সংশোধিত জেহোভিস্ট বর্ণনানুসারে (আদিপুস্তক ৭,৮) নৌকায় গ্রহণ করা হয়েছিল পবিত্র-অপবিত্র নির্বিশেষে প্রতিটি প্রজাতির মাত্র এক জোড়া করে।
পক্ষান্তরে, বাইবেলেরই সেকেরডোটাল বর্ণনায় রয়েছে, নৌকায় ছিলেন হযরত নূহ্ ও তাঁর পরিবারবর্গ (কেউ বাদ যায়নি)। আর সেই নৌকায় গ্রহণ করা হয়েছিল প্রত্যেক প্রজাতি থেকে এক জোড়া করে।
মহাপ্লাবনের ধারণা কি ছিল সে সম্পর্কে বর্ণনা রয়েছে কোরআনের ১১ নং সূরার ২৫ থেকে ৪৯ নং এবং ২৩ থেকে ৩০ নং আয়াতে। কোরআনের এই বর্ণনার সাথে বাইবেলের মহাপ্লবনের ধরন-সংক্রান্ত বর্ণনার তেমন কোনো পার্থক্য নেই যা উল্লেখ করার মত।
বাইবেলের বর্ণনামতে, হযরত নূহের নৌকা আরারাত পর্বতমালায় গিয়ে ঠেকেছিল (আদিপুস্তক ৮, ৪) আর কোরআনে বলা হয়েছে, পর্বতটি হচ্ছে ‘জুদি’ (সূরা ১১, আয়াত ৪৪)। উল্লেখ্য যে, এই জুদি পর্বত হচ্ছে আরমেনিয়াস্থ আরারাত পর্বতমালার মধ্যে সর্বোচ্চ। তবে, দুই ধর্মগ্রন্থের বর্ণনার সাথে সঙ্গতি রাখার বাসনায়-পরবর্তীকালের লোকেরা যে ওই পর্বতমালা ও পর্বতটির নাম বদলে দেয়নি, সে সম্পর্কে নিশ্চিত করে কিছু বলা যায় না। আর ব্লাশার রচনাতেও একথার প্রমাণ মেলে। তাঁর মতে, আরব দেশেও ‘জুদি’ নামে একটি পর্বতশৃঙ্গ রয়েছে। নামের এই মিল দেখে ধারণা করা হয়, আরবের পর্বতশৃঙ্গের ওই নামটি পরে প্রদত্ত।
এ প্রসঙ্গে বলা যায়, এই মহাপ্লাবনের ব্যাপারে বাইবেল ও কোরআনের বর্ণনায় কি ধরনের প্রধান প্রধান পার্থক্য বিদ্যমান, তা স্পষ্ট করে বলে দেয়া সম্ভব। যদিও এখনপর্যন্ত কোনো কোনো বিষয়ে সুস্পষ্ট তথ্য-প্রমাণ না পাওয়ার কারণে এই পার্থক্যের চুলচেরা বিচার-বিশ্লেষণ সম্ভবত অসম্ভব। তবে, ইতিমধ্যে যেসব প্রতিষ্ঠিত তথ্য ও প্রমাণ আমাদের নাগালের মধ্যে রয়েছে এবং বিভিন্ন আবিষ্কার আধুনিক জ্ঞানভাণ্ডারকে যেভাবে সমৃদ্ধ করেছে, তার আলোকে বলা যায় যে, বাইবেলের বর্ণনা বিশেষত মহাপ্লাবনের সময়কাল ও তার ভৌগোলিক ব্যাপ্তি-সম্পর্কিত বক্তব্য আদৌ সত্যের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। পক্ষান্তরে, মহাপ্লাবন সম্পর্কিত কোরআনের বর্ণনায় এমনকিছু নেই যা নিরপেক্ষ বিচারে বিরোধিতা বা সমালোচনার যোগ্য।
যদিও, এখানে একটি প্রশ্ন ওঠতে পারে, মহাপ্লাবন-সংক্রান্ত বাইবেলের বিবরণের প্রচারকাল ও কোরআন অবতীর্ণ হওয়ার সময়কালের মধ্যে ব্যবধান যখন প্রচুর, তখন এমনো তো হতে পারে যে, সে সময়ের মধ্যে মানুষ বেশ কিছু প্রমাণ ও তথ্যজ্ঞান আহরণ করেছিল এবং সেইসব তথ্য ও প্রমাণ মহাপ্লাবনের ঘটনার উপরে নতুন করে আলোকসম্পাত করেছিল। (আর সেই আলোকেই রচিত হয়েছিল কোরআনের মহাপ্লাবন-সংক্রান্ত কাহিনী)। এ প্রশ্নের জবাব একটিই, আর তা হল, না। কেননা, বাইবেলের পুরাতন নিয়মের কাল থেকে কোরআন অবতীর্ণ হওয়া পর্যন্ত যে সময়টা, সে মুদ্দতে মহাপ্লাবনের এই সুপ্রাচীন কাহিনীর সত্যতার ব্যাপারে মানবজাতির নিকট শুধু একটি দলিলই প্রমাণ হিসেবে বিদ্যমান ছিল, আর তা হল, খোদ এই বাইবেলটি।
সুতরাং, একদিকে মহাপ্লাবন-সংক্রান্ত আধুনিক তথ্যজ্ঞানের সাথে কোরআনের বর্ণনায় এই যে সামঞ্জস্য এবং অন্যদিকে সেই সামঞ্জস্য-বিধানের ব্যাপারে মানুষের হস্তক্ষেপ বা ভূমিকার কোনো প্রমাণ না-থাকায় মহাপ্লাবনের প্রশ্নে কোরআনের সেই বক্তব্যের সঠিকত্বের ব্যাপারে অপর ব্যাখ্যাটি গ্রহণ করতেই হয়। বলা অনাবশ্যক যে, সেই অপর ব্যাখ্যাটি হল এই : “একদা বাইবেল ছিল প্রত্যাদেশপ্রাপ্ত আসমানী কিতাব। কিন্তু সময়ে বাইবেলের বাণীসমূহ মানুষের হস্তক্ষেপে বিকৃত হয়ে পড়ে। তারপর অবতীর্ণ হয় আরেকটি প্রত্যাদেশপূর্ণ ধর্মগ্রন্থ : কোরআন।”
০৬. ইহুদীদের মিসরত্যাগ
হযরত মুসা এবং তাঁর অনুসারীদের মিসরত্যাগের ঘটনাটি ঐতিহাসিক যেকোনো বিচারে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা। প্রথমপর্যায়ে তারা গিয়েছিলেন কেনানে। ঘটনাটি ঐতিহাসিক এবং এ ঘটনা কমবেশি সবার জানা। যদিও এ ঘটনা নিয়ে মাঝেমধ্যে অভিযোগ উঠতে দেখা যায়, ইতিহাসের চেয়ে এ ঘটনায় উপকথার ভাগই বেশি।
বাইবেলের পুরাতন নিয়মের বর্ণনায় দেখা যায়, ইহুদীদের মিসরত্যাগের এই ঘটনাকে অবলম্বন করে রচিত হয়েছে পেন্টাটেক বা তাওরাতের দ্বিতীয় পুস্তকখানি। এতে আরো স্থান পেয়েছে–ইহুদীদের নিরুদ্দিষ্টভাবে ঘুরে বেড়ানোর কাহিনী ও তাদের নিজেদের মধ্যে রাষ্ট্র-সংঘ গঠন (চুক্তি) কাহিনী। এবং এই কাহিনী শেষ হয়েছে সিনাই পর্বতে হযরত মুসা কর্তৃক আল্লাহর দিদার বা দর্শনপ্রাপ্তির বর্ণনার মাধ্যমে।
স্বাভাবিককারণেই এই ঐতিহাসিক বিষয়টি নিয়ে কোরআনেও বিশদ আলোচনা স্থান পেয়েছে। ফেরাউনের সাথে হযরত মূসা ও তাঁর ভাই হযরত হারুনের আলোচনা এবং ইহুদীদের মিসরত্যাগের ঘটনাবলী নিয়ে দীর্ঘ বর্ণনা রয়েছে কোরআনের দশটিরও বেশি সূরায় : তন্মধ্যে ৭, ১০, ২০ ও ২৬ নং সূরা সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। অপরাপর সূরার মধ্যে কোনোটিতে রয়েছে সংক্ষিপ্ত বর্ণনা। আর কোনো কোনোটাতে এই ঘটনাগুলো শুধু স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়েছে। মিসরীয়দের পক্ষে এই ঘটনায় যিনি প্রধান ভূমিকা পালন করেছিলেন তাঁর উপাধি ছিল ফেরাউন : এই নামটি (যতদূর সম্ভব ড. মরিস বুকাইলির জানামতে) কোরআনের ২৭টি সূরায় চুয়াত্তর বার উল্লেখ করা হয়েছে। এই ঘটনাটি সম্পর্কে বাইবেল ও কোরআনের যে বর্ণনা, তার তুলনামূলক আলোচনা খুবই কৌতূহলোদ্দীপক। উদাহরণস্বরূপ, শুধু মাহপ্লাবনের বর্ণনায় এই দুই ধর্মগ্রন্থের গরমিল যে কত বেশি, তা ইতিমধ্যে জানা হয়েছে। অথচ, ইহুদীদের মিসরত্যাগের কাহিনীতে উভয় ধর্মগ্রন্থের বর্ণনায় বহুবিষয়ে মিল দেখা যায়, গরমিল যে একেবারে নেই তা নয়। তবে, এটা একক্ষেত্রেই দেখা যায়, বাইবেলের বর্ণনার মধ্যেও রয়েছে ঐতিহাসিক গুরুত্ব। উল্লেখ্য যে, বাইবেলের বর্ণনা থেকেই আমরা ফেরাউনের বরং বলা চলে দু’জন ফেরাউনের পরিচয় লাভ করেছি। এই যে দু’জন ফেরাউনের অস্তিত্ব, এ ধারণার সূচনা ঘটেছে বাইবেলের বর্ণনা থেকেই। আর কোরআনে বর্ণিত তথ্যের আলোকে সে ধারণা মোটামুটিভাবে সাব্যস্ত হয়ে যাচ্ছে। এদিকে, হালে আবিস্কৃত নানা আধুনিক তথ্য ও প্রমাণ এই দুই ধর্মগ্রন্থে বর্ণিত এই ঘটনার উপর নতুন করে আলোকসম্পাত করতেও সক্ষম হয়েছে। আর এভাবেই বাইবেল, কোরআন ও আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের সম্মিলিত অবদানে ধর্মীয় গ্রন্থে বর্ণিত একটি কাহিনীকে আজ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে দাঁড় করানো সম্ভব।
