সুতরাং, কোরআন ও হাদীসের বাণীর মধ্যে বিরাজমান স্বাভাবিক এই পার্থক্যের দ্বারা এটাই প্রমাণিত হয় যে, হাদীস মোহাম্মদের (দঃ) ব্যক্তিগত বাণী ও বক্তব্য হলেও কোরআন আদৌ মোহাম্মদের (দঃ) নিজস্ব ও ব্যক্তিগত বাণী নয় : এ বাণী নিঃসন্দেহে ঐশীবাণী। অন্যকথায় : কোরআন ও হাদীস মোহাম্মদের (দঃ) নিজস্ব রচনা অর্থাৎ উভয়ের উৎস এক ও অভিন্ন, এই ধারণা ও প্রচারণা আদৌ ধোপে টেকে না।
মোহাম্মদের (দঃ) আমলে জ্ঞান-বিজ্ঞানের যতটা উৎকর্ষ সাধিত হয় তার নিরিখে বিচার করলেও দেখা যায়, কোরআনের বাণীতে বিজ্ঞান-বিষয়ক যেসব বক্তব্য ও বর্ণনা বিদ্যমান–সেসব বৈজ্ঞানিক বিষয় আদৌ সে সময়কার কোনো মানুষের রচনা হতে পারে না। সুতরাং, তথ্যগত যুক্তির বিচারে এই সত্য স্বীকার করে নিতে আপত্তির কোনো কারণ থাকে না যে, কোরআন অবতীর্ণ এক আসমানী কিতাব ছাড়া আর কিছুই নয়।
একদিকে, কোরআন তার সঠিকত্বের প্রামাণিকতায় অবতীর্ণ ধর্মগ্রন্থসমূহের মধ্যে যেমন একক, তেমনি অন্যদিকে বিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠিত ও প্রামাণিক বিষয়ের বর্ণনায়ও কোরআনের বৈশিষ্ট্য অনন্য। এখন যখন আমরা কোরআনের এই বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা ও পর্যালোচনা হচ্ছে এবং সেই সাথে তার বৈজ্ঞানিক বাণী ও বক্তব্যের উপরে চলছে গবেষণা ও বিশ্লেষণ, তখন একটা সত্য-চ্যালেঞ্জ হিসেবে ফুটে না ওঠে পারে না। আর সেই সত্যটা হল : “কোরআনের কোনো মানবিক ব্যাখ্যা অসম্ভব। অর্থাৎ কোরআন কোনো মানুষের রচনা নয়; বরং এই কোরআন সত্যসত্যই অবতীর্ণ এক আসমানী কিতাব।
০৫. তুলনামূলক আলোচনা : কোরআন ও বাইবেল
এমন অনেক বিষয়ের বর্ণনা বাইবেলে রয়েছে যেসবের বিবরণ কোরআনেও দেখা যায়। উভয় ধর্মগ্রন্থে যেসব নবীর কাহিনী বর্ণিত হয়েছে তাঁদেরমধ্যে প্রথমেই উল্লেখ করতে হয় হযরত নূহ, ইবরাহীম, ইউসূফ, ইলিয়াস, ইউনুস, আইয়ুব ও হযরত মুসার (আঃ) কথা।
যেসব রাজা-বাদশাহর কাহিনী উভয় ধর্মগ্রন্থে রয়েছে তন্মধ্যে সৌল, দাউদ ও সোলায়মানের নাম উল্লেখযোগ্য। উভয় ধর্মগ্রন্থের নানাবর্ণনায় এদের নাম ঘুরেফিরে এসেছে। এছাড়াও বিশেষ এমন কতকগুলো ঘটনার বর্ণনা উভয় ধর্মগ্রন্থে বিদ্যমান যেসব ঘটনা অলৌকিক প্রভাবের ফল। যেমন : পৃথিবী ও আকাশমণ্ডলের সৃষ্টি, মানুষের সৃষ্টি, মহাপ্লাবন এবং একোডাস বা ইহুদীদের মিসরত্যাগের ঘটনা প্রভৃতি। পরিশেষে, বাইবেলের নতুন নিয়মে (ইঞ্জিল) হযরত ঈসা ও তার মা মরিয়ম সম্পর্কে বর্ণনা রয়েছে। এদের সম্পর্কে বর্ণনা রয়েছে কোরআনেও।
এই দুই ধর্মগ্রন্থে যেসব বিষয় বর্ণিত হয়েছে, সেগুলো যখন আধুনিক জ্ঞানের আলোকে, বিশেষত সেকুলার তথ্যজ্ঞানের নিরিখে বিচার-বিশ্লেষণ করা হয়, তখন কোন্ চিত্র পাওয়া যায়?
কোরআন, ইঞ্জিল ও আধুনিক বিজ্ঞান
কোরআনের সাথে বাইবেলের নতুন নিয়মের সুসমাচারসমূহের (ইঞ্জিলের প্রথম থেকে চতুর্থ খণ্ড) তুলনামূলক বিচার-বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে একটি কথা বিশেষভাবে মনে রাখতে হবে। সেই কথাটি হল : সুসমাচারসমূহের যেসব অসঙ্গতিপূর্ণ বিষয় আধুনিক বৈজ্ঞানিক তথ্যজ্ঞানের বিচারে সমালোচনাযোগ্য।
কোরআনে বহুবারই হযরত ঈসার কথা (যীশুখ্রিস্ট) উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন–পিতৃগৃহে হযরত মরিয়মের জন্ম, হযরত মরিয়মের মধ্যে অলৌকিকত্বের আভাস, উচ্চ পর্যায়ের নবী হিসেবে হযরত ইসার মর্যাদা, মসীহ্ বা ত্রাণকর্তা হিসেবে তার ভূমিকা, তার উপরে অবতীর্ণ ওহীর মাধ্যমে মানবসমাজে তাওরাতের সত্যতার ঘোষণা ও তার সংস্কার সাধন, তার ধর্মপ্রচার, তাঁর প্রেরিত ও শিষ্যবৃন্দ, তাঁর অলৌকিক কার্যকলাপ, আল্লাহর নিকট তাঁর উঠে যাওয়া, শেষ বিচারদিনে তার ভূমিকা প্রভৃতি নানাবিষয়ের বর্ণনা কোরআনে বিদ্যমান।
কোরআনের ৩ নং সূরা ও ১৯ নং সূরার (এই ১৯ নং সূরাটি সূরা মরিয়ম নামে পরিচিত) বেশকিছু দীর্ঘ আয়াত হযরত ঈসার পরিবার স্বজন তথা মাতৃকুল নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এসব আয়াতে হযরত মরিয়মের জন্ম, তার যৌবনকাল এবং অলৌকিক উপায়ে তার মাতৃত্বলাভের বর্ণনাও স্থান পেয়েছে। কোরআনে হযরত ঈসাকে সবসময়ই “মরিয়ম-পুত্র” বলে উল্লেখ করা হয়েছে এবং হযরত ইসার পূর্বপুরুষদের তালিকার বর্ণনায় স্থান পেয়েছে তার মাতৃকূল। যেহেতু যীশুখ্রিস্ট অর্থাৎ হযরত ঈসার দৈহিক দিক থেকে কোনো পিতা ছিলেন, সেহেতু তার বংশাবলীর ক্ষেত্রে তার মাতৃকূলের বংশপরিচয়-সংক্রান্ত কোরআনের এই বক্তব্য ও বর্ণনা একান্ত যুক্তিসঙ্গত। এখানে মথি ও লুক-লিখিত সুসমাচারের (বাইবেল/ইঞ্জিল) সাথে কোরআনের বর্ণনার পার্থক্য সুস্পষ্ট। মথি ও লুক একান্ত অযৌক্তিক হওয়া সত্ত্বেও হযরত ঈসার তথাকথিত পিতৃকুলের বংশলতিকা তুলে ধরেছেন এবং সেখানেও এই দুই লেখকের মধ্যে বর্ণনার গরমিল অত্যন্ত সুস্পষ্ট।
কোরআনে হযরত ইসার মাতৃকুলের বংশলতিকা টানা হয়েছে-হযরত নূহ ও হযরত ইবরাহীম হয়ে হযরত মরিয়মের পিতা (কোরআনে তাকে বলা হয়েছে ইমরান) পর্যন্ত।
“আল্লাহ্ বাছিয়া নিয়াছেন আদম, নূহ্ ও ইবরাহীমের পরিবার এবং ইমরানের পরিবারকে তাঁহার সমস্ত সৃষ্টির উপরে–তাহারা একজন হইতে আরেকজন।”–সূরা ৩ : আয়াত ৩৩ ও ৩৪।
অর্থাৎ, হযরত ঈসা তার মা হযরত মরিয়ম এবং মরিয়মের পিতা ইমরানের মাধ্যমে হযরত নূহ এবং হযরত ইবরাহীমের বংশধর। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, বাইবেলের নতুন নিয়মের সুসমাচারসমূহে অর্থাৎ ইঞ্জিল যীশুর পূর্বপুরুষবর্গের নাম-তালিকা প্রণয়নে যে ভুল করা হয়েছে, কোরআনে সেরকম কোনো ভুল নেই। শুধু তাই নয়, বাইবেলে পুরাতন নিয়মে অর্থাৎ তওরাতে হযরত ইবরাহীমের বংশ-তালিকায় তার পূর্বপুরুষগণের যে অবান্তর তালিকা তুলে ধরা হয়েছে, কোরআন সেই ত্রুটি থেকে মুক্ত।
