনের স্ত্রী কহিলেন, (সে হইবে) চোখের আনন্দ আমার ও তোমার জন্য। তাহাকে হত্যা করিও না। সে আমাদের কাজে লাগিতে পারে; অথবা আমরা তাহাকে পুত্র হিসেবেও গ্রহণ করিতে পারি। তাহারা ধারণা করিতে পারে নাই (সামনে কি হইবে)।”
মুসলিম সমাজে প্রচলিত কাহিনী থেকে জানা যায়, ফেরাউনের স্ত্রী বিবি আছিয়া শিশুনবী মুসাকে লালন-পালন করেছিলেন। কোরআনের মতে, ফেরাউনের পরিবারের লোকজন মুসা নবীকে কুড়িয়ে পেয়েছিল।
হযরত মুসার যৌবনকাল, মাদিয়ানে তার অবস্থান এবং তার বিবাহ-সংক্রান্ত বর্ণনা রয়েছে কোরআনের ২৮ নং সূরার ১৩ থেকে ২৮ নং আয়াতে। বিশেষত ‘প্রজ্বলিত ঝোঁপ-সংক্রান্ত বর্ণনা দেখা যায় ২০ নং সূরার প্রথম রুকুতে এবং ২৮ নং সুরার ৩০ থেকে ৩৫ নং আয়াতে। যদিও কোরআনে বাইবেলের মত দীর্ঘ বর্ণনা দিয়ে বলা হয়নি যে, আল্লাহ্ গজব হিসেবে মিসরে দশ ধরনের প্লেগ নাজিল হয়েছিল। কোরআনে সংক্ষিপ্তাকারে মাত্র পাঁচ ধরনের প্লেগের কথা বর্ণিত হয়েছে। (সূরা ৭, আয়াত ১৩৩) যথা : বন্যা, পতঙ্গ, উকুন, ব্যাঙ এবং রক্ত।
কোরআনেও মিসর থেকে ইহুদীদের পালিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। যেমনটি বাইবেলে রয়েছে। তাদের পলায়নপথের কোনো বিবরণ সেখানে নেই কিংবা নেই পলায়নপর ইহুদীদের সংখ্যাও। এটা ধারণা করা সত্যি মুশকিল যে, কিভাবে ৬ লক্ষ মানুষ এবং তাদের পরিবারবর্গ এত দীর্ঘসময় ধরে মরুভূমিতে অবস্থান করছিল। অথচ, বাইবেল সেকথাই বিশ্বাস করতে বলছে। ইহুদীদের পশ্চাদ্ধাবনকারী ফেরাউনের মৃত্যু কিভাবে ঘটেছিল, কোরআনে তার বর্ণনা নিম্নরূপঃ
“ফেরাউন তাহাদের ধাওয়া করিতেছিল নিজের লোকলশকরসহ এবং সমুদ্র তাহাদের ঢাকিয়া ফেলিল।”সূরা ২০, আয়াত ৭৮।
এভাবে ইহুদীরা রক্ষা পেল, ধ্বংস হয়ে গেল ফেরাউন। কিন্তু তার মৃতদেহটা পাওয়া গেল : অতি গুরুত্বপূর্ণ এই ঘটনার কোনো বর্ণনা কিন্তু বাইবেলে নেই।
“আমরা পার করাইয়া নিলাম বনী ইসরাইলকে সমুদ্রের মধ্যদিয়া। ফেরাউন ও তাহার লোকলশকর তাহাদিগকে ধাওয়া করিতেছিল–বিদ্রোহ ও আক্রোশবশত–শেষপর্যন্ত যখন সে ডুবিয়া যাইতে বসিল, বলিল : আমি ঈমান আনিলাম আর কোনো মাবুদ নাই সেই আল্লাহ্ ছাড়া যাহার উপরে বনী ইসরাইল বিশ্বাসী। আমিও তাহাদের শামিল–যাহারা তাহার প্রতি আত্মসমর্পণকারী। –সূরা ১০, আয়াত ৯০ থেকে ৯২।
“আল্লাহ্ বলিলেন, কি? তুমি বিদ্রোহ করিয়াছ, নীতিভ্রষ্টতার কারণ হইয়াছ। এখন আমরা তোমাকে টিকাইয়া রাখিব তোমার লাশের মাধ্যমে। যাহাতে তুমি নিদর্শন হইতে পার তাহাদের জন্য যাহারা তোমার পরে আসিবে। তবে, নিশ্চয় মানবজাতির অনেকেই আমার নিদর্শনাবলী সম্পর্কে গাফেল।”
এই বক্তব্যের দুইটি বিষয় ব্যাখ্যার দাবিদার :
(ক) ফেরাউনের বিদ্রোহ ও শক্রতার যে কথাটা এখানে বলা হয়েছে, তা বুঝতে হবে হযরত মুসা কর্তৃক ফেরাউনকে সৎপথে ফেরাবার প্রয়াস-প্রচেষ্টার পরিপ্রেক্ষিতে; এবং
