উদাহরণস্বরূপ মহাপ্লাবনের কথা উল্লেখ করা যায় সেই ভিন্নদৃষ্টির গভীরতর বিচার-বিশ্লেষণে ফাদার ডি. ভক্স বাইবেলের মহাপ্রাবনের বর্ণনা সম্পর্কে বলেছেন, “বাইবেরে মহাপ্লাবনের দুটি বর্ণনা পাওয়া যাচ্ছে। এই মহাপ্লাবনের যে মারাত্মক ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়েছে–এই বর্ণনামতে তার কারণ ছিল ভিন্ন। দুই বর্ণনায় মহাপ্লাবন কতকাল স্থায়ী হয়েছিল, সেই সময়কালও ভিন্ন। তাছাড়া, হযরত নূহ (আঃ) তাঁর নৌকায় কতটি জন্তু-জানোয়ার তুলে নিয়েছিলেন সে বিষয়ে ওই দুই বর্ণনার মধ্যে রয়েছে পার্থক্য।”
আধুনিক তথ্যজ্ঞানের আলোকে বিচার-বিশ্লেষণে বাইবেলের মহাপ্লাবন সংক্রান্ত এই বর্ণনা সম্পূর্ণভাবেই অগ্রহণযোগ্য। যথা :
(ক) বাইবেলের পুরাতন নিয়মে, এই মহাপ্লাবন সংঘটিত হয় গোটা বিশ্বব্যাপী এবং এরফলে গোটা বিশ্বে মারাত্মক ধ্বংসলীলা সাধিত হয়।
(খ) বাইবেলের জেহোভিস্ট পাঠের বর্ণনায়, মহাপ্লাবন সংঘটিত হওয়ার কোনো সময়কাল উল্লেখ নেই। কিন্তু সেকেরডোটাল পাঠে এই মহাপ্লাবন তথা বিশ্বব্যাপী এই ধ্বংসলীলা বিশেষ একটা সময়কালে সংঘটিত হয়েছিল বলা হয়েছে। অথচ, উক্ত সময়কালে বিশ্বব্যাপী ওই ধরনের কোনো ধ্বংসলীলা সংঘটিত হওয়ার কোনো প্রমাণ নেই।
এই অভিমতের সমর্থনে ও সপক্ষে যুক্তি হচ্ছে সেকেরভোটাল পাঠে নির্দিষ্ট করে বলা হয়েছে, এই মহাপ্লাবন যখন সংঘটিত হয় তখন হযরত নূহের বয়স ছিল ৬০০ বছর। এদিকে বাইবেলের আদিপুস্তকের পঞ্চম অধ্যায়ের বংশাবলীপত্রে (এটি সেকেরভোটাল পাঠ থেকে গৃহীত এবং এই পুস্তকে বলে দেয়া হয়েছে যে, হযরত আদমের ১৬৫৬ বছর পরে এই মহাপ্লাবন সংঘটিত হয়। অন্যদিকে, বাইবেলের আদিপুস্তকের সেকেরভোটাল পাঠেরই বর্ণনায় (১১, ১০-৩২) রয়েছে হযরত ইবরাহীমের বংশাবলীপত্র। আর সেই বংশাবলীপত্রের হিসেব থেকে দেখা যায়, হযরত ইবরাহীম জন্মগ্রহণ করেছেন মহাপ্লাবনের ২৯২ বছর পর। বাইবেলের বর্ণনা থেকে জানা গেছে যে, হযরত ইবরাহীম মোটামুটিভাবে খ্রিস্টপূর্ব ১৮৫০ সালের দিকে জীবিত ছিলেন। তাহলে মহাপ্লাবন সংঘটনের সময়কাল দাঁড়ায় খ্রিস্টপূর্ব একুশ বা বাইশ শতাব্দীর দিকে। বাইবেলের বংশাবলীপত্রে বর্ণিত সময়ের গণনা যে আদৌ সঠিক নয়, সে সম্বন্ধে আধুনিক মানুষের হাতে অনেক বেশি প্রতিষ্ঠিত তথ্য, প্রমাণ ও হিসেব এসে গেছে। সুতরাং, বাইবেলের সেকেরডোটাল পাঠের লেখকদের ওইসব মনগড়া হিসেব এখন আর কারো নিকট গ্রহণযোগ্য হওয়ার কথা নয়। মজার ব্যাপার, আধুনিক যুগে প্রকাশিত বাইবেলের কোনো সংস্করণেই এখন আর ওইসব হিসেব আগের মত কাহিনীর শুরুতে দেখা যায় না; ওইসব হিসেব একেবারেই বাতিল করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু বাইবেলের মূল বর্ণনায় বংশাবলীপত্রের নামে এখনো ওইসব হিসেব চালু রয়েছে এবং বাইবেলের আধুনিক কোনো ভাষ্যকার ভুলেও সে ভুলের দিকে পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন না। অথচ, তাঁদের সেই ভাষ্যগুলো নাকি রচিত হয়েছে সাধারণ পাঠকদের জন্যই। অতীতের পুরাতন সংস্করণের বাইবেলগুলোতে কাহিনী শুরুর প্রথমেই বেশ গুরুত্ব দিয়ে সময়কালের এইসব হিসেব প্রকাশ করা হত। সেই হিসেব অনুসারেই এই সময়কালের হিসেব গণনা করা হয়েছে। তবে, যেকালে ওই ধরনের হিসেব সম্বলিত বাইবেল প্রকাশিত হত, সেকালে মানুষদের নাগালের মধ্যে আজকের যুগের মত এতসব তথ্য-পরিসংখ্যান ছিল না। সুতরাং, বাইবেলে বর্ণিত ওইসব বংশাবলীপত্র তথা হিসেব কতটা সঠিক, তা নির্ণয় করা তখনকার কোনো মানুষের পক্ষে কঠিন ছিল বৈকি। ফলে, ওই ধরনের ভিত্তিহীন হিসেব-সম্বলিত বাইবেলের যাবতীয় বক্তব্য বিনাদ্বিধায় গ্রহণ করতে সেকালের মানুষদের কোনো অসুবিধা হতো না।
মহাপ্লাবনের যেকথা বাইবেলে বর্ণিত তা আধুনিক তথ্যজ্ঞানের তুলনামূলক বিচারে এখন একথা বিশ্বাস করা অসম্ভব যে, এইমাত্র খ্রিস্টপূর্ব একুশ বা বাইশ শতাব্দীতে বিশ্বব্যাপী ওইরকম এক মহাপ্লাবন সংঘটিত হয়েছিল; এবং সেই মহাপ্লাবনে সারা দুনিয়ার সবকিছু অর্থাৎ, জমিনের উপরের সমস্তকিছু ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল শুধু রক্ষা পেয়েছিল নূহের নৌকার লোজন ও জন্তু-জানোয়ার। ইতিহাস জানিয়ে দিচ্ছে, খ্রিস্টপূর্ব ওই একুশ ও বাইশ শতাব্দীর দিকে পৃথিবীর বিভিন্ন এলাকায় নানা সভ্যতা গড়ে উঠেছিল এবং সেসব সভ্যতার নানা নির্দশন এখন পর্যন্ত ছড়িয়ে রয়েছে। শুধু তাই নয়, এখনো সেসব নিদর্শন বিরাজ করছে একটি উদাহরণে বিষয়টি আরো পরিষ্কারভাবে ফুটে উঠবে। আধুনিক ইতিহাসের গবেষণা থেকে আমরা জানতে পারি, ওই সময়টাতে মিসরে পুরাতন রাজত্বের অবসান ও মধ্যবর্তী রাজত্বের সূচনা ঘটে। এদিকে, ওই সময়কার মিসরীয় সভ্যতার বহুকিছু ইতিহাস ও নিদর্শনাবলী এখনো বিরাজমান। সুতরাং, ওই এলাকার ওই সময়ের ইতিহাস ও ঐতিহাসিক নিদর্শন সম্পর্কে এতকিছু জানার ও প্রত্যক্ষ করার পর একথা এখন আর কিছুতেই মেনে নেয়া যায় না যে, তখন সংঘটিত ওই মহাপ্লাবনে বিশ্বব্যাপী মানুষের সব সভ্যতাই সমূলে ধ্বংস হয়েছিল।
অতএব, ঐতিহাসিক বিচার বিশ্লেষণে এটা স্বীকার না করে উপায় থাকে না যে, বাইবেলে মহাপ্লাবন সংক্রান্ত যে বর্ণনা লিপিবদ্ধ রয়েছে, তা আধুনিক তথ্যজ্ঞানের নিরিখে বাস্তব প্রমাণের বিপরীত। মূলত, বাইবেলের বিভিন্ন রচনায় মানুষের হস্তক্ষেপের যে প্রমাণ ইতিপূর্বে তুলে ধরা হয়েছে, মহাপ্লাবন-সংক্রান্ত এই দুটি পাঠের বর্ণনার মধ্যেও তার পরিচয় সুস্পষ্ট।
