বাইবেলের পুরাতন নিয়ম ও সুসমাচারসমূহ অর্থাৎ তাওরাত, জবুর ও ইঞ্জিল প্রভৃতি এবং প্রত্যাদেশপ্রাপ্ত কোরআন কোন অবস্থায় কিভাবে ও কখন সংগৃহীত ও সংকলিত হয়, তা পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে পর্যালোচনা করে দেখা হয়েছে। সেই পর্যালোচনায় এটা স্পষ্ট হয়েছে যে, ওইসব ধর্মগ্রন্থের সংকলন-ব্যবস্থা ও পরিস্থিতি ছিল আলাদা আলাদা একটা থেকে আরেকটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিনটি ধর্মগ্রন্থের সংকলনের ক্ষেত্রে পার্থক্যপূর্ণ এই ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতি, এটাই হল ড. মরিস বুকাইলির গবেষণার সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ দিক। কেননা, পরিস্থিতির এই ভিন্নতার উপরেই নির্ভরশীল রয়েছে উল্লিখিত তিন ধর্মগ্রন্থের বাণী ও বিষয়বস্তুর সত্যতা ও সঠিকত্ব।
বাইবেল পুরাতন নিয়মে অর্থাৎ তাওরাত, জবুর ইত্যাদিতে সঙ্কলিত হয়েছে সাহিত্যগুণসম্পন্ন এমনসব রচনা যেগুলো দীর্ঘ নয়শ’ বছর ধরে রচিত হয়েছিল। বাইবেলের এই পুরাতন নিয়ম তথা ‘ওল্ড টেস্টামেন্ট’ বস্তুতই এমনসব বৈচিত্র্যপূর্ণ কারুকাজসম্পন্ন রচনার সমাহার। যার একটি থেকে আরেকটি বিচ্ছিন্ন তো বটেই, সেইসাথে ওসব রচনার নকশা, রং ও রূপ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষের হাতে বহুবার পরিবর্তিত হয়েছে। মূলগ্রন্থের সাথে নতুন নতুন রচনা এমনভাবে মিশিয়ে দেয়া হয় যে, কোথা থেকে কোনটা এনে কার সাথে কিভাবে জুড়ে দেয়া হয়েছিল, তা এখন নির্ধারণ করা বাস্তবিকই মুশকিল।
নিউ টেস্টামেন্ট বা প্রচলিত ইঞ্জিল শরীফ অর্থাৎ ‘বাইবেলের নতুন নিয়ম’ বিশেষত সুসমাচারসমূহ সংকলনের মূল উদ্দেশ্য ছিল যীশুখ্রিস্ট বা হযরত ঈসা (আঃ) তাঁর ধর্মপ্রচারের মাধ্যমে মানুষের জন্য যেসব বাণী ও বক্তব্য রেখে যান এবং তার বিভিন্ন কাজকর্মের যেসব বিবরণী জানা ছিল, সেগুলো একত্রিত করে গ্রন্থাকারে প্রকাশ করা। দুর্ভাগ্যের বিষয়, যাদের দ্বারা এসব বাণী, বক্তব্য ও বিবরণী সংকলিত হয়েছিল, তারা কেউই সেসব বাণীর ও কর্মের প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী ও শ্রোতা ছিলেন না। বরং, তখন সমাজে বিভিন্ন ধরনের ধর্মীয় সম্প্রদায়ের (যেমন জুডিও ক্রিশ্চিয়ানিটি) প্রাদুর্ভাব ছিল বেশি। ওইসব সম্প্রদায়ের মধ্যে যীশুখ্রিস্টের জীবনী ও ধর্মপ্রচার সম্পর্কে নানাধরনের কাহিনী প্রচলিত ছিল। বাইবেলের সুসমাচার তথা ইঞ্জিল শরীফের লেখকবৃন্দ ছিলেন তদানীন্তন আমলের এক-একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মুখপাত্রস্বরূপ। সুতরাং সেই অবস্থানে থেকেই তারা নিজ নিজ সমপ্রদায়ের মধ্যে প্রচলিত বা লিখিত কাহিনীসমূহ সংকলন করে যান, কিন্তু ওইসব কাহিনী বা রচনা এক পুরুষ থেকে আরেক পুরুষে সঞ্চারিত হওয়ার সময় মধ্যবর্তী যেসব স্তর বা পর্যায় অতিক্রম করে সেসব পর্যায়ের রচনাবলী বিলুপ্ত হয়ে যায় অনেক আগেই। শুধু তাই নয়, সেই সাথে বিলুপ্ত হয় সেই আদি কাহিনী বা মূল রচনাগুলোও। সুতরাং, এখন বাইবেলের নতুন নিয়ম তথা ইঞ্জিল শরীফ বলে যে কিতাবটা পাওয়া যায়, তা মূল আসমানী কিতাব ইঞ্জিলের সাথে যে কতটা সঙ্গতিপূর্ণ, তা নিশ্চিত করে বলার উপায় নেই।
অতএব, এখন যদি নিরপেক্ষভাবে বিচার করতেই হয়, তবে ইহুদী ও খ্রিস্টানদের মধ্যে প্রচলিত ধর্মীয় গ্রন্থ তথা বাইবেলের পুরাতন ও নতুন নিয়মের অর্থাৎ তাওরাত, জবুর ও ইঞ্জিলের বিচার-পর্যালোচনা করতে হবে সেই পরিস্থিতির আলোকেই। শুধু তাই নয়, সেই বিচার-পর্যালোচনাকে যদি নিরপেক্ষ রূপ দিতে হয় তবে বাইবেল-সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ বলে পরিচিত পণ্ডিত পুরোহিত ধর্মতত্ত্ববিদগণ কে কি বললেন বা না বললেন, তার প্রতি ক্ৰক্ষেপ করা চলবে না।
প্রকৃতপক্ষে, বাইবেলের মধ্যে রয়েছে নানাবিধ স্ববিরোধিতা ও বৈপরিত্য। কারণ, এসব কাহিনী ও রচনা গ্রহণ করা হয়েছে নানাভাবে, নানা উৎস থেকে। এই গ্রন্থে যে ধরনের স্ববিরোধিতা ও বৈপরিত্যের ভুরিভুরি দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হয়েছে। ফ্রান্সের মধ্যযুগের গাথা-কবিতার লেখকগণ তাঁদের বর্ণনাকে যেভাবে ফেনিয়ে-ফাঁপিয়ে পরিবেশন করতেন, বাইবেলের সুসমাচার-লেখকগণও যীশুর কথা বলতে গিয়ে ঠিক তেমনিভাবে বিভিন্ন ঘটনাকে ফেনিয়ে-ফাঁপিয়ে বড় করে তুলে ধরেছেন। এর কারণ, লেখকবৃন্দ নিজ নিজ অবস্থান ও দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই ঘটনাগুলো উপস্থাপন করেছেন। তাই অনেকক্ষেত্রেই দেখা যায়, তাদের বর্ণিত কোনো কোনো ঘটনা এত অস্পষ্ট যে, সেসবের সত্যতা ও সঠিকত্ব সম্বন্ধে সন্দেহের অবকাশ থেকেই যায়। আর এ কারণেই ইহুদী ও খ্রিস্টানদের ধর্মগ্রন্থ তথা গোটা বাইবেলের জ্ঞান-বিজ্ঞান-সংক্রান্ত বিষয়ের বিচার-বিশ্লেষণে সতর্কতা অপরিহার্য।
এ পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে নানা তথ্যজ্ঞানের আলোকে যেসব আলোচনা ও পর্যালোচনা তুলে ধরা হয়েছে, তা থেকে স্পষ্ট হয় বাইবেলের বর্ণনার মধ্যে কেন এতটা বৈপরিত্য, কেন সেখানে এতরকম অসম্ভব ঘটনার সমাবেশ এবং কেনই বা বাইবেলের প্রতিটি বর্ণনার পরতে-পরতে এতটা অসঙ্গতি। কোনো সচেতন খ্রিস্টান যখন এসব উপলব্ধি করেন, তখন তিনি বিস্ময়ে অবাক না হয়ে পারেন না। এ কারণেই ধর্মীয় দিকদিয়ে স্বীকৃত ভাষ্যকারবৃন্দ বাইবেল-সংক্রান্ত আধুনিক গবেষণার ফলাফল ধামাচাপা দেয়ার জন্য গোড়া থেকেই এত প্রয়াস প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। এজন্য তারা নানা বাগাড়ম্বরে কথার ফুলঝুরি ছড়িয়ে কখনো বা ইনিয়ে-বিনিয়ে অত্যন্ত চালাকির সাথে একযোগে আত্মপক্ষ সমর্থনের এমন একখানা আবহাওয়া সৃষ্টি করেন যে, মূলবিষয় থেকে দৃষ্টি সহজেই অন্যদিকে স্থানান্তরিত হয়ে যায়। মথি ও লুকের সুসমাচারে বর্ণিত যীশুখ্রিস্টের বংশাবলীপত্র এ বিষয়ের একটি চমৎকার উদাহরণ।
