সকলকে এই সত্য স্বীকার করে নিতেই হবে, মোহাম্মদ (দঃ) নিজে। কোরআন রচনা করেছিলেন বলে যে ধারণা করা হয়, তা আগাগোড়াই ভুল। শুধু তাই নয়, পূর্বোক্ত বিচার-বিশ্লেষণ থেকে মোহাম্মদ (দঃ) কোরআন রচনা করেছিলেন বাইবেল নকল করে সেই ধারণাও সুস্পষ্টভাবে মিথ্যা বলে প্রমাণিত হয়। বিচার-বিশ্লেষণ থেকে বেরিয়ে-আসা এই যে সত্য, তার গুরুত্ব অপরিসীম। কেননা, ওইসব ধারণা সত্য হলে, প্রশ্ন জাগে যে, মোহাম্মদ (দঃ) যদি বাইবেল থেকে কোরআন নকল করে থাকেন তাহলে বাইবেলে বর্ণিত যীশুর পূর্বপুরুষগণের নাম-তালিকা কেন, কি কারণে তিনি হুবহু নকল করলেন না? কে তাঁকে তা নকল করতে বাধা দিয়েছিল?
যদিও এখানেই প্রশ্নের শেষ নয়, বরং সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, এই পর্যায়ে মোহাম্মদকে (দঃ) বাইবেলের অশুদ্ধ ও অবাস্তব তালিকা শুধু করতে এবং সেই শুদ্ধ তালিকা কোরআনে বর্ণনায় স্থান দিতে অনুপ্রাণিত ও উদ্বুদ্ধ করেছিল কে এবং কোরআনে বর্ণিত যীশুর (হযরত ইসার) পূর্বপুরুষগণের পরিচয় সর্বাধুনিক তথ্যজ্ঞানের নিরিখে এখন সকলরকম সমালোচনার ঊর্ধ্বে বিরাজ করছে। পক্ষান্তরে, বাইবেলে বর্ণিত যীশুর বংশাবলীপত্র কোরআনের বর্ণনার বিপরীত, এবং আধুনিক তথ্যজ্ঞানের নিরিখেও অগ্রহণযোগ্য।
মোদ্দাকথা, কোরআন মোহাম্মদ (দঃ) কর্তৃক রচিত হওয়ার অবাস্তব বক্তব্য এবং বাইবেল থেকে তার কোরআন নকল করার’ অবান্তর দাবি এই একটিমাত্র পর্যালোচনায় সম্পূর্ণভাবেই নাকচ হয়।
ইতিমধ্যে বাইবেলের পুরাতন নিয়মের এবং নতুন নিয়মের সাথে বেশকিছু বিষয়ের তুলনামূলক আলোচনা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, এই পুস্তকে বাইবেল পুরাতন নিয়মের বিশ্বসৃষ্টির বর্ণনার উপর যে গবেষণাধর্মী বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়েছে, তা উল্লেখযোগ্য। অন্যদিকে, একইবিষয়ে কোরআনে যে বর্ণনা রয়েছে, তাও যথাযথভাবে বিচার-বিশ্লেষণ করা হয়েছে। উল্লিখিত দুই বিচার-বিশ্লেষণের ফলাফল সম্পর্কে এই পর্যায়ে নতুন করে আলোচ্য আর কিছু নেই।
বাইবেলে বর্ণিত রাজা-বাদশাদের কাহিনীর পর্যালোচনায় এবারে আসা যাক। কিন্তু, দুঃখের বিষয়, এক্ষেত্রে আধুনিক ঐতিহাসিক জ্ঞান যেমন অস্পষ্ট, প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্য-উপাত্তও তেমনি অপ্রতুল। এই অবস্থায় আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞানের আলোকে কোরআন ও বাইবেলে বর্ণিত রাজা-বাদশাহদের কাহিনীর উপরে তুলনামূলক বিচার-বিশ্লেষণ সত্যি দুরূহ।
নবীগণের কাহিনী সম্পর্কেও একই কথা বলা চলে ওই দুই ধর্মগ্রন্থে পাশাপাশিভাবে যেসব নবীর কাহিনী ও ঘটনা বর্ণিত রয়েছে, সে-সম্পর্কে আধুনিক জ্ঞান-গবেষণা এখনো তেমন বেশিকিছু জানাতে পারছে না। সুতরাং, এক্ষেত্রে তুলনামূলক বিচার-পর্যালোচনা যথার্থ হওয়া অসম্ভব।
যাহোক, পূর্বোক্ত দুটি বিষয় ছাড়াও আরো কয়েকটি বিষয় কোরআন ও বাইবেলে বর্ণিত রয়েছে, যা মনোযোগ আকর্ষণ করে। এখন যে তথ্য-উপাত্ত রয়েছে, তার আলোকে উক্ত দুটি বিষয়ের উপর অনায়াসেই বিচার-বিশ্লেষণ চালানো যায়। বিষয় দুটি :
মহাপ্লাবন; এবং
ইহুদীদের মিসরত্যাগ।
প্রথম, মহাপ্লাবনের ব্যাপারটি সার্বিকভাবে মানব-সভ্যতার ইতিহাসে তেমন কোনো স্বাক্ষর রেখে যায়নি। যেমনটি বাইবেলে উল্লেখ রয়েছে। ফলে, বাইবেলের বর্ণনায় বিশ্বব্যাপী মহাপ্লাবনের যে কাহিনী প্রচলিত রয়েছে আধুনিক তথ্যজ্ঞানের আলোকে তা অসমর্থনযোগ্য। পক্ষান্তরে, একই মহাপ্লাবনের কাহিনী কোরআনে বর্ণিত রয়েছে। যা আধুনিক প্রতিষ্ঠিত তথ্যজ্ঞানের আলোকে মহাপ্লাবন-সংক্রান্ত কোরআনের সেই বর্ণনার কোনো বিরূপ সমালোচনা করা অসম্ভব।
দ্বিতীয়ত, ইহুদীদের মিসরত্যাগের ব্যাপারে বাইবেল ও কোরআনের বর্ণনা প্রমাণভিত্তিক এবং বৃহত্তর পরিধিতে তা একে অপরের পরিপূরক। তাছাড়া, আধুনিক গবেষণা ও তথ্যজ্ঞানও উভয় ধর্মগ্রন্থের এতদসংক্রান্ত বর্ণনার প্রতি উল্লেখযোগ্যভাবেই ঐতিহাসিক সমর্থন দিচ্ছে।
বাইবেলের (পুরাতন নিয়ম) মহাপ্লাবন-সংক্রান্ত বর্ণনা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা যায় :
বাইবেলে মহাপ্লাবন-সংক্রান্ত বর্ণনা দুটি এবং দুটি বর্ণনা রচিত হয় দুটি ভিন্ন সময়ে;
খ্রিস্টপূর্ব নবম শতাব্দীতে মহাপ্লাবন-সংক্রান্ত বাইবেলের জেহোভিস্ট পাঠের বর্ণনার রচনাকাল; এবং
সেকেরডোটাল পাঠে বর্ণিত মহাপ্লাবন-সংক্রান্ত বিবরণ রচিত হয় খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে। সেকেরভোটাল পুরোহিতদের রচিত বলেই বাইবেলের এই পাঠের এই নামকরণ।
এ দুটো পাঠের বর্ণনা আলাদা নয়; বরং একটার সাথে আরেকটা এমনভাবে গেঁথে রয়েছে যে, দুটো পাঠ-ই ওতপ্রোতভাবে জুড়ে রয়েছে। অন্যকথায়, একটা অনুচ্ছেদ থেকে একটা পাঠের কিছু অংশ মুছে দিয়ে আরেকটা পাঠের কিছু অংশ এনে সে জায়গটা পূরণ করা হয়েছে। জেরুজালেমের বাইবেল শিক্ষায়তনের অধ্যাপক ফাদার ডি. ভক্স তার বাইবেলের আদিপুস্তকের অনুবাদের ভাষ্যে স্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন, বাইবেলের বর্ণনায় কিভাবে উল্লিখিত দুটি পাঠ ব্যবহার করা হয়েছে। যেমন, কোনো বর্ণনা সম্ভবত জেহোভিস্ট পাঠ দিয়ে শুরু ও শেষ হয়েছে। কিন্তু এর মাঝখানেই ভরে দেয়া হয়েছে সেকেরডোটাল পাঠ। এ ধরনের জেহোভিষ্ট পাঠ দিয়ে শুরু ও শেষ এমন অনুচ্ছেদ শুধু আদিপুস্তকেই (বাইবেল) পাওয়া গেছে দশটি (অনুরূপ সেকেরডোটাল অনুচ্ছেদের সংখ্যা হচ্ছে নয়টি)। কোনো একটা ঘটনা জানার জন্য এ ধরনের জোড়াতালি দেয়া বর্ণনায় অবশ্য তেমন কোনো অসংলগ্নতা নেই মনে হয়। কিন্তু একটু গভীর বিচার বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই দুই পাঠের মধ্যে স্ববিরোধিতা বিদ্যমান মারাত্মক ধরনের।
