মহাপ্লাবন সম্পর্কে কোরআনে যে বর্ণনা রয়েছে, তা বাইবেলের বিবরণ থেকে শুধু পৃথকই নয়, ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণের বিচারেও মহাপ্লাবন-সংক্রান্ত কোরআনের এই বর্ণনার বিরোধিতা ও সমালোচনা করার ক্ষেত্র এবং অবকাশ নেই।
কোরআনে মহাপাবনের ধারাবাহিক কোনো বিবরণ নেই। বিভিন্ন সুরায় এ সম্পর্কে বলা হয়েছে, এই মহাপ্লাবনের মাধ্যমে নূহের জাতির উপর গজব নেমে এসেছিল। এ বিষয়ে একটা পূর্ণাঙ্গ বর্ণনা পাওয়া যায় কোরআনের ১১ নং সূরার ২৫ থেকে ৪৯ নং আয়াতে। কোরআনের ৭১ নং যে সূরাটি সূরা নূহ নামে পরিচিত, তাতে হযরত নূহের ধর্মপ্রচারের কথাই বেশি করে বয়ান করা হয়েছে। ২৬ নং সূরার ১০৫ থেকে ১১৫ নং আয়াতের বর্ণনাও একইধরনের। যাহোক, কোরআনের বর্ণনানুসারে সেই মহাপ্লাবনে কি ঘটেছিল, সে আলোচনায় যাওয়ার আগে প্রথমেই বিবেচনা করে দেখা প্রয়োজন, কি কারণে এই মহাপ্লাবন হয়েছিল। কোরআনের মতে, যখন কোনো জাতি বা সম্প্রদায় আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করে নিদারুণভাবে পাপাচারে লিপ্ত হয় তখন সে জাতির উপর আল্লাহর গজব নেমে আসে।
বাইবেলে বলা হচ্ছে, ধর্মীয় দিক থেকে অধঃপতিত ‘গোটা মানবজাতিকে শাস্তিপ্রদানের উদ্দেশ্যে বিশ্বব্যাপী এক মহাপ্লাবন হয়েছিল। কোরআনে সে বক্তব্যের বরং বিরোধিতাই করা হচ্ছে। কোরআনের মতে, বিশেষ বিশেষ সময় নির্দিষ্ট কিছুসংখ্যক জাতির উপরই নেমে এসেছিল বিভিন্ন ধরনের গজবঃ এমনি ধরনের এক গজব ছিল এই মহাপ্লাবন। কোরআনের ২৫ নং সূরার ৩৫ থেকে ৩৯ নং আয়াতে সে কথাটিই বলা হয়েছে এভাবে:
“আমরা দিয়েছিলাম মুসাকে কিতাব এবং নিয়োগ করেছিলাম তার ভাই হারুনকে তাহার উজির বা সাহায্যকারী। আমরা বলেছিলাম? যাও সেইসব লোকদের নিকট যাহারা অস্বীকার করেছে আমাদের নিদর্শনাবলী। আমরা ধ্বংস করেছিলাম তাদেরকে সম্পূর্ণরূপে। যখন নূহের জাতি নবীদের অস্বীকার করিল, আমরা তাদের ডুবাইয়া দিয়েছিলাম, তাদের বানিয়ে দিয়েছিলাম নিদর্শন মানবজাতির জন্য। আদ, সামুদ ও রাস-এর সঙ্গীদের এবং তাদের মধ্যবর্তী অনেকের (সম্প্রদায়গুলোকে আমরা ধ্বংস করেছিলাম)। আমরা সতর্ক করেছিলাম তাদেরকে নিদর্শনাবলীর দ্বারা এবং আমরা নির্মূল করেছি তাদের সম্পূর্ণরূপে।”
এমনিইভাবে ৭ নং সুরার ৫৯ থেকে ৯৩ নং আয়াতেও কিভাবে নৃহের জাতি, এবং আদ, সামুদ, লুত (সডোম) ও মাদিয়ান সম্প্রদায়ের উপর গজব নেমে এসেছিল তা স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়েছে।
এভাবেই কোরআন জানিয়ে দেয় যে, মহাপ্লাবনের যে ধ্বংসলীলা গজবের আকারে নেমে এসেছিল, তা বিশেষভাবে নির্ধারিত ছিল নূহের জাতির জন্য? বাইবেলের বিবরণের সাথে কোরআনের বর্ণনার মৌল পার্থক্য এখানেই।
দ্বিতীয় বুনিয়াদী তফাতটা হল, বাইবেলে যেখানে মহাপ্লাবনের সময়, তারিখ ও মেয়াদকাল উল্লেখ রয়েছে, সেখানে কোরআন এ সম্পর্কে কিছুই বলছে না, না মহাপ্লাবনের কোনো দিন-তারিখ, না তার স্থায়িত্বকাল।।
মহাপ্লাবনের কার্যকারণ সম্পর্কে উভয় ধর্মগ্রন্থের বর্ণনা মোটামুটিভাবে একইরকম। বাইবেলের সেকেরডোটাল বর্ণনায় (আদিপুস্তক ৭, ১১) মহাপ্লাবনের দুটি কারণ উল্লেখ করে বলা হয়েছে, এই কার্যকারণ দুটি একইসঙ্গে ঘটেছিল : “ওইদিন মহাজলধির সমস্ত উনুই ভাঙিয়া গেল এবং আকাশের বাতায়ন সকল মুক্ত হইল।” কোরআনে এ সম্পর্কে ৫৪ নং সূরার ১১ ও ১২ নং আয়াতে বলা হয়েছে:
“আমরা খুলিয়া দিলাম, আসমানের দরওয়াজাসমূহ অতিবর্ষণের সহিত এবং মাটিতে তীব্র প্রস্রবণ সৃষ্টি করিলাম–যেন পানি একত্রিত হইয়া হুকুম অনুযায়ী তাহা সমাধা করে যা নির্ধারিত।”
নূহের নৌকায় যা-কিছু ছিল, সে সম্পর্কে কোরআনের বক্তব্য খুবই স্পষ্ট। আল্লাহ্ হযরত নূহকে যে নির্দেশ দিয়েছিলেন, তিনি বিশ্বস্ততার সাথে তা পালন করেছিলেন। যেমন :
“(নৌকায়) প্রত্যেক জিনিসের এক জোড়া তুলিয়া নাও; তোমার পরিবারবর্গকে এই একজন বাদেযাহার বিরুদ্ধে আল্লাহর নির্দেশ জারি হইয়া গিয়াছে,এবং যাহারা বিশ্বাসী। তবে, অল্পসংখ্যক লোকজনই তাহার সহিত ঈমান আনিয়াছিল।”
যে ব্যক্তিটি হযরত নূহের পরিবার থেকে বাদ গিয়েছিল সে ছিল হযরত নূহেরই পথভ্রষ্ট সন্তান। আমরা জানি (সূরা ১১, আয়াত ৪৫ ও ৪৬), কিভাবে তার সম্পর্কে হযরত নূহের আরজি ব্যর্থ হয়েছিল : আল্লাহ্ নিজের হুকুম রদ করেননি। নূহের পরিবারবর্গ ছাড়া (অবশ্য ওই গোমরাহ্ ছেলেটি বাদ দিয়ে) আর মাত্র সামান্য কয়েকজনই ওই নৌকায় আরোহী ছিলেন, এঁরা ছিলেন আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসী।
পক্ষান্তরে, বাইবেলের বর্ণনায়, ওই নৌকার মধ্যে বিশ্বাসীগণ ছিলেন কি না সে সম্পর্কে কিছুই বলা হয়নি। আসলে, নৌকার আরোহীদের ব্যাপারে বাইবেলে মোট তিন ধরনের আলাদা আলাদা বর্ণনা পাওয়া যায়। যথা :
বাইবেলের জেহোভিস্ট বর্ণনায় পবিত্র পশু ও পাখি এবং অপবিত্র পশু পাখির মধ্যে একটি পার্থক্য টানা হয়েছে (সাত জোড়া করে অর্থাৎ প্রতিটি পবিত্র প্রজাতির মধ্য থেকে সাতটি পুরুষ ও সাতটি নারী প্রজাতি নৌকায় গ্রহণ করা হয়েছিল পবিত্র-অপবিত্র নির্বিশেষে প্রতিটি প্রজাতির মাত্র এক জোড়া করে। এখানে সাত’ শব্দের দ্বারা নিশ্চিতভাবেই বহু’ বোঝানো হয়েছে, কেননা সেকালে সেমিটিক ভাষায় অনেক সময় বহু’ বোঝাতে সাত উল্লেখ করা হত)।
