বাইবেলের বর্ণনা : বাইবেলে ইহুদীদের মিসরত্যাগের ঘটনার বর্ণনা শুরু হয়েছে হযরত ইয়াকুবের মিসরে প্রবেশের ঘটনা স্মরণ করিয়ে দেয়ার মাধ্যমে। হযরত ইয়াকুব সেখানে হযরত ইউসুফের সাথে মিলিত হন। এরপর বাইবেলের যাত্রাপুস্তকের ১, ৮-এর বর্ণনা অনুসারে।
“পরে মিসরের উপরে এক নতুন রাজা উঠিলেন, যিনি যোসেফকে (হযরত ইউসুফ) জানিতেন না।”
এরপর চলল, নির্যাতনের পালা। ফেরাউন ইহুদীদের দুটি নগরী পিথম ও রামিষেষ নির্মাণের নির্দেশ দিলেন। বাইবেলে এই দুটি নগরীর এই নামই রয়েছে। যাত্রাপুস্তক ১, ১১) ইহুদীদের বংশবৃদ্ধি ঠেকানোর উদ্দেশ্যে ফেরাউন নির্দেশ দিলেন যে, তাদের প্রতিটি নবজাতক পুত্রসন্তানকে নদীতে নিক্ষেপ করতে হবে। এতদসত্তেও, হযরত মুসাকে তার মা মাস তিনেক লুকিয়ে রাখতে পেরেছিলেন। পরে উপায়ান্তর না দেখে তিনি শিশু মুসাকে একটি নলখাগড়ার ঝুড়িতে ভরে নদীর কিনারে রেখে এলেন। ফেরাউনের কন্যা সেখানে ওই শিশুকে দেখতে পেলেন। সেখান থেকে শিশু মুসাকে নিয়ে এসে এক ধাত্রীর কাছে রাখতে দেয়া হল : সে ধাত্রী অন্য কেউ নয়, শিশু মুসার নিজের মা। এটা এই কারণে সম্ভব হয়েছিল যে, নদীর তীরে রাখা শিশুটির ভাগ্যে শেষপর্যন্ত কি ঘটে, তা গোপনে হযরত মুসার বোন দেখছিলেন। ফেরাউনের কন্যা যখন শিশু মুসাকে উদ্ধার করেন, তখন সেই বোন শিশুটিকে না চেনার ভান করে রাজকন্যাকে এক ধাত্রীর সন্ধান দেন, যিনি আসলে হযরত মুসার মা। সেই থেকে হযরত মুসা ফেরাউনের সন্তান হিসেবেই বেড়ে উঠতে থাকেন। তাঁর নাম রাখা হয় মুসা (ইংরেজি বাইবেলে মোজেস, বাংলা বাইবেলে মোশি)।
যৌবনে হযরত মুসা অন্য এক দেশে চলে যান, দেশটির নাম মাদিয়ান (বাইবেলে মিদিয়ন)। সেখানে তিনি বিবাহ করেন এবং দীর্ঘকাল অবস্থান করেন। বাইবেলে এ বিষয়ে বিশদ বর্ণনা রয়েছে। এরপর, যাত্রাপুস্তকে বলা হয়েছে (২, ২৩) : “অনেক দিন পরে মিসররাজের মৃত্যু হইল।
তখনই আল্লাহ্ হযরত মুসাকে ফেরাউনের কাছে যাওয়ার এবং তার ভাইদের (ইহুদীদের) মিসর থেকে বের করে নিয়ে আসার নির্দেশ দিলেন, (এই নির্দেশদানের ঘটনাটি ঘটে প্রজ্বলিত ঝোঁপের ঘটনার মধ্যে)। আল্লাহর সেই নির্দেশ এ কাজে হযরত মুসাকে তার ভাই হযরত হারুনের সাহায্য করার কথা ছিল। সে কারণে হযরত মুসা মিসরে ফিরেই তাঁর ভাইকে সাথে নিয়ে ফেরাউনের কাছে গেলেন। এই ফেরাউন ছিলেন সাবেক সেই ফেরাউনের স্থলাভিষিক্ত, যে ফেরাউনের সময় হযরত মুসা জন্মগ্রহণ করেন।
ফেরাউন ইহুদীদের মুসার সাথে মিসর ত্যাগ করতে দিতে রাজি হলেন না। আল্লাহ্ পুনরায় হযরত মুসাকে দেখা দিলেন এবং মুসাকে নির্দেশ দিলেন হযরত মুসা যেন আবারও ফেরাউনকে অনুরোধ জানায়। বাইবেলের মতে, তখন হযরত মুসার বয়স ছিল আশি বছর। অলৌকিক কার্যকলাপের মাধ্যমে হযরত মুসা ফেরাউনকে জানিয়ে দেন যে, তিনি অতিপ্রাকৃতিক ক্ষমতার অধিকারী। কিন্তু তাতেও কোনো কাজ না হওয়ায় আল্লাহ্ মিসরের উপর গ্লেগের গজব নাজিল করেন। সমস্ত নদীর পানি রক্তে পরিণত হয়। এরপর প্রাদুর্ভাব ঘটে ব্যাঙ, পতঙ্গ ও উঁশ মাছির। গবাদিপশুগুলো মারা যেতে থাকে; মারাত্মক ধরনের ফোঁড়া দেখা দেয়, মানুষজন ও জন্তু-জানোয়ারের দেহে। অবিরাম শিলাবৃষ্টি শুরু হয়ে যায়। দেখা দেয়, পঙ্গপালের আক্রমণ। অন্ধকার নেমে আসে গোটা মিসরের বুকে। প্রতিটি পরিবারের প্রথম সন্তান মৃত্যুমুখে পতিত হতে শুরু করে। কিন্তু এতকিছুর পরেও ফেরাউন ইহুদীদের মিসর ত্যাগ করতে দিতে রাজি হলেন না।
এরপর ইহুদীরা ‘রামিষেষ নগরী’ থেকে জোট বেঁধে একযোগে বেরিয়ে পড়ে (যাত্রাপুস্তক ১২, ৩৭)। “মহিলা ও শিশুদের ছাড়াই তাদের সংখ্যা ছিল ৬,০০,০০০। এই পর্যায়ে ফেরাউন “আপন রথ প্রস্তুত করাইলেন ও আপন লোকদের সঙ্গে লইলেন।… মিসররাজ ফেরাউন … ইস্রায়েল সন্তানদের পিছু পিছু ধাবমান হইলেন, তখন ইস্রায়েল-সন্তানেরা উর্বহস্তে বহির্গমন করিতেছিল।” (যাত্রাপুস্তক ১৪, ৬ এবং ৮)।
মিসরীয়রা সমুদ্রের পাড়ে হযরত মুসার লোকজনদেরকে ধরে ফেলার উপক্রম করল। হযরত মুসা তাঁর লাঠি তুলে ধরে নির্দেশ দিলেন সমুদ্র দু’ভাগ হয়ে গেল। তাঁর অনুসারীরা হেঁটে সমুদ্র অতিক্রম করল। তাদের পা পর্যন্ত ভিজল না।
“পরে মিস্রীয়েরা, ফেরাউনের সকল অশ্ব ও রথ, এবং অশ্বারূঢ়গণ ধাবমান হইয়া তাহাদের পশ্চাৎ পশ্চাৎ সমুদ্রে প্রবেশ করিল।” (যাত্রাপুস্তক ১৪, ২৩)।
“জল ফিরিয়া আসিল ও তাহাদের রথ ও অশ্বারূঢ়দিগকে আচ্ছাদন করিল। তাহাতে ফেরাউনের সে-সকল সৈন্য তাহাদের একজনও অবশিষ্ট রহিল না। কিন্তু ইস্রায়েল-সন্তানেরা শুষ্ক পথে সমুদ্রের মধ্য দিয়া চলিল, এবং তাহাদের দক্ষিণে ও বামে জল প্রাচীরস্বরূপ হইল।” (যাত্রাপুস্তক ১৪, ২৮-২৯)
যাত্রাপুস্তকের এই বর্ণনা খুবই স্পষ্ট : যারা ইহুদীদের তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছিল, তাহাদের পুরোভাগে ছিল স্বয়ং ফেরাউন। সুতরাং, এই ধ্বংসলীলায় ফেরাউনও ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। যাত্রাপুস্তকে বলা হয়েছে, “তাহাদের একজনও অবশিষ্ট রহিল না।” বাইবেলের গীত-সংহিতায় (সাম) এই ঘটনা পুনরায় বিশদভাবে বর্ণিত হয়েছে। যথা : গীত-সংহিতা ১০৬, বাণী ১১; ১৩৬ বাণী ১৩ ও ১৫। এগুলো হচ্ছে, আল্লাহর উদ্দেশ্যে শোকরিয়া-জ্ঞাপনের গীত :
