যীশুখ্রিস্টের পরস্পর বিপরীত এই দুই বংশাবলীপত্র বৈজ্ঞানিক বিচারে গ্রহণেরও অযোগ্য। খ্রিস্টীয় ধর্মতত্ত্ববিদগণের এই রাখঢাকের মনোভাব পরিষ্কারভাবে ধরা পড়ে। যোহন-লিখিত সুসমাচারের পর্যালোচনায় বিশেষ মনোযোগ দেয়া হয়েছে। এর কারণ, এই সুসমাচারটি বাদবাকি তিনটি সুসমাচার থেকে বিশেষভাবে আলাদা। যেমন—’ইউকেরিস্ট’ বা ‘প্রভুর ভোজস্থাপন’ পর্বটির কথা। যোহনের সুসমাচারে (বাংলা ইঞ্জিল শরীফের ইউহোন্না অধ্যায়) এ ধরনের একটি গুরুত্বপূর্ণ খ্রিস্টীয়-অনুষ্ঠান সম্পর্কে আদৌ কোনো বর্ণনা যে নেই, তা অনেক খ্রিস্টানই জানেন না।
ঐশীগ্রন্থ হিসেবে কোরআন অবতীর্ণ হওয়ার যে ইতিহাস, তার সাথে অপর দুই ধর্মগ্রন্থের অর্থাৎ বাইবেলের পুরাতন নিয়ম ও বাইবেলের নতুন নিয়ম-এর রচনা ও সংকলন-ইতিহাসের পার্থক্য একদম মৌলিক। কোরআন প্রায় সুদীর্ঘ। বিশবছর ধরে অবতীর্ণ হয়েছে এবং যে মুহূর্তে কোরআনের যে অংশ প্রধান ফিরিশতা জিবরাঈলের মাধ্যমে মোহাম্মদের (দঃ) নিকট পৌঁছানো হয়েছে, সেই মুহূর্তেই ঈমানদার মুসলমানগণ তা কণ্ঠস্থ করে নিয়েছেন। শুধু তাই নয়, মোহাম্মদের (দঃ) জীবদ্দশাতেই কোরআনের অবতীর্ণ বাণীসমূহ লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। এরইভিত্তিতে কোরআনের সর্বশেষ সংকলনের কাজ শুরু হয় মোহাম্মদের (দঃ) মৃত্যুর পরেপরেই এবং খলিফা উসমানের (রাঃ)-এর আমলে দীর্ঘ বারো বছরের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় মোহাম্মদের (দঃ) মৃত্যুর চব্বিশ বছরের মধ্যে কোরআনের চূড়ান্ত সংকলনের কাজ সমাপ্ত হয়। মোহাম্মদের (দঃ)-এর আমলের লিপিবদ্ধ কোরআন তো ছিলই। তাছাড়াও ঈমানদার মুসলমান হাফেজগণের সহায়তায় সংকলিত কোরআনের প্রতিটি আয়াত ও পাঠ যাচাই বাছাই করে নেয়া হয়। এইসব হাফেজ কোরআন অবতীর্ণ হওয়ার সময়ই তা মুখস্থ করে নেন। উল্লেখ্য, এভাবে সেই গোড়া থেকেই কোরআন হেফজ করার এবং তা অব্যাহতভাবে তেলাওয়াত করার ধারা জারি হয়ে গেছে। সেই থেকে কোরআনের প্রতিটি আয়াত সর্বাধিক যত্ন ও সতর্কতার সাথে সংরক্ষণ করে আসা হচ্ছে। এ কারণে কোরআনের অকৃত্রিমত্ব এবং সঠিকত্ব নিয়ে কখনোই কোনো সমস্যা হয়নি।
কোরআন গোটা বাইবেলের অর্থাৎ তাওরাত, জবুর ও ইঞ্জিলের পর আসমানী কিতাব হিসেবে অবতীর্ণ হয়। কোরআনের বাণীসমূহ স্ববিরোধিতা ও বৈপরিত্য থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। শুধু তাই নয়, বাইবেলের বাণীগুলোতে যেখানে মানুষের হস্তক্ষেপের অনেক অনেক নজির বিদ্যমান; সেখানে কোরআনের কোনো বাণীতে মানুষের হস্তক্ষেপের কোনো প্রমাণ নেই। সবচেয়ে বড় কথা, সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে বৈজ্ঞানিক তথ্য ও আধুনিক জ্ঞানের আলোকে কেউ যদি কোরআনের বাণীসমূহ বিচার-বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা করেন, দেখতে পাবেন, বিভিন্ন বিষয়ে বর্ণনার সঠিকত্বের দিকথেকে কোরআন অনন্য। তদুপরি, কোরআনে এমনসব বাণী ও বক্তব্য রয়েছে যেসব বাণী ও বক্তব্য আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে নানাভাবে সংশ্লিষ্ট। এখানেই যে কথাটা সবচেয়ে বড় হয়ে ধরা পড়ে, তাহলো, আধুনিক যুগের বিজ্ঞানের আবিষ্কার, বিশ্লেষণ ও গবেষণার দ্বারা সুপ্রতিষ্ঠিত ও সুপ্রমাণিত এতসব বিষয়ের সাথে বিশেষভাবে সংশ্লিষ্ট এই যে কোরআন, তা মোহাম্মদের (দঃ) দ্বারা কিংবা তার সময়ের কোনো মানুষের দ্বারা রচিত হয়েছিল–সেকথা কিভাবেই বা চিন্তা করা যায়? বস্তুত, কোরআনে এমনসব আয়াত রয়েছে, এতকাল যাবত সেসব আয়াতের অর্থ কিংবা ব্যাখ্যা আদৌ সম্ভব ছিল না। একান্ত আধুনিক যুগে এসে, শুধু অত্যাধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা, আবিষ্কার ও তথ্যজ্ঞানের আলোকেই ওইসব আয়াতের অর্থ, ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ সম্ভব হয়েছে।
তুলনামূলক বিচার-বিশ্লেষণে আরো দেখা যায়, কোনো কোনো বিষয়ে বাইবেলের বর্ণনার সাথে কোরআনের বর্ণনার পার্থক্য একান্ত মৌলিক। বাইবেলের বর্ণনা যেখানে বৈজ্ঞানিক বিচার-বিশ্লেষণে অগ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হচ্ছে, সেখানে একইধারার বৈজ্ঞানিক বিচার-বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, কোরআনের বর্ণনা আধুনিক তথ্যজ্ঞানের সাথে সম্পূর্ণ সঙ্গতিপূর্ণ : সৃষ্টিতত্ত্ব ও মহাপ্লাবন-সংক্রান্ত এই গবেষণা-পর্যালোচনায় এই সত্যই ধরা পড়েছে যে, ইহুদীদের মিসরত্যাগের ঘটনাবলীর পর্যালোচনায় দেখা গেছে, কোরআনের বর্ণনা সেখানে উল্লেখযোগ্যভাবে বাইবেলের বর্ণনার সম্পূরক। শুধু তাই নয়, প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় হযরত মুসার আমলের যেসব নির্দশন আবিষ্কৃত হয়েছে, সেসবের ব্যাপারে উভয় ধর্মগ্রন্থের বর্ণনায় মিল রয়েছে প্রচুর। এছাড়া, অন্যসব বিষয়ে বাইবেল ও কোরআনের বর্ণনায় পার্থক্য বিরাট। মূলতঃ উভয় ধর্মগ্রন্থের মধ্যে বর্ণনার এই যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য, তা শুধু একটি সত্যকেই প্রমাণ করে। আর তা হলো :
“বিনাপ্রমাণে যাঁরা অভিযোগ আনেন এবং বিশ্বাসও করেন যে, ‘মোহাম্মদ (দঃ) বাইবেল থেকে নকল করে কোরআনের বাণী রচনা করেছিলেন’–তাঁদের সেই অভিযোগ ও বিশ্বাস পুরোপুরিভাবে অসার, অসত্য ও ভিত্তিহীন।”
অন্যদিকে, কোরআন ও হাদীসের বিজ্ঞান-সংক্রান্ত বাণীর মধ্যে যখন তুলনামূলক বিচার-বিশ্লেষণ করা হয়, তখন দেখা যায়, কোরআনের বর্ণনার সাথে হাদীসের বর্ণনার পার্থক্য দুস্তর। অথচ, হাদীস হচ্ছে মোহাম্মদেরই (দঃ) বাণী। কোনো কোনো হাদীসের বাণীতে বৈজ্ঞানিক বিষয়ের যথার্থতা ও প্রামাণিকতা খুবই অস্পষ্ট যদিও সেসব বাণীতে সে আমলের ধারণাই প্রতিফলিত হয়েছে। পক্ষান্তরে, কোরআনের বিজ্ঞান-বিষয়ক বর্ণনা সুস্পষ্ট এবং আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিচারেও সেসব বর্ণনা সুপ্রমাণিত ও সুপ্রতিষ্ঠিত।
